শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

এই বিচারের রায়ই যথেষ -------------বাইডেন

 

২১ এপ্রিল, এএফপি : কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যায় শ্বেতাঙ্গ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চৌভিন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায়ের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বাইডেন বলেন, চৌভিনের বিচার প্রমাণ করেছে যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচিত হওয়ার নয়। তবে এই বিচারের রায়ই যথেষ্ট নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মিনেসোটার হেনেপিন কাউন্টি আদালত তিনটি অভিযোগেই চৌভিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এগুলো হলো ‘সেকেন্ড ডিগ্রি’ অনিচ্ছাকৃত খুন, ‘থার্ড ডিগ্রি’ খুন ও ‘সেকেন্ড ডিগ্রি’ নরহত্যা। রায় ঘোষণার সময় বিচারক জানিয়েছেন, পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে চৌভিনের কারাদ-াদেশ ঘোষণা করা হবে।

চৌভিনের ৪০ বছর কারাদ- হতে পারে। আইন অনুযায়ী, ‘সেকেন্ড ডিগ্রি’ অনিচ্ছাকৃত খুনের জন্য সর্বোচ্চ ৪০ বছর কারাদ-ের বিধান আছে। ‘থার্ড ডিগ্রি’ খুনের জন্য সর্বোচ্চ কারাদ-ের বিধান ২৫ বছর। আর ‘সেকেন্ড ডিগ্রি’ নরহত্যার জন্য ১০ বছরের কারাদ- বা ২০ হাজার ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে।

নাগরিক সমাজের মনোভাব ও মামলা নিয়ে ব্যাপক প্রচারের কারণে জুরিবোর্ড প্রভাবিত হয়েছেনÍএমন দাবি করে চৌভিনের পক্ষ থেকে আপিল করা হতে পারে। নিউজম্যাক্স এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলেছে, আপিল করতে হলে চৌভিনের আইনজীবীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আবেদন জানাতে হবে।

রায় ঘোষণার সময় হোয়াইট হাউসে বসে প্রেসিডেন্ট বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টিভিতে লাইভ দেখেন। রায়ের পর বাইডেনের আগে কমলা হোয়াইট হাউস থেকে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, ‘ফ্লয়েড হত্যার বিচারের রায় একধরনের প্রশান্তি দিলেও আমাদের এই বেদনা বহন করে চলতে হবে।’

বাইডেন তার বক্তৃতায় বলেন, ‘এই বিচারের রায়ই যথেষ্ট নয়। আমাদের এখানে থামলে চলবে না। পরিবর্তন ও সংস্কার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। যে কারণে এসব ঘটনা ঘটছে, তা কমিয়ে আনার জন্য অবশ্যই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

ফ্লয়েডের মেয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা বাইডেন তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ফ্লয়েডের শিশুকন্যা বলেছিল, তার বাবা পৃথিবী বদলে দিয়েছেন। সেই কথা স্মরণ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, ‘ফ্লয়েডের মৃত্যুর স্মৃতি আমাদের শান্তির প্রেরণা হয়ে উঠুক। এই ঘটনা কোনো সহিংসতার প্রেরণা হতে পারে না। যারা আবেগকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা করে, লুটপাট করে, অগ্নিসংযোগ করে, তাদের সফল হতে দেওয়া যাবে না।’

আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বহুল আলোচিত এই মামলার রায়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা বলেছেন, ফ্লয়েড হত্যার বিচারে জুরিবোর্ড সঠিক রায় দিয়েছেন।

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ বলেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই রায় একটি পদক্ষেপ মাত্র। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য অনেক কাজ এখন নতুন করে শুরু করতে হবে।

রায় প্রকাশের পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নাগরিক আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে আল শার্পটন, জ্যাকি জ্যাক্সনসহ অন্যরা সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন। তাঁরা রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রার্থনা করেন।

নাগরিক আন্দোলনের নেতারা বলেছেন, সম্মিলিত প্রতিবাদের জয় হয়েছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু হলো। আমেরিকার পুলিশি ব্যবস্থায় বর্ণবিদ্বেষ ও বৈষম্যের অবসানে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ফ্লয়েডকে হত্যার দৃশ্য ভিডিও করেছিলেন ১৭ বছর বয়সী তরুণী ডারনেলা ফ্রাইজার। রায় প্রকাশের পর তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবেগাপ্লুত হয়ে ফ্রাইজার বলেন, ‘আমরা কিছু একটা করতে পেরেছি।’

২০২০ সালের ২৫ মে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা চৌভিনের হাতে ফ্লয়েড নিহত হন। ফ্লয়েডকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে তাঁর ঘাড় হাঁটু দিয়ে সড়কে চেপে ধরেন চৌভিন। এতে ফ্লয়েড মারা যান। এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নাগরিক আন্দোলন শুরু হয়।

আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় নগরীতে ব্যাপক সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর আমেরিকার পুলিশি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের চাপা অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য পুলিশের তহবিল কর্তন করাসহ দ্রুত নানান সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আইনপ্রণেতাদের কাছে আমেরিকার বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য চাপ আসে।

মামলাটির রায়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। আদালতের বাইরে ও বড় বড় নগরীতে লোকজনকে দিনের শুরু থেকে জমায়েত হতে দেখা যায়। রায় ঘোষণার পর সবাইকে উৎফুল্ল দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগরীতে এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের লোকজন বলছেন, মার্কিন সমাজে পুলিশি ব্যবস্থার পরিবর্তনে এই মামলার রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য এ নিয়ে আশঙ্কার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, চৌভিনের সাজা পুলিশের মধ্যে অসন্তোষ ও দায়িত্ব পালনে অনীহা সৃষ্টি করতে পারে।

গত এক বছরের নাগরিক আন্দোলনের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ ইউনিয়নগুলোর মধ্যে অসন্তোষ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থায় চেপে থাকা বর্ণবাদ ও বৈষম্য নিয়ে মার্কিন সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত। শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ লোকজনের মৃত্যুর ঘটনাগুলো দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার তীব্র সংকট তৈরি করেছে। এই অনাস্থার জের ধরে প্রায়ই বড় বড় ঘটনা ঘটছে। নাগরিক নেতারা মনে করেন, সমাজের অনগ্রসর গোষ্ঠীটির মধ্যে অপরাধ প্রবণতার আধিক্যের জন্য সমাজের অসাম্যই দায়ী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ