রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে ৪৮ ভাগ রোগী

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস রোগের তীব্রতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান -আইইডিসিআর। একইসঙ্গে আক্রান্ত রোগীরা খুব দ্রুত মারা যাচ্ছেন। সংস্থাটি বলছে, হাসপাতালে করোনায় মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পাঁচ দিনের মধ্যে মারা গেছেন। করোনার বিভিন্ন দিক নিয়ে করা একটি গবেষণার তথ্য শনিবার রাতে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।
২৮ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে তথ্য পর্যালোচনা করে আইইডিসিআর বলছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির হার ৪৪ শতাংশ। এ সময়ে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় বড় অংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকিরা প্রাতিষ্ঠানিক বা হোম আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর হাসপাতালে করোনায় মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পাঁচ দিনের মধ্যে মারা গেছেন। আর ৫ থেকে ১০ দিনের ভেতরে মারা গেছেন ১৬ শতাংশ।
আইইডিসিআরের তথ্য বলছে, কোভিড-১৯ মহামারিতে গেল মার্চে মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৩৮, যা এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনে এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪১এ। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মৃত্যু পর্যালোচনা করে আইইডিসিআর বলছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ উপসর্গ শুরুর ৫ দিনের মাথায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২৬ শতাংশ উপসর্গ শুরুর ১০ দিনের মাথায় হাসপাতালে ভর্তি হন। আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে উপসর্গ শুরুর ১১ থেকে ১৫ দিনের মাথায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১২ শতাংশ।
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারিতে মৃত্যুর কারণগুলো আইইডিসিআর নিয়মিত পর্যালোচনা করে থাকে। কারণগুলো চিহ্নিত করে মৃত্যু কমিয়ে আনাই এর উদ্দেশ্য। কোভিড-১৯ মহামারিতে ২০২১ সালের মার্চে মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৩৮, যা এপ্রিলে (১৫ এপ্রিল) বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯৪১-এ। মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি ৩২.২ শতাংশ। অন্যদিকে শুধু ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে তার আগের বছরের সর্বোচ্চ হারের চেয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি মৃত্যুবরণ করেছেন (৩০ জুন, ২০২০ মৃতের সংখ্যা ৬৪ জন।
২৮ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ১৫, ২০২১ এর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোভিড-১৯। রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির হার ছিল ৪৪ শতাংশ অর্থাৎ এ সময় আক্রান্ত রোগীদের প্রায় বড় অংশ হাসপাতালে ভর্তি, বাকিরা প্রাতিষ্ঠানিক (৩৩ শতাংশ) বা হোম আইসলেশন এ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মৃত রোগীদের ৫২ শতাংশ উপসর্গ শুরুর ৫ দিনের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। ২৬ শতাংশ উপসর্গ শুরুর ৫-১০ দিনের মধ্যেই ভর্তি হয়েছিল। ১২ শতাংশ ভর্তি হয় উপসর্গ শুরুর ১১- ১৫ দিনের মধ্যে। এ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে কোভিড-১৯ রোগের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মৃত রোগীদের ৪৮ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৫ দিনের ভিতরে মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৬ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেন ভর্তি হওয়ার ৫-১০ দিনের ভিতরে। এই উপাত্তের বিশ্লেষণেও দেখছি যে কোভিড-১৯ রোগী খুব দ্রুত মৃত্যুবরণ করছেন।
গত বছরের জুলাই মাসে যখন কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট মৃত্যুহার সর্বোচ্চ ছিল সে সময়ে নারী-পুরুষের মৃত্যুর (২২৬/৯৮২) অনুপাত ছিল ১:৩.৫। এ বছরের এপ্রিলে এসে দেখা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের মৃত্যুর (২৬৩/৬১৪) অনুপাত ১:২.২৩। অর্থাৎ গত বছরের চাইতে নারী বেশি হারে মৃত্যুবরণ করছেন।
বৈশ্বিক মহামারি পরিবর্তন করেছে মানুষের মনোজগৎ, তা আমরা আঁচ করতে পারি মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত মানসিক রোগের হার সংক্রান্ত জরিপের ফলাফলে। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা (৬.৭ শতাংশ) আর দুশ্চিন্তার (৪.৭ শতাংশ) সমস্যা ছিল। কোভিডকালে বাংলাদেশে পরিচালিত কয়েকটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশের মধ্যে বিষন্নতা আর ৩৩ শতাংশের এংজাইটি বা দুশ্চিন্তার লক্ষণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সাধারণ সময়ের চেয়ে কোভিডকালে মানসিক সমস্যা বাংলাদেশেও বেড়ে যাচ্ছে।
গত একবছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৪ হাজার, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর চেয়ে বেশি। সুনির্দিষ্টভাবে কোভিড নিয়ে কুসংস্কার, স্টিগমা, কোভিড ভীতিতে প্রায় ৫ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। করােনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, মৃত্যুভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকারত্ব; এসব কারণে বাড়ছে মানসিক সংকট।
করােনা চিকিৎসায় নিয়োজিত সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ, বার্ন আউট হচ্ছে, যা কোভিড-১৯ এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে করণীয়- কোনভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আতঙ্ক মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। মানসিক চাপ হ্রাস করতে হবে। এ জন্য যা করতে হবে- ঘুমানোর স্বাভাবিক সময় ঠিক রাখা, নিজের পছন্দের বিষয় ও কাজের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া, পরিবারের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো (যেমন পরস্পরকে উৎসাহ দেয়া, পরস্পরের কাজে সহযোগিতা করা, ঘরের মধ্যেই একসঙ্গে সময় কাটানো ও পছন্দের কাজ করা), প্রতিদিন কিছুক্ষণ সময় অবশ্যই শারীরিক ব্যায়াম করা, নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে ঘরেই প্রার্থনা করা ও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সর্বোপরি এ কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে আছি, বেঁচে আছি এ জন্য সন্তুষ্ট থাকা, সবার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। কিন্তু কোনভাবেই পরিস্থিতি বা রোগ কোনো কারণেই কারো প্রতি করুণা প্রকাশ করা যাবে না।
অতিরিক্ত আতঙ্ক, অস্থিরতা, মানসিক চাপ, বিষন্নতা, ঘুমের ধরন পরিবর্তন ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা গেলে আপনার কাছের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর এর হটলাইন যোগাযোগ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে গ্রহণ করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ