রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

১০০০ শয্যার করোনা হাসপাতালের যাত্রা শুরু ॥ রোগী ভর্তি আজ থেকে

গতকাল রোববার রাজধানীর মহাখালীতে দেশের সবচেয়ে বড় ‘ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল’-এর সেবা কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : চলমান করোনা ভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা  সংক্রমণ ও মৃত্যুর মুখে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যাসংকটের মধ্যে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় মাইলফলক স্থাপন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। ২১২টি আইসিইউ নিয়ে রাজধানীর মহাখালীতে কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল। ১০০০ শয্যার করোনা হাসপাতালটির যাত্রা শুরু উপলক্ষে গতকাল রোববার দুপুরে এটির আনুষ্ঠানিক  উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। আজ সোমবার সকাল থেকেই হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তি শুরু হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই হাসপাতালের পরিচালনায় থাকছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। হাসপাতালের জমি, ভবন, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করছে ডিএনসিসি। যন্ত্রপাতি, লোকবল, ওষুধসহ অন্যান্য কারিগরি সহায়তা দেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হাসপাতালটিতে আইসিইউ বেড আছে ১১২টি। এইচডিইউ বেড ২৫০টি। এ ছাড়া ১৩৮টি আইসিইউ মানের বেড রয়েছে। এই বেডগুলো কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। হাসপাতালটিতে জরুরি ওয়ার্ডে ৫০টি বেড রাখা হয়েছে। এই ৫৫০টি বেডের বাইরে আরও ৪৫০টি বেড থাকবে, সেখানে মারাত্মক আক্রান্ত নন-এমন রোগীদের রাখা হবে।
করোনা ভাইরাস মহামারির সময় এটি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেবে। মহামারি শেষহলে এটি জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে পরিচালিত হবে। কারওয়ান বাজারের আড়ত সরিয়ে আনতে সাত দশমিক ১৭ একর জমির ওপর গড়া বিপণী বিতানকেই কোভিড-১৯ হাসপাতালে রূপান্তরিত করেছে ডিএনসিসি। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ২০২০ সালে এখানেই গড়ে তোলা হয়েছিল এক হাজার শয্যার আইসোলেশন সেন্টার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, “এই হাসপাতালটি চালুর মাধ্যমে কোভিড রোগীদের সেবা আরও উন্নত হবে। এই হাসপাতালে ২১২টি আইসিইউ আছে। এইচডিইউতে আছে প্রায় আড়াইশ বেড। অন্যান্য বেডগুলোতেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন আছে। সেখানে হাই-ফ্লো নেইজল ক্যানোলা ব্যবহার করতে পারবে। অন্যান্য বেডে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আমরা দিয়ে দিচ্ছি।”
ঢাকা শহরে যতগুলো আইসিইউ আছে তার প্রায় সমান আইসিইউ এই হাসপাতালেই থাকছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “হাসপাতালের পাঁচশ বেডই আইসিইউ সমতূল্য কোভিড রোগীর জন্য।”
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আগের চেয়ে ১০ গুণ বেশি রোগী আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, “দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে গত ২০ দিনে যে পরিমাণ রোগী এসেছে, গত ১০ মাসের মধ্যেও সেই রোগী আসে নাই।”
হাসপাতাল উদ্বোধনের সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশে নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ বাড়ছে প্রতিদিনই। সংক্রমণ শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে রোগীর ভিড়। দেশের অন্যান্য স্থানেও বাড়ছে হাসপাতালে বেড না পাওয়ার হাহাকার। এ অবস্থায় ন্যূনতম এক হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা থেকেই ডিএনসিসি  মহাখালীতে যে আইসোলেশন সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল সেখানেই প্রাথমিকভাবে ২৫০ বেড দিয়ে রোগী ভর্তির কার্যক্রম শুরু হয়। কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, ৫০ বেডের আইসিইউ, ৫০ বেডের জরুরি সেবা (মেডিসিন), ১৫০টি কোভিড-১৯ আইসোলেটেড রুম দিয়ে গতকাল শুরু করা এই হাসপাতালটি পর্যায়ক্রমে এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ পুরো চালুর পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে ডিএনসিসি মার্কেটে আইসোলেশন সেন্টার করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে সেটি পরবর্তীতে আর চালু করা হয়নি। দেশে সংক্রমণ কমে আসতে থাকলে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে সম্প্রতি নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ বৃদ্ধির পরে দেশে ২২ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টার প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ডিএনসিসির আইসোলেশন সেন্টারটিকে খুব দ্রুত হাসপাতালে রূপান্তরিত করার জন্য দৈনিক তিন শিফটে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) সাবেক এই পরিচালক বলেন, ‘৫০ বেডের আইসিইউ, ৫০ বেডের জরুরি সেবা (মেডিসিন), ১৫০টি কোভিড-১৯ আইসোলেটেড রুম দিয়ে গতকাল শুরু করা হয় এই হাসপাতাল। এই রুমগুলো হবে অনেকটা কেবিনের মতন। আমাদের এখানে দ্রুতই বেডের সংখ্যা আরও বাড়বে। আইসিইউ সাপোর্টের যে ফেইজ আছে তার অধিকাংশই কিন্তু প্রস্তুত হয়ে গেছে। সেগুলোও আমরা যুক্ত করে খুব দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘এতদিন আমরা হাসপাতাল চালুর বিষয়ে বলেছি। আজ থেকে আশা করছি দ্রুত চিকিৎসাব্যবস্থা শুরু করতে পারব। পুরো কাজ শেষ হওয়ার পরে আসলে সবাই বুঝতে পারবে যে কত বড় মানের একটি কিছু হলো। আমাদের কিছু জনবলও প্রয়োজন হবে অবশ্য। হঠাৎ করে এত বড় হাসপাতাল সম্পূর্ণ জনবল দিয়ে চালু করে ফেলাটা বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জের কাজ। সেখানে কিছুটা সময় লাগলেও খুব দ্রুতই তা পূরণ হয়ে যাবে বলে আশা করছি। আমরা আশাবাদী যে কোভিড-১৯ চিকিৎসা ম্যানেজম্যান্টের জন্য এখানে ভালো কিছু করতে পারব।’
রোগীরা কীভাবে ভর্তি হবে সে বিষয়ে জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এখানে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বা উপসর্গ আছে এমন যে কেউ আসতে পারবে চিকিৎসা নেয়ার জন্য। তারা আসার পরে প্রবেশ করবে আমাদের ট্রায়াজে। সেখানে আবার দুইটা জোন আছে। যাদের মৃদু উপসর্গ আছে বা হেঁটেই আসতে পারছে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য তাদের যদি ভর্তি প্রয়োজন না হয় তবে ভর্তি করা হবে না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হবে। পরে এসে তিনি আবার রিপোর্ট করতে পারবেন।’
ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আসবে তারা ট্রায়াজ-২ এ চলে যাবে। সেখানে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আছে। ছয় বেডের একটা আইসিইউ সেটাপ থাকবে নিচ তলাতেই। সেখানে ভেন্টিলেটর পর্যন্ত দেয়ার সুযোগ থাকছে। আর তাই ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডেই ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের স্ট্যাবল হওয়ার সুযোগ আছে। সেখানে তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পাঠিয়ে দেওয়া হবে দুই তলায় ওয়ার্ডে। সেখানে যদি কারও পরিস্থিতি খারাপ হয় তবে তাকে আমরা পাঠিয়ে দেবো আইসিইউ বা এইচডিইউতে। আর যদি একটু স্ট্যাবল হয় বা ঝুঁকির মাত্রা কমে আসে তবে আমরা তাদের কেবিনে দিয়ে দেবো। এই কেবিনগুলোতে সেন্ট্রাল অক্সিজেনসহ হাই-ফ্লো নজল ক্যানোলা সুবিধা থাকবে। এক্ষেত্রে মনিটরের ব্যবস্থাও করা হবে খুব দ্রুতই। ওখানে তারা কিছুটা স্ট্যাবল হলে তাদের ধীরে ধীরে ডিসচার্জ হওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এটাই আমাদের আপাতত স্টেপ-১ ও স্টেপ-২ পরিকল্পনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব, এখানে আমাদের যে টেলিকমিউনিকেশন আছে তা চালু করার। আমাদের এখানে একটা টেলিমেডিসিন সেন্টার আছে, যা ভবিষ্যতে চালু করা হবে বলে আশা করছি। এখানে জনবল যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সেটাপ খুব দ্রুত চালু হবে। প্রাথমিকভাবে মোটামুটি প্রায় সব কিছু প্রস্তুত হয়ে গেছে। আশা করছি, অন্য কোনো সমস্যাতে আর পড়তে হবে না আমাদের।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন বলেন, হাসপাতাল পরিচালিত হবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের আওতায়।  আশা করছি, দেশের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে এখানে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যেতে পারব।’
তিনি বলেন, এটা আসলে সর্বোচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হাসপাতাল হতে যাচ্ছে। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন কাজ করে যাচ্ছে। আমিও কিন্তু আর্মড ফোর্সের ডিভিশনের পক্ষেই এখানে কাজ করে যাচ্ছি। আর্মড ফোর্সের ডিভিশনের নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে এখানে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে জনবল, আর্থিক সহায়তা, ওষুধ বিভিন্ন কিছু দিয়ে। আর্মড ফোর্সেস থেকেও আমরা চিকিৎসক, নার্সসহ আমাদের কিছু থাকছে। ডিএনসিসি তাদের জায়গা দিয়েছে ও একই সঙ্গে অন্যান্য কিছু সাপোর্ট দিয়ে আমাদের সাহায্য করে যাচ্ছে। মূলত এই তিনটা প্রতিষ্ঠান মিলেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
হাসপাতালটির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ফরিদ হোসেন মিঞা বলেন, ‘মহাখালীতে ডিএনসিসির আইসোলেশন সেন্টারে ১ হাজার ৫০০ বেডের কোভিড ইউনিট তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি এটি চালু হলে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়া আরও সহজ হবে।’
ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আইসিইউ সেবা শুরু হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালীতে। ঠিক ১৫ দিন পরেই ধাপে ধাপে আরও বেড বাড়ানো হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ও করোনাবিষয়ক মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, ‘ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হাসপাতালটা চালু করায় দ্রুত কিছু হাসপাতালের লোড কমবে। এখানে রোগীরা ভর্তি শুরু  হলে অন্যান্য হাসপাতালের ওপর প্রেশার কিছুটা কমে আসবে। আশা করছি, এখানে অনেক বেশি মানুষকে সেবা দেয়া যাবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ