শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

রমযান মাস ও কুরআনের মর্যাদা

ড. বি. এম. শহীদুল ইসলাম : রমযান ও কুরআনের মর্যাদা অপরিসীম। রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মুসলিমগণ আশুরার রোযা পালন করত। যখন রমযান মাসের রোযা ফরজ হওয়ার ঘোষণা এলো তখন নবী করিম (স) বললেন; এখন থেকে রমযানের রোযা রাখা ফরজ। সুতরাং তোমরা কেউ ইচ্ছা করলে আশুরার রোযা পালন করতে পার, ইচ্ছা করলে নাও করতে পার। নবী করিম (স) এর এ কথা দ্বারা পরিষ্কার প্রমাণিত হয়ে গেল যে, রমযানের রোযা ফরজ। আর পবিত্র কুরআন রমযান মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাই রমযান মাসের মর্যাদা অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি। রমযান ও কুরআনের মর্যাদা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো:
রমযান মাসের মর্যাদা : রমযান মাসের মহিমা ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। এ মাসেই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে। এ জন্য রমযান মাসের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও মর্যাদা এতো বেশি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেন; "রমযান মাস, এ মাসে বিশ্বমানবতার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ কুরআন পথ প্রদর্শন ও সৎ পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং এটি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী গ্রন্থ"। (সুরা বাকারাহ-১৮৫ আয়াত)
রাসুল (স) বলেছেন; ইবরাহিম (আ) এর সহীফা রমযানের প্রথম রাতে তাওরাত কিতাব, রমযানের ৬ তারিখে যবুর কিতাব, রমযানের ১৩ তারিখে ইঞ্জিল কিতাব এবং মহাগ্রন্থ আল কুরআন কদরের রাতে অবতীর্ণ হয়। (আহমাদ-৪/১০৭)।
মূলত কুরআনুল করিম একই সাথে প্রথম আসমানের ওপর কদরের রাতে অবতীর্ণ হয় এবং ঐ রাতকে লাইলাতুল মুবারাকাত বলা হয়। অর্থাৎ বরকতময় রাত বলা হয়। (সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাসির)।
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন; "সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ! আমি একে (কুরআনকে) এক বরকতময় রাতে নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়"। (সুরা দুখানঃ ২-৪ আয়াত)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আরো বলেন; নিশ্চয়ই আমি ইহা (কুরআনকে) এক মহিমান্বিত রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। (সুরা কদরঃ ১ আয়াত)।
এখানে মহিমান্বিত রজনী বলতে কদরের রাতকে বুঝানো হয়েছে। কোনো কোনো লোক মনে করেন যে মুবারাকময় রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, তা শাবান মাসের পনেরতম রাত। যে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা বলে থাকেন তা হাদিসে মুরসাল। যেখানে কুরআনের সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে সেখানে মুরসাল হাদিসের গুরুত্ব কতটুকু তা সহজেই অনুমান করা যায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন; আমি সতর্ককারী। অর্থাৎ আমি মানুষের ভালো-মন্দ এবং পাপ-পূণ্য সম্পর্কে অবহিতকারী। যাতে করে তাদের ওপর যুক্তি- প্রমাণ উপস্থিত হয়ে যায় এবং তারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। মুবারাকময় রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ লওহে মাহফুজ হতে লেখক ফেরেশতাদের দায়িত্বে অর্পণ করা হয়। সারা বছরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তারা লিপিবদ্ধ করেন। যেমন বয়স, জীবিকা, পরবর্তী বছর পর্যন্ত যা ঘটবে ইত্যাদি স্থিরীকৃত হয়। [ইবনে উমার (রা), মুজাহিদ (রহ) আবু মালিক (রহ)]।
রোযাদারের দোয়া কবুল হয় : রমযানের আর একটি মর্যাদা হচ্ছে- এ মাসে রোযাদারের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। রোযাদারের প্রার্থনা আল্লাহ তায়ালা কখনো ফিরিয়ে দেন না। সহীহ্ হাদিসে এ ব্যাপারে পরিষ্কার নির্দেশনা এসেছে। হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) বলেন, রাসুল (স) বলেছেন; তিন ব্যক্তির প্রার্থনা ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক ২. সিয়াম পালনকারী যতক্ষণ সিয়াম পালন অবস্থায় থাকে ৩. মযলুম ব্যক্তি। কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা তাদেরকে উচ্চাসনের মর্যাদা দিবেন। তাদের বদ দোয়ার কারণে আকাশের দরজাসমূহ খুলে যাবে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা বলবেন; ‘আমার ইজ্জতের শপথ! কিছুকাল পরে হলেও আমি তাদের প্রার্থনা কবুল করব'। (তিরমিজি ৭ম খন্ড-২২৯, ইবনে মাজাহ ১ম খন্ড-৫৫৭) ।
রমযান মাসে সাহরি খাওয়ার মর্যাদা: রমযানে সাহরি খাওয়ার মর্যাদা ও গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা সাহরি খাওয়াকে উৎসাহিত করেছেন। সহীহ্ হাদিসসমূহে সাহরি খাওয়ার জন্য যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। রাসুল (স) বলেছেন, তোমরা সাহরি খাবে তাতে বরকত রয়েছে। [সহীহ্ মুসলিম ২য় খন্ডঃ হাদিস-৭৭১]।
নবী করিম (স) আরো বলেছেন, সাহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে, সুতরাং তোমরা সাহরি পরিত্যাগ করনা। যদি কিছুই না থাকে তাহলে এক ঢোক পানিই যথেষ্ট। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা ও তার ফেরেশতাগণ সাহরি ভোজনকারীদের প্রতি করুনা বর্ষণ করেন। [আহমাদ- ৩য় খন্ড, হাদিস অনম্বর-৪৪]।
পবিত্র কুরআনের মর্যাদা : বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রষ্ঠ আসমানী কিতাব মহাগ্রন্থ আল কুরআনের মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এটি বিশ্বমানবতার জন্য পথ প্রদর্শক এবং এতে প্রকাশ্য ও উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী রয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা complete code of life. গবেষণাধর্মী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ-এর মাধ্যমে সঠিক পথে পৌঁছাতে পারেন। এটি এমন একটি কিতাব যা সত্য-মিথ্যা ও হালাল হারামের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণকারী। ভালো-মন্দ ও সুপথ-কুপথের ভিন্নতা নির্দেশকারী। [সুরা বাকারাহ-১৮৫ আয়াত]।
সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে পরিষ্কার উপলব্ধি করা যায় য, কুরআন নাযিলের কারণেই রমযান মাসের মর্যাদা এতো বেশি। আর কুরআনের মর্যাদা এতো বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে- এ কিতাব বিশ্বের মহান সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক যিনি সবকিছু দেখেন, শোনেন এবং জানেন সেই মহান আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেছেন। এ কুরআন সমগ্র মানবতার হেদায়েতের মহান বাণী। শুধু মুসলিম নয়, বিশ্বের সকল মানুষের জন্য মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি। কুরআন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা complete code of life. তাই পবিত্র কুরআনের সম্মান ও মর্যাদা কিয়ামত পর্যন্ত সমুন্নত রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ