শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ধান খাওয়ার অপরাধে পাখির ছানাহত্যা!

-ইসমাঈল হোসেন দিনাজী
পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্য। অলঙ্কার। পাখির কিচিরমিচির শব্দ কার না ভালো লাগে? বিশেষত বাবুই, চড়ুই, বুলবুলি, দোয়েল ইত্যাদি পাখি ছোট এবং দেখতেও সুন্দর। এরা বেশি খায়ও না। পোকামাকড়, ধান, কাউন, সবুজ কচিপাতা খেয়ে বাঁচে। এরা ফসলের তেমন ক্ষতি করে না। তাই এসব ছোট্ট পাখিকে মানুষ ভালোবাসে। কবিরা এদের নিয়ে লেখেন কবিতা এবং গান। কিন্তু কোনও মানুষ এমন ক্ষুদে পাখির জানের দুশমন হবেন তা সত্যি ভাবনার বাইরে।
ঘটনাস্থল পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ভবানিপুর গ্রাম। সম্প্রতি বোরোধান খাওয়ার অপরাধে সেখানকার এক কৃষক ও তাঁর সহযোগীরা তালগাছে থাকা বাবুই পাখির দুই শতাধিক বাসা ভেঙে ফেলেন এবং প্রায় দেড় শতাধিক পাখির ছানা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এমন নির্মম ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বোরো ধানক্ষেতমালিকের এক ভাই এবং তাঁর সহযোগীরা। ঘটনাটি ঘটে গত ১০ এপ্রিল, শনিবার।  
স্থানীয়রা জানান, ওই গ্রামের একটি জমিতে বোরোধান চাষ করেছেন হেমায়েত হোসেন মোল্লাসহ কয়েক কৃষক। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে সেই জমির বোরোধান খাচ্ছিল এক ঝাঁক বাবুইপাখি। উল্লেখ্য, ওই জমির পাশেই দুটো তালগাছে ছিল বাবুইপাখির প্রায় শতাধিক বাসা। পাখিগুলো জমির ধান খেয়ে ফেলায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ক্ষেতমালিক হেমায়েত হোসেন মোল্লা। তাঁর নির্দেশে কয়েক দিন ধরে ওই গাছে থাকা বাবুই পাখির বাসাগুলো ভেঙে ভেতরে থাকা ছানাগুলো বাইরে ফেলে হত্যা করেন তাঁর ছোটভাই লুৎফর রহমান মোল্লা।  
ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগে লুৎফর রহমান মোল্লার নেতৃত্বে স্থানীয় সুভাসসহ ৩ জনে মিলে বড় একটি বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তালগাছে থাকা বাবুইপাখির বাসাগুলো ভেঙে মাটিতে ফেলেন। এ সময় বাসাগুলোতে থাকা বাবুই পাখির ছোট ছোট ছানাগুলোও মেরে ফেলেন তাঁরা। এ ছাড়া কিছু ছানা মেরে পাশের খালে ফেলে দেয়া হয়।
স্থানীয় মারুফুল আজিজ জানান, সেখানে প্রায় দেড় শতাধিক বাবুই পাখির ছানা ছিল। ছানাগুলোর প্রায় সবই একেবারেই ছোট। মাটিতে পড়ে থাকা জীবিত ছানার অনেকগুলো তখনও খাবারের আশায় মুখ হা করে চিঁচিঁ করছিল।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য নিগার সুলতানাও বিষয়টির খোঁজখবর নেন। উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক একরামুল শিকদার জানান, ওই জমির মালিক দুইতিন দিন ধরে পাখির ছানা ও বাসা নষ্ট করেন। কয়েকজন কৃষক কিছু ছানা আগুনে পুড়িয়েও হত্যা করেছেন। নিষ্ঠুর ও ঘৃণ্য এমন কাজ কোনও  মানুষ করতে পারেন তা ভাবা যায় না বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে ইন্দুরকানী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হরিশচন্দ্র বোস জানান, এ ব্যাপারে তিনি কোনও অভিযোগ পাননি। তিনি বলেন, বাবুইপাখি একটি বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের সকলেরই কর্তব্য। পাখি হত্যা করা একটি অমানবিক কাজ। পাখি হন্তারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে বলে তিনি জানান।
বিষয়টি জানতে ক্ষেতমালিক হেমায়েত হোসেন মোল্লার সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে তিনি জানান, “আমার ৫০ বিঘা জমিতে বোরোধানের চাষ করা হয়েছে। জমির ধান নষ্ট করেছে পাখি। আমি ওই সব পাখির ছানা হত্যা করিনি। আমার ছোটভাই কিছু বাসা ভেঙেছে। আমি এ খবর শুনে ওকে বকাঝকাও করেছি। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করতে ঘটনাটি সাংবাদিকদের জানিয়েছে।”
বলাবাহুল্য, পিরোজপুরের পাখিহত্যার ঘটনা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে এবং পাখিহন্তারকদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করলে তাঁদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয় বলে প্রকাশ।
বাবুই একটি ছোট প্রজাতির পাখি। শুধু ধানই খায় না। ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড়ও খায়। বিশেষ করে ধানে যখন দুধ আসে তখন অনেক পোকা তা খেয়ে ফেলে। পাখি এসব পোকা খেয়ে সাবাড় করে কৃষকের ফসল বাঁচিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়। পোকা খেয়ে পাখিরা যে-বিষ্ঠা বা মল ত্যাগ করে তাতে জমি উর্বর হয় এবং ধানের ফলন ভালো হয়। আসলে বাবুই ও চড়ুই পাখির মতো ছোট পাখি যখন ধানক্ষেতে চরে তখন কৃষকের লাভই হয়ে থাকে বেশি। তাই বলা চলে যেসব পাখি ধানক্ষেতে চরে এবং কিছু ধান খায়ও, সেগুলো আসলে ফসলের বরকত। আজকাল একরে ধান উৎপাদন হয় প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মণ পর্যন্ত। ১০০/২০০ বাবুই পাখি ধান খেলেও কয় মণ খাবে? না হয় খেলোই দুয়েক মণ? এতে আর কতটুকুইবা ক্ষতি হতো? কিন্তু পোকামাকড় খেয়ে যে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে পাখির ঝাঁক তা খেয়াল করেছেন?
সামান্য পরিমাণ ধান বাবুইপাখিতে খেয়েছিল বলে ওদের বাসা নষ্ট করে ছানাগুলোকেও পানিতে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। কী মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতা পাখিদের প্রতি! আল্লাহও হয়তো এমন পাশবিকতা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই এমন ঘটনার পরপরই হয়তো আল্লাহ তায়া’লা দেশের কয়েকটি অঞ্চলে দুর্যোগপূর্ণ এবং গরম আবহাওয়া প্রেরণ করেন। ফলে হাজার হাজার একর জমির বোরোধানে চিটা পড়ে যায়। প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম হাওয়া প্রবাহিত হয় দেশজুড়ে। এতে পিরোজপুরসহ রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ এবং বৃহত্তর সিলেটের হাওড় অঞ্চলের বোরো ধানক্ষেত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ধান নষ্ট হবার সচিত্র খবর চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে সম্প্রচারিত হতে দেখা গেছে। সংবাদপত্রগুলোতেও খবর ছাপা হয়েছে। বোরো ফসলের এমন ক্ষতি হয়তো প্রকৃতির প্রতিশোধ নয়। তবে সামান্য পরিমাণ ধান পাখিতে খাওয়াতে ওতোগুলো অবোধ পাখির ছানাহত্যার সঙ্গে এমন দুর্যোগের একটা সম্পর্ক মেলাতে পারি বৈকি।
যাই হোক, স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পাখিহন্তারকদের আদালতে সোপর্দ করে শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। এতে মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতার উপযুক্ত বিচার হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য নজির হয়ে থাকবে অনেক দিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ