রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ঝংকারময় ছড়ার বই ‘খোকন সোনার লাল ঘোড়া’

 

আদিল মাহমুদ:

‘সবুজপাতার ফাঁকে ফাঁকে নীল জোনাকি উড়ে/মিটিমিটি জ্বলছে আলো একটুখানি দূরে। জোনাক পোকা মিষ্টি হেসে আলো দিলো জ্বেলে/ছোট্টপরী এবার তুমি দিশা বোধয় পেলে?’ [জোনাকির আলো]

কবি শরিফ হাসানাতের ছড়া আমি নিয়মিত পড়ি। তার ছড়ার মধ্যে আমি লক্ষ্য করি, আনন্দ-হাসির আড়ালে জীবনের দুষ্টক্ষতগুলো চিহ্নিত করার এক আশ্চর্য চিহ্নায়ক। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল উদ্দীপক ব্যঞ্জনাধর্মী ছড়া রচনায় বর্তমানে তিনি অন্যতম। তাঁর শিশুতোষ ছড়া কবিতায় শুধু শিশুদের কৌতূহল নয়, বরং তাদের বঞ্চনা, লাঞ্চনা ও উৎপীড়নের কথাও আমি দেখি।

কদিন আগে পড়েছি শরিফ হাসানাতের ‘খোকন সোনার লাল ঘোড়া’ নামক ছড়ার বইটি। বইটি মূলত শিশু-কিশোরের জন্যে হলেও যে কোন বয়সের মানুষ স্বচ্ছন্দে পড়া শুরু করতে পারেন। আপনি ত্রিশ বছরের টগবগে যুবক কিংবা সত্তর বছরের থুরথুরে বুড়ো হন তাতে কিচ্ছু যায় আসে না, কারণ একটুও বিরক্ত হবেন না।  এই বই যে কোন বয়সের যে কোন রুচির মানুষকে আন্দোলিত করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে বেশ কিছু ছড়ায় তিনি শিশু-কিশোর মনকে চমৎকৃত করেছেন এক কাল্পনিক ও ভিন্ন ধরনের ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে। কি চমৎকার কথা— ‘একের পরে এক ইস্টিশন/এসে যখন থামে। যাত্রী সবাই ব্যাগ কাঁধে নেয়/ধুম ধারাক্কা নামে। ট্রেনে চড়ে হরেক মানুষ/ফিরে নিজের বাড়ি। সাপের মতো রেল চলে যায়/পিঁপড়া সারি সারি।’ [রেলগাড়ি]

‘খোকন সোনার লাল ঘোড়া’ বইটি শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত বলে এখানে খুব সহজ, সরল ও ঝংকারময় শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ভাবের সাথে ছন্দের অপরূপ সঙ্গতি রেখে শিশুদের হাত-পা নাড়ার ভঙ্গিতে সহজ সুন্দরভাবে ছড়া উপস্থাপন করা আছে। শিশু-কিশোরদের জন্য বিষয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই বলতে গেলে, এখানে তেমন কোন নির্দিষ্ট বিষয় নেই। সবকিছু নিয়েই ছড়া লেখা আছে। এসব ছড়া ভাবের দোলায় নৃত্যচপল ভঙ্গিতে সুর ও সঙ্গীতের টানে শব্দের মিছিল তৈরি হয়েছে। শিশুদের মনকে আকৃষ্ট করার জন্য এ কাব্য-ভঙ্গি অত্যন্ত উপযোগী। শরিফ হাসানাত অত্যন্ত সফলভাবে শিশু-মনস্তত্ত্বের দিকে খেয়াল রেখে ছড়ার বিভিন্ন চরণ রচনা করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ কিছু চরণ উদ্ধৃত হলো—

ক. মজার কথা শুনছে সবে খোকার দাদুর মুখে/ঈদ মহিমা জেনে সবাই থাকি যেন সুখে। [ঈদুল ফিতর]

খ. রবির কিরণ মেখে গায়ে/সূর্যমুখী দেয় হাসি। ফুলবালিকার মনে বাজে/ভীষণ সুখের বীণ বাঁশি। [সূর্যমুখী ও ফুলবালিকা]

গ. হুতুম পেঁচা ভুতুম পেঁচা/তাকায় বড়ো চোখে। আঁধার রাতে ডালে বসে/শিকারী প্যাঁচ জোখে। [হুতুম পেঁচা]

ঘ. শুক্রবারে গাঁয়ের মাঠে/ঘোড়দৌড়ের যুদ্ধ। রিহার্সেলের খুঁটিনাটি/সব করেছে শুদ্ধ। [খোকন সোনার লাল ঘোড়া]

ঙ. ভোর হলে চোখ মেলে/ফুলখুকি দেয় উঁকি/বাতায়ন/খুলে। গাথা সুর কী মধুর/পাখি সব করে রব/পালায়ন/ভুলে। [ফুলখুকি]

চ. এই পৃথিবীর কত কিছু/শিখছি দিবারাতে। খুঁজে বেড়াই দিগবলয়ে/প্রদীপ জ্বেলে হাতে। [পাঠশালা]

ছ. সূর্যমুখী ফুল বাগানে/হলদে রঙে টেউ খেলে। মুগ্ধ হয়ে একটি মেয়ে/হাঁটছে দুটি হাত মেলে। [সূর্যমুখী]

শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্ব বিষয় নিয়ে ভাবে না। ভাব, ছন্দ, সুর তাদের মনকে আপ্লুত করে। শরিফ হাসানাত এই বইয়ে প্রতিটি চরণে ভাব-ছন্দ-সুরের এক ধরনের জাদুকরি মোহগ্রস্ততা সৃষ্টি করেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য তাই এর আবেদন অপরিসীম। খেলাখেলা ভাব নিয়ে তারা অনায়াসে এসব চরণ আবৃত্তি করতে পারে। সুনিপুণ কৌশলে তিনি শিশু-কিশোর মনে সুন্দর ভাব সৃষ্টি, অজানাকে জানার এবং সুন্দর জীবন গড়ার শিক্ষাও তার ছড়ার মধ্যে দিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু সেটা এত সহজ, স্বাভাবিক, সাবলীল ও অনায়াস ভঙ্গিতে যে, শিশুরা তাদের অবচেতন মনে  সহসাই যেন এগুলো ধারণ করে নিতে পারে।

আমি শরিফ হাসানাতের ‘খোকন সোনার লাল ঘোড়া’ পড়ে কাক্সিক্ষত স্বাদ পেয়েছি। বইটি আপনিও কিনতে পারেন এবং অনায়াসে পড়া শুরু করতে পারেন। কবির জন্য ভালোবাসা রইলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ