শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

কান্নার লাইসেন্স চায় জহির সাদাত

তাজ ইসলাম :

সৃষ্টিশীল মন শত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে মনোনিবেশ করে আপন সৃষ্টিতে। শত ব্যস্ততার মাঝেও বের করে নেয় কিছু সময়।

জহির সাদাত উচ্চ শিক্ষার জন্য যাপন করছেন  প্রবাস জীবন। প্রবাসে থেকে ও নিরন্তর করে যাচ্ছেন কাব্যসাধনা। প্রবাসের একাকিত্ব,স্বদেশ- স্বজনদের নৈকট্যহীন পরিবেশেও দেশ,জাতি,সমাজ,মানবতার ভাবনা অঙ্কিত হয় তার কাব্যের ভাঁজে ভাঁজে।

কবিতা প্রেমিক এ প্রবাসী কবি ৩৮ টি কবিতা দিয়ে পাঠকের সমীপে পেশ করেছেন কান্নার লাইসেন্স  নামক তার দ্বিতীয় কবিতার বই। মনোরম প্রচ্ছদ  আর মানসম্মত কাগজ,ঝকঝকে ছাপা   দৃষ্টি কাড়বে প্রথমেই পাঠকের চোখ। তারপর পাঠে প্রশান্ত হবে পাঠক আত্মা।

ইতোমধ্যে  তার দ্বিতীয় কাব্য কান্নার লাইসেন্স পাঠকের হাতে ।

জাগতিক জীবনের শত ঘাত প্রতিঘাতের মাঝেও কবি জহির সাদাতের কল্পনায় খেলা করে পরম প্রভূর নামের তাসবী। লোভের পৃথিবী তাকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। অভিশপ্ত আত্মার ধোঁকার জাল ছিন্ন করে তার সামনে ভেসে ওঠে  “ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম  নামক সহজ, সরল পথ। জহির মূলত বিশ্বাসের অনুরণন তোলেন কবিতার দেহে। তিনি লিখেন  সিদরা থেকে জরিন হরফ আসল বুকের মাঝে/ সীনার ভেতর কেমন যেন প্রেমের নূপুর বাজে/ নূপুরের শব্দে কবি বিচলিত হন। অনুভব করেন” রহম ভরা দিলের মাঝে লাগছে কিসের টান/ ভেতর থেকে বলল কে যে কোরানের উঠান/ (জরিন হর্ফি তান)।

জহির কবি। তবে ভ্রান্ত পথিক নন। কবিদের অনেকেই বিভ্রান্ত উপত্যকায় বিচরণ করে। জহির সাদাত সরল পথের পথিক। আর এ পথের পথিকেরা মনের আনন্দে চুম্বনে দুনিয়া বিলিয়ে দিতে পারে শত সহস্র বার”।যখন পঁচন ধরে মানুষের মনে/ ক্ষীণ হয়ে যায় বিবেকের মজবুত সিঁড়ি / যখন অসহায় মানবতা রক্ষার জন্য / থাকে না কোন সুস্হ বিবেক/...যখন আত্মার বাঁধন ছিড়ে যায়/ধ্বংস হয়ে যায় মানবতার পিরামিড /( আহত পৃথিবী)। তখন এর পরিণতি কী হতে পারে? কবি বলেন তখন  খুলে যায় ঝড়ের আস্তিন” তখন আজাব নিয়ে  ধেয়ে আসে অদৃশ্য সৈনিক” আর  তখন আহত পৃথিবী ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস ।

অনুপ্রাস কবিতায় শ্রবণ মধুর হয়। অনুপ্রাস আর শব্দের পৌনঃপুনিকতা এক বিষয় না। একটি কবিতায় একই শব্দের বারংবার প্রত্যবর্তন কবির অসচেতনতা এবং শব্দভান্ডারের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। 

এ বিষয়ে একজন কবিকে চোখ কান খোলা রাখা আবশ্যক। তরুণ বলে কথা না কবি মাত্রই এই সব ছোটখাট বিষয়ে নজর রাখতে হবে। বিষয়টি খোলাসা করার জন্য একটা উদাহরণ টানতে পারি। চারিদিকে (আঁধার) খেলা করে/ঝলমলে আলোর নিচে (আঁধার),  প্রেয়সির মনে (আঁধার) এখানে সচেতনভাবেই আঁধারের বিকল্প খুঁজতে  হবে, তবেই কবির শক্তিমত্তা প্রকাশ পাবে।

কবিতার শিরোনাম ইসরাফিলের সিংঙা কবিতার ভিতরে লেখা হয়েছে সিঙ্গা। কাজেই এখানে কবির ভুলের চেয়ে ভুলের দায়ভার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাঁধে বর্তায় বেশি। বানান ভুল যদিও কবির হয়ে থাকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান উদাসীন না হলে সে ভুলের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। আমার মনে হয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধির জন্য এই দায়িত্বটা আরও গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে।

আরো একটি  চরণ এখানে উল্লেখ করি  মনে স্হানে - স্হানে গড়ব প্রেমের আসর” এটা যদি এভাবে হত মনের স্হানে - স্হানে গড়ব প্রেমের আসর”। এই বিচ্চুতিগুলি দৃষ্টিকটু হয়। এগুলো বড় কোন ভুল নয় তবে বড় উদাসীনতা। লেখকের চেয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের দায়হীনতা প্রকট। প্রকট এজন্য বলছি দেখুন তারা বইটি প্রকাশ করেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ কে কেন্দ্র করে কিন্তু প্রিন্ট হয়েছে ২০২০১,  কী হল! কুড়ি হাজার দুইশ এক। বিষয়টি ভুলের থেকেও গা ছাড়া ভাবই বেশি।

কবি জহির সাদাত ছন্দ জানেন। তিনি  ছন্দের তালে তালে এগিয়ে নেন নিজের কবিতা। কবিতায় কখনো অন্তমিলের আশ্রয় নেন, কখনো অন্তমিলহীন এগিয়ে চলা। তবে চলতে চলতে কোথাও কোথাও ছন্দের তাল হারিয়ে ফেলেন। এর জন্য কবির কান হতে হবে খরগোশের কানের মত খাড়া। বিশেষত বই আকারে প্রকাশের আগে কবিতাকে বার বার যতœ করতে হবে। তখন একমাত্রা আধ মাত্রার পতন রোধ করা সহজ হবে। 

জহির সাদাতের কাব্যচিন্তায় আছে মানবতা,বিশ্বশান্তি,নিজের দেশ আর আছে নিজের সমাজ বিনির্মাণের প্রগাঢ় ভাবনা। কবির কল্পনায় ভেসে ওঠে  আমার পতাকা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায় নিষ্পেষিত জাতিকে”কিংবা লাল রঙের পোস্টারে ছেয়ে যায় সমগ্র শহর/ যেখানে শিল্পীর আপন গরিমাশ অঙ্কিত/ ‘মুক্তি চাই,মানবতার মুক্তি’ ( মুক্তি চাই)।

কবিতার পথ বিশাল, বিস্তৃত পথ। এপথে হেঁটে চলছে অগণিত পথিক। অগণিত পথিকের মাঝে নিজেকে অনন্য করে নিতে হলে একজন কবিকে পাঠ করতে হবে শ্রেষ্ঠ কিছু কবির কবিতা। সমসাময়িকদের কবিতাগুলো পাঠ করে নিজেকে হাজির করতে হবে ভিন্ন রকমভাবে। একজন কবিকে শিখিয়ে দেয়া যায় না। 

কবি তার নিজের শিক্ষক নিজে। প্রচলিত পথে হাঁটতে হাঁটতেই আবিষ্কার  করবে আপন পথ। যে পথ কবির একান্ত,কবিতা হবে তার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। ভিন্নরকম না হলে,কবিতা তাকে চিহ্নিত না করলে গতানুগতিকতায় একজন কবি শত কবির মাঝে মিলিয়ে যায়, পাঠক তাকে তখন স্মরণে রাখতে কষ্ট হয়। জহির সাদাত  উচ্চ শিক্ষিত তরুণ কবি। তিনি সাহিত্যে নিজের আসন পাকাপোক্ত করবেন বলেই আশা করি। 

চিন্তার অভিনবত্বে, ছন্দের ঝংকারে, উপমা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাসের চমকপ্রদ প্রয়োগে অনেকের মাঝে অনন্য হয়ে উঠুক জহির সাদাত এটি তার শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে আমাদের আকাঙ্খা। মেধাবী এই তরুণের কাছে এ চাওয়া বেশি কিছু না।  কান্নার লাইসেন্স  শীর্ষক বইয়ে তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। পরবর্তী বইয়ে থাকবে সে মেধার তীব্র ঝলকানি। আমরা কবির উত্তরোত্তর কল্যাণ কামনা করি। কান্নার লাইসেন্স  প্রথম প্রকাশ ২০২১। প্রচ্ছদ শিল্পী আল জাবিরী। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শব্দশিল্প প্রকাশন। মূল্য  একশত পঞ্চাশ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ