বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

সাহিত্যিক ও সংগঠক মুহম্মদ মতিউর রহমান

ওয়াহিদ আল হাসান:

সাহিত্য-সংস্কৃতির ছোট্ট জীবনে বহু মনীষী, পণ্ডিত ও গুণীজনকে দূর ও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু মতিউর রহমান স্যারের মতো এমন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় মহৎ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ খুব কমই পেয়েছি। সারাজীবন ইসলামি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। জীবনের একমুহূর্তও বসে থেকে অলস সময় পার করেননি। সাহসের সাথে বক্তৃতা ও লেখার মাধ্যমে সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সামাজিক, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। যুক্ত থেকেছেন নিজ গ্রাম থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের প্রায় ২৫টিরও বেশি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে। 

১৯৫৭ সালে কলেজে পড়াকালীন তার পৈত্রিক নিবাস এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘চর বেলতৈল গুডউইল ক্লাব’ এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রথম কোনো দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বড় যে কাজটি করেছেন সেটি হলো ১৯৯৮ সালে কবি ফররুখ আহমদ গবেষণামূলক সংগঠন ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা। যেটির প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘ফররুখ একাডেমি’। আজীবন সেই সংগঠনের সভাপতির পদটি অলংকৃত করেছেন। বছরে কমপক্ষে দুটি স্মরণসভার (জন্ম ও মৃত্যু দিবসে) আয়োজন করেছেন। এ উপলক্ষে মাঝে মাঝে গুণীদের মাঝে ‘ফররুখ গবেষণা পুরস্কার’ প্রদান করেছেন। এছাড়া প্রতি ৬ মাস পরপর ‘ফররুখ একাডেমি পত্রিকা’ সম্পাদনা করেছেন। যেখানে কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বিভিন্ন মূল্যায়নধর্মী লেখা স্থান পেয়েছে। 

তার কাজের কে মূল্যায়ন করলেন আর কে করলেন না তা কখনও ভেবে দেখেননি বরেণ্য এই ফররুখ গবেষক। বরং আজীবন আন্তরিক ভালোবাসা ও দায়িত্বের সাথে সাহিত্যচর্চা, লেখালেখি ও সংগঠনকে সময় দিয়ে গেছেন। বড় আশ্চর্যের ব্যাপার হলো চুরাশি বছর বয়সেও তিনি এসব কাজ তরুণ্যদীপ্ত মনে সাবলিল ও সুন্দরভাবে করে গেছেন।

আজ থেকে ৮ বছর আগের ছোট্ট একটি স্মৃতি। ‘মাসিক ফুলকুঁড়ি’ পত্রিকায়  একটি লেখার জন্য স্যারের বাসায় যাই। নির্ধারিত সময়সূচি মতো সন্ধ্যার পর গিয়ে দেখি তিনি সাহিত্য রচনায় ব্যস্ত। স্যার অনর্গল মুখে বলে যাচ্ছেন আর তার ব্যক্তিগত কম্পিউটার অপারেটর তা কম্পোজ করছেন। শেষজীবনে দীর্ঘদিন তিনি এভাবেই ছোটো-বড়ো অসংখ্য গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে তিনি লম্বা সময় ধরে উঁচুস্বরে উৎসাহ ও প্রেরণামূলক বক্তব্য দিতেন। তার প্রতিটি বক্তৃতায় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয় ফুটে উঠতো। বক্তব্যের স্বর শুনে মনে হতো বক্তা শারীরিকভাবে একজন বয়োবৃদ্ধ হলেও ২৫ বছরের কোনো তরুণ বক্তৃতা করছেন। তার মতো এমন তারুণ্যময় বক্তব্য খুব লেখকই দিতে পারেন।

খ্যাতিমান এই শিক্ষাবিদ ১৯৩৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চর নরিনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা - আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী, মাতা- মোসা. আছুদা খাতুন। একসময়ের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মেধাবি ছাত্র তার কর্মজীবনের শুরু থেকে ১৬টি বছর অধ্যাপনা করেন ঢাকাস্থ সিদ্ধেশ^রী কলেজে। এছাড়া বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। সবশেষ ২০০৩-’০৯ ঢাকাস্থ এশিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এ প্রফেসর ও বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেই ১৯৫০ সালের কথা। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশুনা করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন কবিতার মাধ্যমে লেখালেখি শুরু করা এই প্রখ্যাত লেখক পরবর্তীতে গবেষণামূলক রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার গবেষণামূলক প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে ‘দৈনিক আজাদ’ এর সাহিত্যপাতায়। এরপর থেকে আজীবন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করে গেছেন। তবে তার সাহিত্য জীবনে সবচেয়ে বেশি বিচরণ করেছেন প্রবন্ধে। সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ লিখে গেছেন।

একটি বিষয়ে কিছু কথা না লিখলেই নয়! “যেদেশে গুণীর কদর হয় না সেদেশে গুণীর জন্ম হয় না।” বরেণ্য ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি যেনো অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান স্যারের জন্য যৌক্তিকভাবে প্রযোজ্য। কারণ ৮৪ বছরের জীবনে ৭০ বছর ধরে লেখালেখি করার পাশাপাশি ৬৪ বছর ধরে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনকারী এই গুণী সাহিত্যিক ও সংগঠক তার লেখক ও সংগঠক জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ খুব বেশি পুরস্কারে ভূষিত হননি। তথ্যমতে, বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল ও দুবাই কর্তৃক স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হন ১৯৯৬ সালে। অথচ আজীবন তিনি বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অসংখ্য গুণীকে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদান করে গেছেন। তিনি বিভিন্ন সময় এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার প্রায় ২০টি দেশ ভ্রমণ করেন।

মরহুম এই প্রবীণ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠক ছোটো-বড়ো সকল বয়সের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন।

বিশেষ করে তরুণ ও যুবকদেরকে একটু বেশিই কাছাকাছি আগলে রাখতেন। তরুণদেরকে তিনি কত যে ভালোবাসতেন এবং স্নেহের পরশে আগলে রাখতেন তার দুটি ছোট্ট উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছিÑ

প্রথমটি আজ থেকে প্রায় একযুগ আগের কথা। জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন আয়োজিত কবি ফররুখ আহমদ স্মরণে আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন আরেক সদ্য মরহুম কবি ও ফররুখ গবেষক মহিউদ্দিন আকবর। যিনি স্যারের একদিন পূর্বে ইন্তেকাল করেন। তিনি আলোচনার ফাঁকে আমাকে ফররুখ নিবেদিত একটি গান পরিবেশনা করার ঘোষণা দেন। আমি ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে গান শুরুর পূর্বে বরাবরের মতো গানটির কথা, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর নাম (আমিরুল মোমিনীন মানিক) উচ্চারণ করি। সাথে সাথে মঞ্চে বসা অনুষ্ঠানের মধ্যমণি অধ্যাপক মতিউর রহমান স্যার বলে উঠলেন, ‘হাসান, তুমি কি জানো মানিক আমার সরাসরি ছাত্র?’ উত্তরে বললাম, ‘ জি¦ না স্যার, এখন জানলাম। দুআ করবেন স্যার আমাদের জন্য।’ অনুষ্ঠান শেষে স্যারের সাথে বিস্তারিত পরিচিতিমূলক আলাপ হয়। সেদিনের সেই আলাপচারিতাই ছিলো স্যারের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো একান্ত ও গভীর সান্নিধ্য লাভ। এরপর থেকে গান গাওয়ার জন্য তিনি নিয়মিতই দাওয়াত দিতেন।

দ্বিতীয়টি গত ২৪ মার্চ’২১ রাতের ঘটনা। যেটি ছিলো মরহুম অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান স্যারের সাথে সবশেষ কথা। সেদিন রাত সোয়া ১০টায় তিনি কল করেছিলেন। প্রথমে কল ধরতে না পারলেও সাড়ে ১০টায় কল ব্যাক করে কথা হয়। কুশল বিনিময় শেষে কল দেয়ার কোনো বিশেষ কারণ জানতে চাইতে চাইলাম। কারণ তিনি কল করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিশেষ করে ফররুখ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বছরে দুবার ফররুখ স্মরণসভায় (জন্ম ও মৃত্যু) নিবেদিত গান গাওয়ার জন্য দাওয়াত দিতেন। এছাড়া মাঝে মাঝে আদর করে জানতে চাইতেন, কেমন আছো হাসান? এছাড়াও পরিবারের খোঁজখবর নিতেন, বাসায় যেতে বলতেন। যদিও সবসময় যেতে পারতাম না। 

স্যার উত্তরে বললেন, ‘না তেমন কিছু না। এমনিতেই কল করেছিলাম। কিছুদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডায়ালাইসিস করে চলছি। তবে যেদিন ডায়ালাইসিস করি সেদিন শরীরটা খুব খারাপ থাকে, চলাফেরার শক্তি থাকে না। দুআ রেখ হাসান।’ এগুলোই ছিলো স্যারের সাথে শেষ কথা। 

আজও কথাগুলো বার বার কানে বাজে। চলে যাওয়ার সংবাদ জানার পর থেকে মনে হয়, স্যার চলে যাবেন বলেই হয়তো আমার মতো নগণ্য মানুষটিকে স্মরণ করেছিলেন। হে আল্লাহ তুমি স্যারকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করো, আমিন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ