মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
Online Edition

রাজধানীর অলিগলিতে ও অনলাইনে ইফতারি বিক্রি 

কঠোর লকডাউনের মধ্যেও রাস্তার পাশে ইফতারি কেনাবেচা। ছবিটি গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নারিন্দা এলাকা থেকে তোলা -সংগ্রাম

মুহাম্মদ নূরে আলম: সুস্বাদু খাবারের জন্য পুরান ঢাকার মানুষের আলাদা একটা সুনাম রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই পুরান ঢাকার ইফতার বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্য। কিন্তু করোনায় কঠোর লকডাউনে বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার প্রভাব পড়েছে ইফতারি বাজারেও। লকডাউন থাকার কারণে এবারের রমযানে অনলাইনে ইফতারির অর্ডার বেড়েছে কয়েক গুণ। রাজধানী হিসেবে ঢাকার ৪০০ বছরের সঙ্গে চকবাজারের এই ঐতিহ্যবাহী ইফতারের আয়োজনও হয়ে আসছে বলে জানান স্থানীয়রা। করোনার আগে রমযান মাসে দুপুরের পর থেকে পুরান ঢাকার চকবাজারের শাহি মসজিদ রোডে ঐতিহ্যবাহী বাহারি সব ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসতেন ব্যবসায়ীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার বাসিন্দারাসহ নগরের নানা প্রান্তের মানুষ ইফতারসামগ্রী কেনার জন্য সেখানে ভিড় করতেন। ঢাকায় ইফতারির বাজার বললে প্রথমেই চলে আসে পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারির জমজমাট বাজারে কথা। হাজারও লোকজনের সমাগম হয় এ বাজারে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে বাজার জমজমাট থাকতো, এবার সেখানে কোনও বাজারই বসেনি। মূলত চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনের সড়কে ইফতারের অস্থায়ী বাজার বসে প্রতি বছর। গত বুধবার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় কোনও ইফতারির দোকান বসেনি। স্থায়ী কিছু রেস্তোরাঁ আর কয়েকজন ফেরিওয়ালা ছাড়া কোনও দোকান খোলা নেই। এদিকে লকডাউন থাকার কারণে এবারের রমযানে অনলাইনে ইফতারির অর্ডার বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি। সময়ের ফেরে অনলাইনে খাবার বিক্রি যে বেড়েছে, সেটি টের পাওয়া গেল গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার বেইলি রোডে। দুপুরের পর সড়কে অন্তত ২০ জন যুবক পাওয়া গেল, যাঁদের কাঁধে বড় ব্যাগ, যারা ইফতারির পার্সেল নেওয়ার জন্য এসেছেন। ইফতারির পার্সেল নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছে দেবেন ক্রেতার বাসায়। এদিকে পুরান ঢাকায় চকবাজার এলাকায় লকডাউনে টহলরত বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনসমাগম এড়াতে এবার ইফতারের বাজার বসতে দেয়া হয়নি। বরং সবাইকে সচেতন করতেই তারা এখন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।

এদিকে, রাজধানীর মুগদা-মান্ডা, বাসাবো, খিলগাঁ, মালিবাগ, রামপুরা, মগবাজার, মধুবাগ, ইব্রাহিমপুর, মিরপুর ১০, ভাষানটেক, পল্লবী, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্টে ইফতার তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। কাজীপাড়া বিসমিল্লা হোটেলের মালিক আবু তাহের জানান, গতবার আমরা ইফতার বিক্রি করতে পারিনি তবে এইবার দোকানের ভেতর ইফতার তৈরি করছি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং আমরা সেটা পার্সেল করব। চকবাজারের ফুটপাতে গত ২৫ বছর ধরে নানা ধরনের ইফতার সামগ্রী বিক্রি করে আসছেন আসলাম উদ্দিন (৪২)। তিনি বলেন, গতবছর লকডাউনের জন্য ইফতারি বিক্রি করতে পারিনি। এই বছরও পুলিশের নিষেধাজ্ঞায় বিক্রি বন্ধ। আসলাম জানান, পার্শ্ববর্তী উর্দু রোডের বাসা থেকে বড় বাপের পোলায় খায় সহ মুরগি এবং নানা ধরনের কাবাব তৈরি করে এখানে এনে বিক্রি করতেন। তার বাপ-দাদা এবং এলাকার মুরুব্বিরা দীর্ঘকাল ধরে ফুটপাতে ঐতিহ্যবাহী ইফতার বিক্রি করে এসেছে।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লকডাউন চলাকালে রাস্তায় কোনও ধরনের ইফতারির দোকান না বসার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে বিষয়টি স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও জানানো হয়েছে। মূলত এ কারণেই এবার কোনও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেনি চকবাজারে। তবে কেবল স্থানীয়রাই নয়, লকডাউনের মাঝেও আশেপাশের  এলাকা থেকে কেউ কেউ  এসেছিলেন চকবাজারের ইফতারি কিনতে। জামশেদ আলাম এসেছেন ঝিগাতলা থেকে। তিনি বলেন, প্রত্যেক বছর প্রথম রোজায় চকবাজার থেকে ইফতারি কিনে নিয়ে যাই, এবারও আসলাম। কিন্তু কোনও দোকান বসলো না। রাস্তায় ইফতারির দোকান না বসায় আলাউদ্দিন সুইটমিটে ভিড় করছেন ক্রেতারা

দেখা গেছে, চকবাজারে যে কয়েকটি রেস্তোরাঁ খোলা ছিল তাতেও বেচাকেনা খুব বেশি হচ্ছে না। আলাউদ্দিন সুইটমিটের বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, এবার লকডাউনের কারণে বেশি আইটেমের আয়োজন করা হয়নি। তারপরও প্রত্যাশিত ক্রেতা না থাকায় সেগুলো অবিক্রিত থেকে যেতে পারে। হাতে গোনা  তিন থেকে চারটি স্থায়ী দোকানে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করতে দেখা যায়। অন্য সময় হরেক পদের যেসব ইফতারসামগ্রীর দেখা মিলত, এবার দেখা যায়নি। তবে চকবাজারের বিখ্যাত শাহি জিলাপি, শাহি পরাটা, সুতি কাবাবের দেখা মেলে। চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারসামগ্রীর মধ্যে আছে বড় বাপের পোলায় খায়, সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শাহি পরোটা, শাহি জিলাপি, দইবড়া, বাটার নান, মুরগি আচারি। এক কেজি ওজনের একেকটি শাহি জিলাপির দাম দেড় শ থেকে দুই শ টাকা।

বদলে গেছে বেইলি রোডের ইফতারি বাজার: বেইলি রোডের গুটিকয়েক স্থায়ী দোকানে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে ইফতারের পসরা সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় ছিলেন দোকানিরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ক্রেতা ভিড় করতে থাকেন। তবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ইফতারি বিক্রির খবর পেয়ে ছুটে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশের পক্ষ থেকে দোকানিদের কড়া ভাষায় বলে দেওয়া হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যেন ইফতারসামগ্রী বিক্রি করা হয়। বেইলি রোডে ক্রেতাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম ছিল। 

বেইলি রোডের কয়েকজন দোকানি গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইফতারসামগ্রী বিক্রির চেষ্টা করে আসছেন তাঁরা। লোকজনকে বলার পরও তাঁরা ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ব না মেনে দোকানের সামনে ভিড় করছেন।

অনলাইনে ইফতারির অর্ডার এবার বেশি: সময়ের ফেরে অনলাইনে খাবার বিক্রি যে বেড়েছে, সেটি টের পাওয়া গেল গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার বেইলি রোডে। দুপুরের পর সড়কে অন্তত ২০ জন যুবক পাওয়া গেল, যাঁদের কাঁধে বড় ব্যাগ, যারা ইফতারির পার্সেল নেওয়ার জন্য এসেছেন। ইফতারির পার্সেল নিয়ে যথাসময়ে পৌঁছে দেবেন ক্রেতার বাসায়।

পাঠাও ফুডের আলম হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, সারা দিনে প্রায় আটটি ইফতারির পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার অর্ডার পেয়েছেন। ইফতারের আগে এসব পার্সেল নিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। রাস্তা ফাঁকা, তাই যথাসময়ে পৌঁছে দিতে পারবেন। কঠোর সরকারি বিধিনিষেধে রেস্তেরাঁয় বসে খাবার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে অনলাইনে খাবারের পার্সেল বিক্রির অনুমতি আছে খাবার দোকানগুলোর। বেইলি রোডে অনলাইনে ইফতারির পার্সেল বিক্রি হয়েছে বেশি।

বেইলি রোডের নামকরা নবাবী ভোজ নামের দোকানটির কর্মচারী আল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রত্যেক বছর যেভাবে ইফতারি কেনার জন্য মানুষের ভিড়ভাট্টা হয়, এ বছর সেই ভিড় নেই। রাস্তায় ইফতারির কোনো দোকান নেই। তবে অনলাইনে ইফতারির অনেক পার্সেল বিক্রি হচ্ছে।

কঠোর লকডাউনের ভেতর বেইলি রোডে ইফতারি কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবদুল হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, রমযান মাসের প্রায় প্রতিটি দিন তিনি বেইলি রোড থেকে ইফতারি কেনেন। রাস্তাজুড়ে বাহারি সব ইফতারি আর মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে এই রোড। কিন্তু করোনায় পাল্টে গেছে সবকিছু। বেইলি রোডের চিরচেনা ইফতারির বাজার আজ হয় তো নেই। তবে আশা করি, আগামী বছর আবার আগের রূপে ফিরে যাবে বেইলি রোডের ইফতারি বাজার।

কথা হয় চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) কবির হোসেন হাওলাদার গণমাধ্যমকে জানান, গত বছরের মতো এবারও ফুটপাতে ভিড় জমিয়ে এই ইফতার বিক্রি করতে পারবে না। এ ব্যাপারে আমরা এলাকায় মাইকিং করেছি। তবে কোনো দোকানের ভেতরে কেউ ইফতার তৈরি করলে সেটি বিক্রি করতে পারবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ