শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

ডিজি সাহেব রাগ করেছেন

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমের ওপর খুব রাগ করেছেন। বুধবার এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের  ‘বিরূপ সমালোচনার’ কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল ভেঙে যাবে। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু পত্র-পত্রিকা আমাদের এমনভাবে সমালোচনা করছে, যেটা আমাদের মনোবলকে ভেঙে দিচ্ছে। আপনারা গঠনমূলক সমালোচনা করবেন, আমাদের পথ দেখাবেন, আমরা আমাদের শুদ্ধ করবো। বিরূপ সমালোচনা করলে আমাদের মনোবল ভেঙে যাবে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে দেয়া বক্তব্যের পুরোটা জুড়ে সংবাদ মাধ্যমে ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রতি তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই মহাপরিচালক। তিনি বলেন, চিকিৎসাকর্মীরা মানসিক চাপের মধ্যে আছেন। তাদের অনেকেই মানসিক বৈকল্যে ভুগছেন। সেজন্য চিকিৎসা সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সমবেদনা আশা করতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয় যে, ‘সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত বসুন্ধরা গ্রুপের হাসপাতাল উধাও’ হয়ে গেছে এবং এই খবরের জের ধরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এরই মধ্যে কড়া সমালোচনা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এই সংবাদে আপত্তি জানিয়ে ও ব্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বড়সড় বিজ্ঞাপন ছেপেছে। তিনি বলেন, ‘উধাও’ শব্দটার মধ্যে অসম্মানজনক ব্যাখ্যা আছে। তিনি দাবি করেন, বাস্তবতা বিবেচনা করে সে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং সেখানকার সরঞ্জামগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এই মহাপরিচালকের মতে, স্বাস্থ্যবিভাগের বিরূপ সমালোচনার ফলে কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাবে। আর মনোবল ভেঙে গেলে স্বাস্থ্যসেবা তো ব্যাহত হবেই। অতএব বিরূপ সমালোচনা  না করে তাদের কেবলই প্রশংসা করে যেতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে।

কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর কিংবা তারও বহু আগে থেকেই এই স্বাস্থ্য বিভাগ একটি লুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দুই টাকার মাল দুই হাজার টাকায়ও কেনা হয়েছে। একটি পর্দা কেনা হয়েছে ৭ লাখ টাকা দিয়ে। সিরিঞ্জ নিডল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি ক্রয় কোথায় চুরি নেই স্বাস্থ্য বিভাগে। এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। সেটা তুলে ধরা যাবে না। স্বাস্থ্য কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাবে। তা হলে ডা. সাবরিনার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের করণীয় কী ছিল। বলতে হতো, তিনি যা করেছেন, খুব ভালো কাজ করেছেন। নইলে  যে অন্যদের মনোবলও ভেঙে যেতে পারে। এ ধরনের নির্লজ্জ উক্তি করার শক্তি তিনি কোথায় যে পেলেন।

বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ২০২০ সালের মে মাসে সরকার একটি আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করে ৩১ কোটি টাকা খরচ করে। তখন বিতর্কিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সই করে বলেছিলেন যে, পৃথিবীর কোনো দেশ এত কম সময়ে এত বড় কোভিড হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারেনি। কিন্তু এই বিরাট সাফল্য সেপ্টেম্বরেই বন্ধ হয়ে যায়। মহাপরিচালক বলেছেন, বসুন্ধরা সেন্টারটি চালাতে মাসে ৬০ রাখের বেশি টাকা খরচ হতো। ১৫ থেকে ২০ জনের বেশি রোগী থাকত না। হাজারের বেশি জনবল ছিল, যাদের পেছনেও খরচ ছিল। 

পরবর্তী প্রেক্ষিতে সেন্টারটির প্রয়োজন না থাকায় তা সরিয়ে দেওয়া হয়। দারুণ যুক্তি।  যে সেন্টার বিশে^র মধ্যে সাফল্যের এক বিরল নজির, তা সরিয়ে নিলেন কেন? সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদফতর ধরেই নিয়েছিল যে, তারা এমন ফুঁ দেবেন যে, এক ফুৎকারে উড়ে যাবে কোভিডের বংশ। ফলে হাসপাতালটির আর দরকার কি? সে সেন্টার যদি চালু থাকতো  তাহলে বছরে ৬ কোটি টাকা খরচ হতো। হলে হতো। স্বাস্থ্য খাতে কতো হাজার কোটি টাকা চুরি হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। মহাপরিচারক ‘লম্বা লম্বা’ কথা বলছেন কেন?

বাংলাদেশেই তা হালে পানি পায়নি, বিশ^কে নাড়া দেবে কীভাবে?

এমন আর একটি হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেটে। ব্যয় হয়েছিল ১৩ কোটি টাকা। সেটি কোনদিন চালুই হয়নি। সরকার এখন সেখানে ২০০ বেডের আইসিইউ সুবিধা দিয়ে পুনর্গঠনের কাজ করছে। সরকারি বা জনগণের টাকা এভাবে দরিয়ায় ঢালা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও সরকার ধরে নিয়েছিল যে, তাদের ফুঁৎকারে চলে যাবে করোনা ভাইরাস। হাসপাতাল আর লাগবে না। ফলে উত্তর সিটির ঐ হাসপাতালের খোঁজ আর কেউ নেয়নি। সেখানে ধূলার স্তর পড়ে আছে। এই হাসপাতালে ছিল ১৩৯০টি বেড। কিন্তু সেটাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পান্থপথ তলায় নতুন হাসপাতাল তৈরির কাজ হচ্ছে। আবার লুঠের ফন্দি। এই হাসপাতালের বেডগুলো কেনা হয়েছিল বাজার মূল্যের ৫ গুণেরও বেশি দাম দিয়ে। মহাপরিচালক সাহেব, এ ব্যাপারে কিছু যে বললেন না।

এদিকে করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কাজের সমালোচনার জবাবে তিনি বিশেষজ্ঞদেরই এক হাত নিয়েছেন। তিনি তার সিনিয়রদের উদ্দেশে বলেছেন, তারা যখন সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তখন কী করেছিলেন? তারা এখন টেলিভিশনে বসে লম্বা লম্বা কথা বলেন। আমাদের হাসপাতালে চলুন, রোগীদের পাশে দাঁড়ান। সেটা না করে ঐ নিরাপদ বাক্সের ভেতর বসে এই টেলিভিশন থেকে ঐ টেলিভিশনে গিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন। টেলিভশনের নিরাপদ বাক্সে না থেকে বেরিয়ে আসুন। এই সরকারেরই চাকরি করছেন আপনারা। এই সরকারেরই সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। আজকে আপনি রিটায়ারমেন্টে গিয়েছেন, তার মানে এই নয় যে, আপনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। আপনি এমন কথা বলতে পারেন না, যে কাজটা আপনি করতেন আগে। তিনি বলেন, কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেবার কথা গত এক বছরে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হলেও, সেটির কোনো কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে না।

যোগ্য সরকারের যোগ্য প্রতিনিধি বটে এই মহাপরিচালক। তার কথার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে রয়েছে চরম বেয়াদবী। তার বক্তব্য থেকে তার কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে আঁচ করা যায়। জীবনের শিক্ষার কোনো পর্যায়েই তিনি আদব-কায়দা যে শেখেননি, তা তার উদ্ধৃত বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়। যিনি তার সিনিয়র, আগে হয়ত তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি আর সে দায়িত্বে নেই। তাকে এসে পাশে দাঁড়াতে হলে এই ডিজিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে? বেয়াদবির মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। তিনি তো এটাও শেখেননি যে, গুরুজনকে সম্মান করিবে। সদা সত্য কথা বলিবে।

তবে সমালেচনা অসহিষ্ণু সরকারের মতোই এই ডিজিও অতি মাত্রায় সমালোচনা অসহিষ্ণু। আমরা শুধু বলতে চাই, ধৈর্য ধরুন। সত্যকে গ্রহণ করুন। কাচের ঘরে বসে এলোমেলো ঢিল ছুঁড়বেন না। তাতে বিপদ বাড়বে। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরোবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ