শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ছড়া/কবিতা

কে আসে, কে আসে
-মোশাররফ হোসেন খান

বাতাস ও বারুদের হৃদপিণ্ড ভেদ করে
কে আসে, কে আসে
মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়াল দিয়ে
 আকাশ মুখরিত করে
 কে আসে, কে আসে ?
 জোয়ার ভাটার মথিত মাস্তুল জাপ্টে ধরে
 তুমুল বেগে কে আসে , কে আসে
 সমুদ্রকে স্তম্ভিত করে ক্রমাগত ধাবমান কে ?

 কে আসে পাহাড় ডিঙিয়ে
 তপ্ত মৃত্তিকার বুকে
 কার সুদৃঢ় পদক্ষেপ ?
 দর্পিত বাতাসকে অসহায় করে
 সমগ্র পৃথিবীতে ভেসে বেড়ায় কে?
 এ কার হুংকার ধ্বনি?
 আমি অবাক হয়ে শুনি !

 সকল বিস্ময়কে হার মানিয়ে দেয় কে?
কে আসে বন -বনান্তর ভেঙে
 বিলয় ও বিনাশের আগে ?

কার প্রতিচ্ছায়া ভেসে ওঠে অস্তরাগে?
 কার আগমনে বৃক্ষরাজি হাসে
 কার প্রতিবিম্ব অহর্নিশ ভাসে
সকল আঁধারের বিরুদ্ধে কার এতো উজ্জ্বল জ্যোতি?
সেকি দিন বদলের নতুন সূর্যের মতো তুমি?
বখতিয়ারের ঘোড়ার চেয়েও যার ক্ষীপ্রতর গতি

 বাতাস ও বারুদের হৃদপিণ্ড ভেদ করে
 কে আসে , কে আসে ?
বীরাঙ্গণা , নাকি অসীম সাহসী বীর
 তোমার প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছি অধীর! ...


জমিন
-আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

এক টুকরো মাটির জমিন।
মাঝে মাঝে হাত বদল হয়
চাষি শস্য ফলায় ফসল চাষ করে,
বর্গাদার আবাদ করে।

ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করে মানুষ,
সুখের আশায় মাথা গুঁজে থাকে বসতি,
রঙিন করে তোলে প্রাসাদ;
কাগজের পর কাগজ সাক্ষী থাকে,
এ জমিন তার, কার? কত দিনের?
কে বলতে পারে?

ধনীর বেখেয়ালি ছেলে-
বিক্রি দেয় দাসীর ছেলে কাছে
কেড়ে নেয় জোতদার দালাল।

আবার সৎ সাহসী-
ওয়ারিশ পায় ন্যায্য অধিকার,
খতিয়ানে চকচক করে নতুন প্রজন্মের নাম,
রাজাদের শাসনের মতো,
একটি প্রাণের চিহ্নও রাখে না।
এক টুকরো জমিন।


খই
-সায়ীদ আবুবকর

কেউ যেন খই ভাজছে কোথাও। সে-খইয়ের সুঘ্রাণে ভিজছে বাতাস।
যে-হাত ভাজছে এই খই, তার মুখে বিন্দু বিন্দু জমছে নিশ্চয় ঘাম,
যা সে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতেছে বারবার। হায়, তার মুখটাও কি
তামাটে উজ্জ্বল, আমার মায়ের মতো?

বাতাসে খইয়ের ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণ ছুটেছে আমাকে নিয়ে গোলপাতা দিয়ে
ছাওয়া আমাদের সেই মাটির হেঁশেলে। উত্তরে পুকুর। পশ্চিমে ছড়ানো
উঠোন, যেখানে হাঁস ও মুরগির দিনভর ছুটোছুটি। দক্ষিণে বাগান। আর
পুবপাশে নকশী কাঁথার মতো মাঠ। মাথার উপর শুধু নুয়ে পড়া নারকেল-
পাতা,জাম, জামরুল, সফেদা ও বাতাবি লেবুর ডাল। সব পেয়েছির সেই
দেশে মা আমার ছিলো সম্রাজ্ঞীর মতো। তাঁর হাতে ছিলো যাদু, যার স্পর্শে
ধান খই হয়ে যেতো, চাল হয়ে যেতো মুড়ি; যাঁর কাজই ছিলো সুঘ্রাণ ছড়ানো
চারদিকে-খাদ্যের সুঘ্রাণ, স্নেহের সুঘ্রাণ, হৃদয় শীতল করা দরদের সুঘ্রাণ, যা
আজ উন্মত্তের মতো পথে পথে শুধু খুঁজি।

জীবন ফেলেছে ঘিরে আজ ফ্যাক্টরির ধোঁয়া, ট্যানারির দুর্গন্ধ ও সভ্যতার
দূষিত বাতাস। নাক শুধু আজ খোঁজে মৌ মৌ করা সেই খইয়ের সুঘ্রাণ,
সর্ষে-ইলিশ ও আউশ-বেগুনের অপূর্ব বাস্না; আর খুঁজে ফেরে দুটি চোখ
মায়ের তামাটে সেই মুখ, যার বিনিময়ে আটটা বেহেস্তও আজ দিয়ে দিতে
পারি অনায়াসে।


জীবন তুমি গোলাপ ফোটাও
-হারুন আল রাশিদ

ক্রমান্বয়ে
আয়েশ করে টানছে কাছে
মরণ,
কেউ দেখে না
হৃদয়-নদের কঠিন রক্ত  
ক্ষরণ!

যাচ্ছে যেনো কিছু মানুষ বন্য হয়ে ধীরে,
সভ্য মানুষ শান্তি খোঁজে অমানুষের ভিড়ে।

নিজের বিবেক
দেয় না সাড়া,
বিবেক এখন
বাঁধনহারা

যায় যেখানে খেয়াল-খুশি
নেই বিবেকের শরম,
অন্ধকারের বন্ধ ঘরে
ব্যস্ত থাকে চরম।

নেশা যখন সংগোপনে ভেতরটা খায়
গিলে,
বিক্ষত হয় সম্ভাবনার জীবন তিলে-
তিলে।

এইভাবে আর চলবে কতো দিন?
নেশা নামক বাজবে মরণ বীণ!

জীবন তুমি গোলাপ ফোটাও
মাদকমুক্ত হয়ে,
সুখ পাবে না নৈতিকতার
নিঠুর অবক্ষয়ে!


প্রকৃত বন্ধন
-মোহাম্মদ আবদুর রহমান

প্রকৃত বন্ধন অবলুপ্তির পথে
কাগজের তৈরি গোলাপ দিয়ে কেনা যায় প্রেম
সম্পর্কগুলো পণ্য বস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছে
মানবতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত।

পশুদের মতো করে জন্মগত সম্পর্কগুলো
আসতে আসতে হারিয়ে ফেলেছে সর্ব উত্তম প্রাণীরা
অর্থের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছে প্রকৃত বন্ধন
বিশ্বাসের তাজা রক্ত বেরিয়ে যায় প্রতিদিন।

সূর্যের আলো থেকে চাঁদের আলো বেশি মূল্যবান
প্রেমের ভুবন কৃত্রিমতার কাছে পরাজিত
তাই সম্পর্কগুলো খুঁজতে বড় ভয় লাগে
তবে কি প্রকৃত বন্ধনগুলোর অস্তিত্ব থাকবে না
এবং কোন দিন চাষ হবে না গোলাপের ?


নিখোঁজ সংবাদ
-সোমা মুৎসুদ্দী

আমার নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পাঠালে,
তাঁরাদের রাজ্যে
সংবাদ সম্মেলন করেছো চাঁদের হলরুমে
মানববন্ধন করলে আকাশের মোড়ে
অভিযোগ লিখিয়েছো মেঘের থানায়
আর আমি তখন তিতাসের একবুক অভিমান নিয়ে
ধলেশ্বরীর তীরে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার খুব কাছেই আমি কখনো দেখতে পাওনি
নীরাকে দূরেই খোঁজ, কাছেই যতো বিপত্তি।


নাটাই ঘুড়ির গল্প
-আকিব শিকদার
 
নাটাইয়ের আধিপত্য ভালো লাগতো না ঘুড়িটার।
সে চাইতো আকাশে আকাশে
মুক্ত জীবন।
নাটাই চাইতো ঘুড়িটা থাক
অনুকূলে; কারণে অকারণে মানুক বশ্যতা।
এই নিয়ে শুরু হলো দ্বন্দ্ব, যেন বন্ধন
ছিন্ন করতে পারলেই বাঁচে।

যেদিন ছিঁড়লো সুতা, ঘুড়িটা মুখ থুবড়ে
পড়লো নর্দমায়। আর নাটাইয়ের স্থান
লাকড়ি রাখার ঘরে।
তালাকনামায় স্বাক্ষর করে দুতলার সুখি দম্পতিরা
এখন যেন নাটাই ঘুড়ির গল্পটারই প্রতিচ্ছবি।


ও মায়া মেঘ
-জহির খান

ও মায়া মেঘ একটু কথা বলো - বলো
একটুখানি বসো কৃষকের বৈঠকখানায়
চেয়ে থাকো গ্রামের আল পথ ধরে...
যে পথ ধরে আমার বহুকাল অপেক্ষা
কেটে যায় এক বসন্তের প্রথম সর্ম্পক

এখন
ও মায়া মেঘ একটু কুয়াশা উড়াও - উড়ো
প্লিজ মন খারাপ করো না আমিতো এমনি।


আফসোস
-বিচিত্র কুমার

কি করেছি ভুল আমি, কী করেছি ভুল?
সকালবেলা ফুল না তুলে পেলাম বাসী ফুল,
শুভ্র হয়ে ফুটেছিল উষার আলোতে,
সুবাস তার ছড়িয়েছিল হাসি খুশিতে।

প্রজাপতি ডানা মেলেছে আনন্দে নেচে নেচে
ভ্রমর এসে গুণগুণিয়ে চুমু দিয়েছে হেসে,
মৌমাছিরা চুষে চুষে মধু লুটেছে
কীট-পতঙ্গ এসে ছুঁয়ে দিয়েছে।

ব্যস্ততার মাঝে আমি পাইনি তোলার সময়
এর মাঝে ফুলের পাপড়ি তিলেতিলে হয়েছে ক্ষয়,
রৌদ্রো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নষ্ট হয়েছে ফুল
হায়! সকালবেলা ফুল না তুলে পেলাম বাসী ফুল।


আত্মবিশ্বাস
-জুনাইদ বিন মুহিব

থমকে দাঁড়ানো জীবনের ছোট্ট আঘাত,
ফের দৌড়িয়ে জন্ম দেয় জমকালো
এক প্রভাত।
একটি হার মানে একটি বিজয়ের সূচনা।
তাই তো!
জিততে জিততে জিতে গেলে হয়
হেডলাইনে বাস,
আর হারতে হারতে বিজয়ী হলে হয়
নব ইতিহাস।
ঘুরে দাঁড়াই, বুকে জন্মাই আত্মবিশ্বাস।


অনাবাদি কবি
-শাহিদ উল ইসলাম  

অগোছালো কিছু কাব্য
অসময়ে এসে
ভিড় জমায় মনের কার্নিশে
এলোমেলোভাবে।
অনাবাদি কবি
তা আওরান অবহেলা আর
অনাদরে।
অপমানে কবিতারা
পালিয়ে যায়; হারিয়ে যায়
দূর অজানায়।
কবি বন্ধ্যা হয়
কবির মৃত্যু হয়!
কবরে শায়িত কবি
অতঃপর চিৎকার করেন-
বেদনায় বুক ফাটে
হারিয়ে যাওয়া কবিতাদের জন্য।


হালখাতা
-শেখ একেএম জাকারিয়া

বছর শেষে হালখাতা ভিজে
কাঁদাজলে মিশে গেছে কয়েকশ বছরের ইতিহাস
অক্ষরগুলো তোলা আছে দেনা-পাওনার হিসেবে
উৎসবের বৈশাখ দেখি না
শাসন শোষণের বুকফাটা আর্তনাদ দেখি
জীবিকার সংঘাতে মলিন হয়ে ওঠে নতুন দিন
সময় বদলিয়েছে ঠিকই
বদলালায়নি এখনও সামাজের সেই চিত্র
তবু আতুর পায়ে হেঁটে
এই সময়ে পৌঁছেছে বাংলা ও বাঙালি।


দীর্ঘশ্বাস
-জাহিদ হাসান রনি

খাঁ খাঁ রোদ্দুরে পিপাসু কাকের আর্তনাদ ও ছুটে চলা
পাতা ঝরা বৃক্ষের এক ডাল থেকে অন্য ডালে
কখনোবা পাখা ঝাপটিয়ে দূর দিগন্তের পানে।

দীর্ঘ ঋজু দেহ হাত-পা ছড়িয়ে ছেঁড়া মাদুরের উপর
এপাশ থেকে দূরের বিশাল আকাশ দেখা যায়
কিন্তু বারান্দায় আলোর প্রবল সংকট।

প্রকৃতির বক্ষে দক্ষিণা বাতাস খেলা করে
আপাদমস্তক মৃদু বাতাসে দোলার কথা
অথচ দেহ-মনে অনলের প্রবল ভার।

হঠাৎ নবনীতার ঘোলাটে চোখ উঁকি দেয় হৃদয়ে
প্রবল বেগে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে সমস্ত শরীর
প্রলাপে শুধুই তুমি পারলে ছেড়ে যেতে।

আকাশ ভাঙা গানের অপেক্ষায় কেবলই দীর্ঘশ্বাস!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ