শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

আমাদের নববর্ষ

ড. এম এ সবুর : পহেলা বৈশাখ আমাদের নববর্ষ। বাংলা নববর্ষে গ্রাম-গঞ্জে বৈশাখীমেলার আয়োজন করা হয়। এতে কৃষিজ পণ্য, কুঠির শিল্পদ্রব্য, মাটি ও হাতের শিল্পদ্রব্য প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, খেলনা ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ের ধুম পড়ে যায়। বর্তমানে উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়।  কিন্তু করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রমণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটে ১৪২৮ সনের নববর্ষে ভিন্নতা দেখা যায়। এবারের নববর্ষ উদযাপনে রমনার বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ সারা দেশের সব মেলা-সমাবেশ-অনুষ্ঠান সরকারি নির্দেশে বাতিল করা হয়। এবারের নববর্ষে বেদনাবিধুর পরিবেশ দেখা যায়!
নববর্ষ উদযাপন একটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। তবে কবে থেকে নববর্ষ বা বর্ষ গণনা শুরু হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। মানব সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ রাত দিন গণনা শুরু করেছিল সূর্য উদয়-অস্তের ভিত্তিতে। কিন্তু তারা মাস গণনা শুরু করেছিল চাঁদের ভিত্তিতে। অর্থাৎ মানুষ চাঁদের বৃদ্ধি-হ্রাস দেখে মাস গণনা করতো। তারা এক শুক্ল পক্ষ থেকে অন্য শুক্ল পক্ষ কিংবা এক কৃষ্ণপক্ষ থেকে অন্য কৃষ্ণপক্ষ পর্যন্ত সময়কে একমাস ধরে মাস গণনা করতো। এভাবে ১২ চান্দ্র মাসে এক বছর গণনা করা হতো। পরবর্তীতে সৌর মাস দিয়ে বছর গণনা করা হয়। তাই বছর গণনার ভিত্তি এক নয়। কেউ গণনা করে চন্দ্রের ভিত্তিতে কেউ আবার সূর্যের ভিত্তিতে। প্রত্যেক জাতি-দেশের বছর গণনা শুরু হয়েছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। আর বছর গণনার ভিত্তি অনুযায়ী বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। যেমন ইরানের নববর্ষ ‘নওরোজ’ পালিত হয় বসন্তের পূর্ণিমায়। অন্যদিকে জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ১লা জানুয়ারিতে ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ উদযাপিত হয়। গ্রীস্মের শুরুতে অর্থাৎ ১লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়। আর মুহররমের ১লা তারিখে হিজরি নববর্ষ পালিত হয়। সব জাতির বছর গণনা যেমন এক নয় তেমনি সব জাতির নববর্ষের উৎসবও অভিন্ন নয়। প্রত্যেক জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তিতে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। বাংলা নববর্ষ উৎসবও শুরু হয়েছিল কৃষি নির্ভর বাঙালি জাতির কৃষি সংস্কৃতির ভিত্তিতে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সংস্কৃতি খুব দীর্ঘ নয়। মুঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের বছরকে স্মরণীয় রাখতে হিজরি ৯৬৩ সনকে ভিত্তি ধরে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। তবে হিজরি ৯৯২ সন এবং ১৫৮৪ গ্রেগরিয়ান সন থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। তৎপূর্বে বাঙালির ধান কাটার মাস অগ্রহায়ণে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হতো মর্মে ধারণা করা হয়। কবি কঙ্কন নামে খ্যাত মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনায় এরই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মুর্শিদ কুলি খাঁ এবং নবাব আলীবর্দি খাঁর শাসনামলে বৈশাখের প্রথম দিনে পূণ্যাহ অনুষ্ঠানের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভরতচন্দ্র রায় গুণাকরের কবিতায়ও বৈশাখের প্রথমে নববর্ষের উল্লেখ দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে বাংলা ‘বর্ষবরণ’ বা ‘নববর্ষ’ উৎসবের বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তার কবিতা-গানে ‘বৈশাখ’ ‘পূণ্যাহ’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে বাংলা ‘নববর্ষ’ বা ‘বর্ষবরণ’ উদযাপনের উল্লেখ না থাকলেও বৈশাখ এসেছে ভিন্ন মাত্রায়। তবে রবীন্দ্র-নজরুল সমকালে ১৯১৭ সালে মানে বৃটিশ শাসনামলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীর বিজয় কামনা উপলক্ষে পহেলা বৈশাখে মসজিদে দোয়ার অনুষ্ঠান আর মন্দিরে কীর্তন-পূজার আয়োজন করা হয়। কিন্তু বাঙালি সমাজে বৃটিশদের আরোপিত এ আয়োজন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তারা মনে প্রাণে এ আয়োজন গ্রহণ করেনি। এ কারণে ১৯৩৮ সালেও বৃটিশদের অনুরূপ আয়োজন ধোপে টিকেনি। তবে দেশ বিভাগের পরে পাকিস্তান শাসনামলে ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক সরকার পহেলা বৈশাখে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। সেদিন বাংলা একাডেমি, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, ছায়ানট, পাকিস্তান তমুদ্দুন মজলিশ, নিক্বণ ললিতকলা কেন্দ্র, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, সমাজকল্যাণ কলেজ ছাত্র সংসদ, গীতিকলা সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাকায় মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠানে এতো বিপুল লোকসমাগমে দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার বিস্ময় প্রকাশ করে। এরপর ১৯৬৬ সালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের আসরের মাধ্যমে বর্ষবরণ উদযাপন নতুন মাত্রা পায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উৎসবটি আমাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। তবে নববর্ষ উৎসবে পান্তাভাতের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে আরও পরে, গত শতকের আশির দশকে। প্রথম দিকে এর বিস্তৃতি ছিল খুব অল্প পরিসরে, শুধুমাত্র শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে। পরে তা গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পান্তা-ইলিশ নববর্ষ উদযাপনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়েছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নিরুৎসাহিত করায় গত কয়েক নববর্ষ উৎসবে পান্তা-ইলিশের আয়োজন অনেক কমেছে। বাংলা নববর্ষ বরণে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা‘ও শুরু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে, ১৯৮৯ সালে। আর ১৯৯৫ সাল থেকে আনন্দ শোভাযাত্রাকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা‘ নাম দেয়া হয়েছে। এর আগে যশোরের চারুপীঠ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ১৯৮৬ সালে বাংলা নববর্ষে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু করে।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখীমেলায় সাধারণত শিশু-কিশোর ও কৃষকদের ভিড় হতো। কৃষিপণ্য এবং কৃষকের ব্যবহার্য উপকরণাদি ক্রয়-বিক্রয়ে শুধু কৃষকরাই মেলায় যেতো। কৃষিজ পণ্য, কুঠির শিল্পদ্রব্য, মৃৎ ও হস্ত শিল্প দ্রব্য প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, খেলনা ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় হতো। আগের দিনে বৈশাখীমেলায় লাঙ্গল, জোয়াল, মইসহ বিভিন্ন কৃষি সরঞ্জামাদি, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় মাটির হাড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের তৈরি কুলা-চালনিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র, শিশুদের খেলাধুলার জন্য ঘুড়ি, মাটির তৈরী হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি বেচা-কেনা হতো। মেয়েদের হাতের চুড়ি, কানের দুল, গলার হার ইত্যাদি দ্রব্যও বেচা-কেনা হতো বৈশাখী মেলায়। এছাড়া জুড়ি-বুন্দি, জিলাপি, রসগোল্লা ইত্যাদি মুখরোচক খাবারের সমারোহ তো ছিলই। তবে সময়ের বিবর্তনে ও যুগের পরিবর্তনে আধুনিক মেলায় ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। গত শতকের শেষের দশক থেকে এ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় এবং বিশ্বায়নের মাতাল হাওয়ায় চলমান শতকের প্রথম দশকে বৈশাখীমেলা কৃষকের হাতছাড়া হয়! বর্তমানের বৈশাখীমলায় কৃষি সরঞ্জামাদির পরিবর্তে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সরঞ্জামাদি পরিলক্ষিত হয়। শিশুদের জন্য মাটি-বাঁশের খেলনায় পরিবর্তে ইলেক্ট্রনিক্স খেলনার সমারোহ বেশী দেখা যায়। আধুনিক নববর্ষের ‘বৈশাখী মেলায়’ বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি পাশ্চাত্যীয় অনেক খাবারের আয়োজন করা হয়। অধিকন্তু কর্পোারেট কোম্পানিগুলো বাংলা নববর্ষকে ব্যবহার করছে ব্যবসায়িক লাভের আশায়। তারা পশ্চিমা ধাচের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপনের জন্য প্রণোদনা দেয়। সাম্প্রতিককালের নববর্ষ অনুষ্ঠানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী জারি-সারি, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী, মুর্শিদী-মারফতি, ভজন-কাওয়ালী, পল্লীগীতি ইত্যাদি গানের বাইরে পাশ্চাত্য ধারার ব্যান্ডসংগীতের মঞ্চানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশ্বায়নের ফলে আধুনিক যুগের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মনোহরি চাকচিক্য বাড়লেও আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানের নববর্ষ উদযপানে পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজাসহ মুখরোচক অনেক খাবারের সমারোহ ঘটালেও এতে প্রাণের স্পর্শ পাওয়া যায় না। এতে ধনী ও বিলাসী মানুুষের বিনোদনের ব্যবস্থা হলেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের অন্তরে সুখ আসে না। আধুনিক যুগের শহুরে মানুষদের প্রাণহীন জমকালো বর্ষবরণের কৃত্রিমতায় নিবিড় পল্লীর প্রীতিপূর্ণ ছোট ছোট উৎসব ঢাকা পরে যায়। শিল্পপতি, বড় চাকুরিজীবী ও টাকাওয়ালাদের উৎসবের তান্ডবতায় পিষ্ট হয় বাঙালি কৃষকদের নববর্ষ উৎসব। তবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং নতুন প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির ধারনা দিতে বৈশাখী মেলায় কৃষিজ পণ্য যেমন- বিভিন্ন জাতের আউশ-আমন ধান বা ধানের নাম, চাষাবাদের ঋতু-পদ্ধতি এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত লাঙ্গল-জোয়াল, মই, কাঁচি-হাসুয়া, নিড়ানী যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কৃষিজ যন্ত্রপাতি মেলায় প্রর্দশিত হতে পারে। গৃহস্তালি কাজে ব্যবহৃত মাটি-বাঁশ-বেতের আসবাবপত্রের প্রদর্শনীও করা যেতে পারে। আর এসব ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে পারে।  
আরও একটি বিস্ময়ের বিষয় যে, এখন বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় ১৪ এপ্রিলে! অর্থাৎ আমাদের দেশে দিন-তারিখ গণনা করা হয় গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জি অনুসারে। তিথি-নক্ষত্রের ভিত্তিতে গণিত পহেলা বৈশাখ এখন নির্ধারিত হয় গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জির ভিত্তিতে! ১৪ এপ্রিলে বাংলা নববর্ষ ঠিক রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় নির্দেশে বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসাব-নিকাশ পদ্ধতিরই পরিবর্তন করা হয়েছে। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের জন্য ১৪০২ সালে গঠিত টাস্কফোর্স সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘প্রতি বছর নববর্ষারম্ভ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ হবে ১৪ এপ্রিল।’ এছাড়া গ্রেগরিয়ান ‘লিপ ইয়ার’ বা অধিবর্ষ অনুযায়ী বাংলা বছর গণনার পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষ যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাসে পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে এবং ঐ ফাল্গুন মাসকে ৩১ দিন ধরা হবে।’ অধিকন্তু সূর্যোদয়ের মাধ্যমে দিন গণনার বাঙালি সংস্কৃতিকেও ইংরেজি সংস্কৃতির অনুকরণে রাত ১২টার পর থেকে দিন গণনার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী রাত ১২.০০টায়।’ এভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জি নিজস্বতা হারিয়ে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুকরণ করছে। অধিকন্তু আমাদের দেশের সকল অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জি টাঙ্গানো থাকে। এ সব দিনপঞ্জিতে বাংলা সন তারিখ থাকে ক্ষুদ্রাক্ষরে।
আর শিক্ষিত-চাকুরিজীবী সবাই গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জি অনুসরণ করেন। কিন্তু তারাই আবার জমকালো বৈশাখী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ আয়োজন-উৎসবের জন্য তারা সরকারি ছুটি এবং উৎসবভাতা (বোনাস) পেয়ে থাকেন। তারা জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপন করলেও বাংলা বর্ষ, মাস ও দিন গণনা ভুলে যায় বৈশাখের ডামাডোল শেষে। কিন্তু গ্রামের কৃষকরা সারা বছরই বাংলা বছর, মাস ও দিন গণনা করে। এখনও জানতে চাওয়া হলে তারা ফাল্গুন-শাওন-ভাদ্র-কার্তিক ইত্যাদি মাসের দিন তারিখই বলবেন। গ্রামের কৃষকরা ছেলের জন্ম, মেয়ের বিয়ে, লেন-দেনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা সন-তারিখ ব্যবহার করেন।
আউশ-আমন ধান না থাকলেও এখনও গ্রামের কৃষকরা বাংলা সন-তারিখের ভিত্তিতে ইরি ধান চাষাবাদ করেন। আবাদ না থাকলেও তিল-কাউন চৈতালী ফসল হিসেবেই তারা জানেন। শিক্ষিত-শহুরে লোকজন নববর্ষের জমকালো অনুষ্ঠানে একদিনের বাঙালি সালেও কৃষকরা সারা বছরই ক্ষেত-খামারে থাকেন। শহুরে লোকজন পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষ করেই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আত্মগোপন করলেও কৃষকরা বৈশাখের প্রচন্ড রোদ-ঝড়কে প্রতিদিন সঙ্গে রাখেন। যাদেরকে ‘গেঁয়ো-চাষা’ বলে অবজ্ঞা-অবহেলা করা হয় তারাই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করেছেন।
শহুরে-শিক্ষিতরা নববর্ষের একদিনের বাঙালি, সারা বছরের না। তারা পোষাকী বাঙালি হলেও তাদের মনের কাঙালি দূর হয় না। মুখের অঙ্গীকারে তারা বাঙালি হলেও কাজে এর প্রমাণ মেলে না। এসব উৎসবী বাঙালি জাতিকে সুদৃঢ় করতে পারে না। তাই আমাদের জাতি ও জাতীয় সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হলে সবাইকে শেকড় সন্ধানী হতে হবে।
তবেই বাংলা নববর্ষ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিতে উদযাপিত হবে। আর আমাদের এ প্রত্যাশা পহেলা বৈশাখে, ১৪২৮ সনের প্রথম দিনে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ