রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রহমত মাগফিরাত নাজাতের মাস রমযান

মিয়া হোসেন : আজ বুধবার পবিত্র মাহে রমযানের প্রথম দিন। কালের পরিক্রমার পথ ধরে মুসলিম উম্মাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বারতা নিয়ে আবার এসেছে পবিত্র মাহে রমযান। আল্লাহর বিশেষ করুণা ও  দয়ার অপার সুযোগের মাস মাহে রমযান। দীর্ঘ এগারটি মাসের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগ এনে দেয় পবিত্র রমযান। রোযা ইসলামের মৌলিক ইবাদাতের মধ্যে অন্যতম। আর এ রোযা পবিত্র রমযান মাসেই আমাদের উপর ফরয করা হয়েছে। এ মাসের আগমনে মুসলিম সমাজ ও ইসলামী জীবন ধারায় এক বিরাট সাফল্যের সৃষ্টি হয়। পাপী তাপী সকল মানুষের জন্য এক অনাবিল শান্তি ও চিরস্থায়ী মুক্তির পয়গাম নিয়ে মাহে রমযান প্রতি বছরই আমাদের সামনে হাজির হয়। কিন্তু প্রতি বছরই এর আহ্বান থাকে চিরন্তন। এ মাসে ইবাদাত-বন্দেগীর তাৎপর্য অনেক। এর আবেদনের কোন শেষ নেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সুরা বাকারা-১৮৩)
এ আয়াত প্রমাণ করে রোযা আমাদের পূর্ববর্তীদের উপরও ফরয ছিল। রমযান আরবী শব্দ। অর্থ দহন। ইসলামী বিশ্বকোষে রমযান অর্থ গ্রীষ্মের উত্তাপ উল্লেখ করা হয়েছে। আরবী বছরের নবম মাস হিসেবেই এর পরিচয় রয়েছে। রমযান মাসেই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, হেদায়েতেদের জন্য।
আল্লাহ পাক রমযান মাসের রোযা ফরয করেছেন এবং এর রাতগুলোতে আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে নফল ইবাদতরূপে সুনির্দিষ্ট করেছেন। হাদীস শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ রাতে আল্লাহর রেজামন্দি, সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশে কোন ওয়াজিব, সুন্নাত বা নফল আদায় করবে, তাকে এর জন্য অন্যান্য সময়ের ফরয ইবাদততুল্য সওয়াব প্রদান করা হবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে কোন ফরয আদায় করবে, সে অন্যান্য সময়ের সত্তরটি ফরয ইবাদতের সমান সওয়াব লাভ করবে। এ মাস ধৈর্য তিতিক্ষা ও সবরের।
ধৈর্য্যের প্রতিফল হিসেবে আল্লাহর নিকট থেকে জান্নাত লাভ করা যাবে। এটা পরস্পর সৌজন্য ও সহৃদয়তা প্রদর্শনের মাস। এ মাসে মুমিন বান্দাদের রিযিক প্রশস্ত করে দেয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে এর বিনিময়ে তার গুণাসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং জাহান্নাম হতে তাকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি দেয়া হবে। আর তাকে আসল রোযাদারের সমান সওয়াব দেয়া হবে। তবে সেজন্য আসল রোযাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কম করা হবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা আরয করলাম ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাদের মাঝে সকলেই রোযাদারকে ইফতার করাবার সামর্থ্য রাখে না, এমতাবস্থায় তারা কিভাবে এই পুণ্য লাভ করবে? তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রোযাদারকে একটা খেজুর, দুধ বা এক ঢোক সাদা পানি দ্বারাও ইফতার করাবে, তাকেও আল্লাহ পাক এই সওয়াব দান করবেন। আর যে ব্যক্তি একজন রোযাদারকে পূর্ণমাত্রায় পরিতৃপ্ত করবে আল্লাহ পাক তাকে হাউজে কাউসার হতে এমন পানীয় পান করাবেন যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।
এটা এমন এক মাস যে, এর প্রথম দশ দিন রহমতের ঝর্ণা ধারায় পরিপূর্ণ। দ্বিতীয় দশ দিন ক্ষমা ও মার্জনার জন্য সুনির্দিষ্ট এবং শেষ দশ দিন জাহান্নাম হতে মুক্তি ও নিষ্কৃতি লাভের উপায়রূপে নির্ধারিত। আর যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের অধীনস্থ লোকদের শ্রম ও মেহনত হ্রাস বা হালকা করে দেবে, আল্লাহ পাক তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করবেন এবং তাকে জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি ও মুক্তিদান করবেন। আল্লাহ পাক এর মহান বাণী পবিত্র আল কুরআনসহ আসমানী কিতাবসমূহ এই মাসে নাজিল হয়েছে। এই মাসেই রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল কদর। যার মূল্য হাজার মাস ইবাদতের ঊর্ধ্বে। এই মাসের প্রথম দশ দিন রহমতের বারিধারায় অবগাহন, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাত ও ক্ষমার আলোকে উদ্ভাসিত, আর শেষ দশ দিন জাহান্নাম হতে মুক্তি ও নিষ্কৃতির সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ লাভ করে ধন্য হওয়ার কামনা প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের অন্তরে থাকা প্রয়োজন।
রোজার ঐতিহাসিক তাৎপর্য
রোযা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। আদি কাল থেকেই রোযা মানুষের আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে প্রচলন আছে। যেমন মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন- হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমনটি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববরতীদের ওপর,যাতে তোমরা তোমরা মুত্তাকী হতে পারো।” এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রোযা পূর্ববর্তী যুগেও ফরজ ছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসারে রোযার ইতিকথা নিম্নে তুলে ধরা হলো,
হযরত আদম (আঃ)-এর যুগে রোযা
পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম কে রোযা রেখেছিলেন? এ প্রশ্নের জবাবে হযরত খিযির ইবনে হুবাইশ (রহঃ) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আইয়্যামে বীজ কি? উত্তরে তিনি বললেন-আল্লাহ পাকের নিষিদ্ধ ফল খেয়ে হযরত আদম (আঃ) জান্নাত থেকে দুনিয়ায় প্রেরিত হন এবং তাঁর দেহের রং পরিবর্তন হয়ে যায়। তাঁর এই অবস্থায় ফেরেশতাগণ আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করে হযরত আদম (আঃ)-এর মুক্তি কামনা করেন। ফলে আল্লাহ পাক হযরত আদম (আঃ)-এর নিকট এই মর্মে ওহী পাঠালেন যে, আপনি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে রোযা রাখুন। হযরত আদম (আঃ) তা-ই করলেন। ফলে তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এ কারণে এই তিনটি আইয়্যামে বীজ বা উজ্জ্বল দিন বলা হয়।
হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে রোযা
হাদিস শরীফে হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে রোযার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত রাসুল (সাঃ) ইশরাদ করেন- “ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ছাড়া হযরত নূহ (আঃ) সারা বছর রোযা রাখতেন।” (ইবনে মাজাহ্ ) তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ আছে, হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রতিমাসে তিনদিন রোযা রাখার হুকুম ছিল। হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগ পর্যন্ত বহাল ছিল। শুরুতে মুসলমানগণও মাসে তিন দিন রোযা রাখতেন। মাহে রমযানের একমাস রোযা পালনের হুকুম সম্বলিত আয়াত নাযিল হলে, তা রহিত হয়ে যায়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
হযরত মুসা (আঃ)-এর যুগে রোযা
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হিজরত করে মদীনায় আগমণ করার পর দেখলেন যে, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন রোযা পালন করছে। তখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন- এটি কি ধরনের রোযা? জবাবে তারা বলল, এটি আমাদের জন্য একটি পবিত্র দিন। এদিনে আল্লাহ তা’আলা তাঁর দুশমন ফির’আউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে হত্যা করে বনী ইসরাঈলকে নাজাত দিয়েছেন। তাই এ দিনে শুকরিয়াস্বরূপ হযরত মুসা (আঃ) রোযা রাখতেন। (বোখারী শরীফ) এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হযরত মুসা (আঃ)-এর যুগেও রোযা ছিল এবং সে ধারা বনি ইসরাইল ও ইয়াহুদীদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগ পর্যন্ত বজায় ছিল।
হযরত দাউদ (আঃ)-এর যুগে রোযা
ইমাম বোখারী (রহঃ) একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) কে নবী করীম (সাঃ) বললেন-তুমি হযরত দাউদ (আঃ)-এর অনুরূপ রোযা রাখ। তিনি [হযরত দাউদ (আঃ)] একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন বিরতি দিতেন।” (বোখারী শরীফ)
হযরত দাউদ (আঃ)-এর যুগে রোযা
হযরত দাউদ (আঃ)-এর জন্মের সময় কৌতূহলী জনতা তাঁর মাতা মারইয়ামকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকলে, উত্তরে তিনি বললেন -আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে মান্নত করে রোযা রেখেছি। সুতরাং আমি কোন কিছুতেই কোন মানুষের সঙ্গে বাক্যলাপ করবো না। (সুরাহ্ মারইয়াম, ২৬)
জাহেলী যুগে কুরাইশ ও মুশরিকদের রোযা
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশূরার দিনে রোযা রাখত। (বোখারী শরীফ) সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে,  রামাযানের একমাস সিয়াম সাধনা নির্দিষ্ট হবার পূর্বে বিশ্বের সকল জাতিই কম-বেশি রোযার সাথে পরিচিত।
ইসলামের রোযা ইসলামী শরীৎয়তে রামাজানের রোযা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরী সনের শা’বান মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এর পূর্বে মুসলমানদের ওপর রোযা ফরজ ছিল কি-না, এব্যাপারে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে, রামাজানের পূর্বে কোন রোযা ফরজ ছিল না। আবার কারো কারো মতে, আশুরার রোযা ফরজ ছিল। আবার কারো কারো মতে, আইয়্যামে বীজের রোজা ফরজ ছিল। পরবর্তীতে রমযানের বিধান অবতীর্নের পর তা রহিত হয়ে যায়। ইসলামের সেই প্রাথমিক রোযার সময়ে নিয়ম ছিল যে, সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করার সময় থেকে নিয়ে ঘুমাবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা যাবে। কিন্তু রাতে একবার ঘুমিয়ে পড়লে, তার জন্য সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যেত। এতে অনেক সাহাবী (রাঃ) নানা রকম অসুধিবার সম্মুখীন হন। সাহাবায়ে কেরামের এসব সমস্যার সমাধানকল্পে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেন-“তোমাদের জন্য রামাজানের রাতে স্ত্রী সহবাস বৈধ করা হয়েছে- আর খাও এবং পান কর, যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা (সুবেহ সাদিক) তোমাদের নিকট পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।” (সুরাহ্ বাকারা, আয়াত ১৮৭)
আবার শুরু যামানায় রোযা না রেখে ফিদইয়া দেয়ার অনুমতিও ছিল। পরে তা রহিত হয়ে যায়। তবে অতি বৃদ্ধ (যারা রোযা রাখতে অক্ষম) এবং চিররুগ্ন ব্যক্তির জন্য এ বিধান এখনো বহাল আছে। তারা প্রতিটি রোযার জন্য একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে দু’বেলা পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে খানা খাওয়াবেন অথবা সদকায়ে ফিতর পরিমান খাদ্যদ্রব্য বা টাকা দান করবেন। উপরোক্ত আলোচনা হতে প্রতীয়মান হয় যে, রোযার তাৎপর্য বা গুরুত্ব অনেক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ