শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

করোনা ক্ষমতার বৃত্ত চেনে না

এম এ কবীর : ক্ষমতার বৃত্তে থাকলে অন্য ঝুঁকি কিছুটা কম হলেও করোনার হাত থেকে রেহাই নেই। করোনা ক্ষমতার বৃত্ত চেনে না। রাজা-প্রজা সবাই তার কাছে সমান।
করোনা প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা আমাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে।
করতেই পারে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানে না দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ  বাংলাদেশ করোনা টেস্ট করাতে ফিস ধার্য করেছে। সেই ফিস ধার্য করার পরই  টেস্ট করানোর আগ্রহ কমেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও কমেছে। রোগ ডায়াগনোসিস হয়ে মারা যাবার সংখ্যাও কমেছে।
আমরা দাবি করেছি  করোনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা সত্যি বলিনি। আমরা অসত্য তথ্য দিয়েছি। সেই অসত্য তথ্য দেবার পরিণতি এখন টের পাচ্ছি। ২০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে প্রতিদিন গড়ে পরিক্ষা হচ্ছে ২০ থেকে ২২ হাজার। এর এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন পরিক্ষা হচ্ছে গড়ে ১২-১৩ লক্ষ।
ক’দিন পর পরই শুনতে পাই বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক এবং কানাডার জিডিপি ছাড়িয়ে যাচ্ছে! রাজা উজিররা তো এরকম কথাই বলেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় শীর্ষ অবস্থানে থাকার খবরে আমাদের মন্ত্রী, সচিব, আমলারা নিশ্চয়ই আত্মপ্রসাদ লাভ করেছেন। মহামারির ব্যাপকতা কিংবা এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে যে সার্বক্ষণিক নজরদারি কিংবা সতত সকল ক্ষমতাকে মহামারি প্রতিরোধে নিয়োজিত রাখা প্রয়োজন, তাতে তারা অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
আমরা একদিকে করোনা টেস্ট করানোর জন্য ফিস ধার্য করেছি, অন্যদিকে মানুষজনকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করছি। সেই টিকা নিয়ে হুলুস্থুল কান্ড। প্রথম ডোজ নেয়ার ৪-৬ সপ্তাহ পর অহরহ মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অনেকে মারা যাচ্ছেন। কেন এমন হচ্ছে? কোনো স্টাডি আছে বাংলাদেশে?  সাধারণ মানুষ  উত্তর পাচ্ছে না। লোকজন ভ্যাকসিনের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এমনটা কেন হচ্ছে? কোনো গবেষণা হচ্ছে? এসব করার কি সময় আছে? তারচেয়ে বরং লাইভ টকশোতে গিয়ে কথা বললে ভালো। বাস্তবে তাই হচ্ছে। মানুষ মারা পড়ছে। চিকিৎসা খরচ যোগাতে গিয়ে পরিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে।
করোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন আদেশ-নিষেধের পরিপত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিচ্ছে। তাদের কাছে তো এর বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত থাকার কথা নয়। চিকিৎসা পেশায় যারা নিয়োজিত একমাত্র তারাই এর উত্তর দিতে পারেন। এসব বিষয় তদারকি করার জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি রয়েছে। তারা কেন সামনে এগিয়ে আসছেন না? কেন সাংবাদিক সম্মেলনে আসছেন না? কেন মানুষের মনে জেগে ওঠা অসংখ্য প্রশ্নের কোনো জবাব দিচ্ছেন না?
বিশ্ব পরিসরে করোনার গতিপ্রকৃতি দেখে আমাদের বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যবিদগণও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এর আভাস সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও দিয়েছেন, সেভাবে আগাম প্রস্তুতি ও জনগণকে সচেতন হওযার কথা বলেছেন। ততদিনে করোনার নতুন ধরণ (যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা) আঘাত হানতে শুরু করেছে অথচ আমরা সচেতন হইনি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের যেখানে প্রতিনিয়তই কোভিড-১৯ জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শ সুপারিশ মেনে চলার কথা, সেটি হয়নি। এমনিতেই কারিগরি পরামর্শক কমিটি গঠিত হয়েছে দেশে করোনার সংক্রমণের পর অনেক দেরিতে, তারপরও পরামর্শক কমিটিকে সবসময় সক্রিয় রাখা হয়নি। তাদের পরামর্শও আমলারা তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক দিকটিই প্রধান, অথচ আমাদের এখানে প্রশাসনিক দিকটিই প্রধান হয়ে উঠেছে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় যে সকল নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা সঠিকভাবে প্রতিপালনে প্রথমবারের মতো গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়নি। মৃত্যু ও সংক্রমণ প্রতিদিন যখন রেকর্ড করছে তখন নির্দেশনা বা লকডাউন যেভাবে ঢিলেঢালা চলেছে তা সকল মহল থেকে সমালোচিত হচ্ছে।
লকডাউন দেয়া হয়েছে অথচ সরকারি- বেসরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা খোলা রাখা হয়েছে। আবার গণপরিবহন বন্ধ, মানুষ কিভাবে কর্তব্যকাজে যাওয়া আসা করবে? পরে নগরে গণপরিবহন চালু করা হয়েছে। তবে আন্তঃজেলা পরিবহন তথা বাস, ট্রেন, নৌযান, বিমান চলাচল বন্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। কিন্তু লকডাউন ঘোষণার সিদ্ধান্ত শোনার পর ঢাকা ও বড় বড় শহর থেকে মানুষ যেভাবে বাড়ি, গ্রামে ছুটেছে তার ফল হয়েছে ভয়াবহ, সংক্রমণ সকল জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এখন প্রায় সব জেলাকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে।
মানুষ সংকটাপন্ন স্বজন নিয়ে হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছে, কোথাও আইসিইউ, বেড খালি নেই, এ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুবরণ করছেন অনেকে। অসহায় মানুষ চিকিৎসার আশায় ছুটে চলেছে, মিলছেনা চিকিৎসা সেবা-এই পরিস্থিতি প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সরকার করোনা চিকিৎসা সেবা উপজেলা পর্যন্ত নিয়ে যেতে এবং জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে, অন্যান্য সরঞ্জামাদি, ওষুধ সহজলভ্য করতে সময় পেয়েছে। কিন্তু সে সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর সংক্রমণ যখন কমে আসছিলো, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলো, তখন থেকেই করোনার প্রতিরোধ প্রতিকারে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা প্রয়োজন ছিল,তা হয়নি। এখনও দেশের জেলা ও বড় বড় নগরের হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানো হয়নি। মানুষ রোগী নিয়ে অক্সিজেনের জন্য ছুটাছুটি করছে। জেলা-উপজেলা থেকে রোগী নিয়ে স্বজনরা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় নগরের দিকে ছুটছে। জনগণের এ অবস্থায় করণীয় কি,তা বলে দেয়া হচ্ছে না। জেলা উপজেলায় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা যথাযথ না থাকায় সমস্যা আরো তীব্র হয়েছে। ­(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ