রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

করোনার এতো রোগী যাবে কোথায়?

ইবরাহীম খলিল : দেশে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। সেইসঙ্গে বড় হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বার বার হাসপাতালে ঘুরেও ঠাঁই মিলছে না হাসপাতালে। চিকিৎসার অভাবে রাস্তায়, এম্বুলেন্সে মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ হাজার ৮শ ২২ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ হাজার ২০১ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আগের দিন রোববার (১১ এপ্রিল) দেশে একদিনে করোনায় ৭৮ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৭ জন। এর আগে গত ৭ এপ্রিল দেশে একদিনে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৬২৬ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়।
গত কয়েকদিন ধরে দেশে করোনা আক্রান্ত ৭ হাজারের বেশি। এক সপ্তাহে রোগী বেড়েছে ৩০ ভাগ। অনেকটা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে করোনার রোগী। অভিযোগ রয়েছে, গত কিছুদিন ধরে আইসিইউে সিট খালি নাই। বড় বড় জায়গা থেকে ফোন করেও সিট পাওয়া যাচ্ছে না হাসপাতালগুলোতে। এই অবস্থায় প্রশ্ন দাড়াচ্ছে আক্রান্ত এতসব রোগী যাবে কোথায় ? তাদের শেষ পরিণতিই বা-কি।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন সাত হাজার ২০১ জন। তাদের নিয়ে দেশে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হলেন ছয় লাখ ৯১ হাজার ৯৫৭ জন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মোট মারা গেছেন ৯ হাজার ৮২২ জন, আর সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৮১ হাজার ১১৩ জন। অর্থাৎ দেশে করোনা সক্রিয় রোগী আছেন এক লাখ এক হাজার ৭২২ জন।
গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর তাদের সাপ্তাহিক বিশ্লেষণে জানায়, এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে (৪ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল) শনাক্ত হয়েছেন ৪৮ হাজার ৬৬০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪৪৮ জনের এবং সুস্থ হয়েছেন ২২ হাজার ৬০৩ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, ১৩তম সপ্তাহ (২৮ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল) থেকে ১৪তম সপ্তাহে শনাক্ত ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, মৃত্যু বেড়েছে ৩০ দশমিক ২৩ শতাংশ।
গত সাত দিনে দেশে করোনা শনাক্ত হন ৪৭ হাজার ৫১৮ জন। গত ৬ এপ্রিল শনাক্ত হন সাত হাজার ২১৩ জন, ৭ এপ্রিল সাত হাজার ৬২৬ জন, ৮ এপ্রিল ছয় হাজার ৮৫৪ জন, ৯ এপ্রিল সাত হাজার ৪৬২ জন, ১০ এপ্রিল ৫ হাজার ৩৪৩ জন, ১১ এপ্রিল ৫ হাজার ৮১৯ জন এবং গতকাল ১২ এপ্রিল শনাক্ত হন সাত হাজার ২০১ জন।
হঠাৎ করেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট। যথেষ্ট পরিমাণ শয্যা না থাকায় অনেক হাসপাতালেই আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করতে পারছে না। সংকটাপন্ন রোগীরাও জায়গা পাচ্ছেন না নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ও জরুরি যন্ত্রাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসেবে দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫৪৯টি আইসিইউ শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া  রাজধানীর ১০টি সরকারি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ১০৩টি এবং বেসরকারি হাসপাতালের ১৬৪টি আইসিইউ শয্যার সবগুলোতেই রোগী ভর্তি।  
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণ বাড়বেই। আর তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সুনির্দিষ্টভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ। উৎস ও উৎপত্তিস্থলগুলো বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকরা বলছেন- অনেক জটিল রোগীই  হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন দেরিতে; আবার বাড়িতেই চিকিৎসা নেয়া সম্ভব- এমন অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলছেন, মানুষের মধ্যে এমন ধারণা--- অবস্থা খারাপ হতে পারে। পরে হাসপাতালে সিট না পাওয়াও যেতে পারে। আগেই হাসপাতালে গিয়ে কেবিন বুক করে রাখি। এটা কিন্তু ঠিক না, যার অক্সিজেন দরকার তাকেই কিন্তু আমরা সেবা দিতে চাই। যার প্রয়োজন নাই তিনি বাসায় চিকিৎসকের পরামর্শে থাকলে আমরা আরেকজনকে তো সেবা দিতে পারবো।
এদিকে যারা করোনার পরীক্ষা করতে আসছেন তাদেরও ভোগান্তি বেড়ে গেছে। নাম নিবন্ধন করাতে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। একাধিক কেন্দ্র ঘুরেও সম্ভব হচ্ছে না নমুনা দেয়া। যারা পারছেন তাদের অভিজ্ঞতাও তিক্ত। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, সক্ষমতার তুলনায় নমুনা দেয়ার চাপ বাড়ার কারণেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা চলছে।
আর এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে মনে করেন বিশিষ্ট ভাইরোলোজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাসপাতালে বেড বাড়ানো তো সমাধান না। সমাধান করতে হবে প্রতিরোধের মাধ্যমেই।
করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো মানুষের মাস্ক পরার বিষয়টি নিশ্চিত করা। নইলে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি বাড়তেই থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২য় ঢেউয়ের সংক্রমণের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে এক সপ্তাহের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু মহামারি নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক লকডাউন নূন্যতম ১৪দিন হতে হয়। আবার যেভাবে বিধিনিষেধ পালিত হচ্ছে তাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব হবে সে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ কঠোর হবার তাগিদ দিচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেন, একটা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা দরকার। স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। এ জরুরি অবস্থার আওতায় খুব ক্ষিপ্রতার সাথে সবদিক থেকে যদি ম্যানেজ করা যায় তাহলেই একটা সমাধান হতে পারে। আরেক বিশেষজ্ঞ শর্মিলা হুদা বলছেন, কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে কেউ বাইরে না যায়। আমার কাছে মনে হয়, যে কারফিউ ছাড়া আসলে বাংলাদেশের মানুষজনকে ঘরে রাখা সম্ভব না।
ঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে টিকা নেওয়া ও মাস্ক পরাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
সাংবাদিক সম্মেলনে শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে মানুষ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা একজন থেকে তিনজন, তিন থেকে পাঁচজন, পাঁচ থেকে ২৫ জন এভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। দিনে অন্তত তিন বার গরম পানির ভাপ নিতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে ও ইমিউনিটি বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, ভিটামিন সি ও ডি জাতীয় খাবার খেতে হবে। সবুজ ও হলুদ ফল খেতে হবে। রুমে এসির ব্যবহার না করাই ভালো। রুমের জানালা খোলা রাখতে হবে। লোক সমাগম করা যাবে না। অনেক লোক সমাগম হয় আপাতত এ রকম অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ