শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ঢাকাতে মিলে না হাসপাতালের চিকিৎসা আইসিইউ অক্সিজেন

ইবরাহীম খলিল : করোনা রোগী হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার হাসপাতালগুলোতে মিলছে না চিকিৎসা। হাসপাতালগুলো বলছে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নতুন করে আর রোগী নেয়া যাচ্ছে না। আর আইসিইউ রোগীদের কাছে সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনের  সময় মিলছে না অক্সিজেনও। এরকম অনেক ঘটনা ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় ঢাকার নাগরিকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর থেকে এঅবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুতে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।   
জানা গেছে  গুরুতর অসুস্থ মায়ের জরুরিভিত্তিতে অক্সিজেন সাপোর্ট দরকার ছিল। ছেলে অ্যাম্বুলেন্সে মাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছিলেন। কোনো হাসপাতালই প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে পারেনি। পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সেই মা মৃত্যুবরণ করেন।
রাজধানীর উত্তরখানের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমকে নিয়ে তার ছেলে রায়হান একের পর এক রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালে যায়। কিন্তু, কোনো হাসপাতালই তাকে জরুরি অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে পারেনি। পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সেই ওই মায়ের মৃত্যু হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার ছেলে। গুরুতর অবস্থায় মাকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেন রায়হান। কিন্তু, সেখানে ভর্তি করানোর পরও অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া যায়নি। পরে সেখান থেকে রেফার করা হলে মাকে নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আল রাজি ইসলামী হাসপাতাল হয়ে মুগদায় যান রায়হান।
দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাড়ছেৃ। গত মাসে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৬৫ হাজার ৭৯ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৮ হাজার জনই শনাক্ত হয়েছেন গত ১৪ দিনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টের পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
গত বছরের মার্চে দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শানাক্ত হয়। এরপর জুনে হঠাৎ সংক্রমণ বেড়ে যায়। জুনে করোনায় আক্রান্ত ৯৮ হাজার ৩৩০ জনকে শনাক্ত করা হয়। আগস্ট পর্যন্ত সংক্রণের হার বাড়ছিল। আগস্টে শনাক্ত হয় ৭৫ হাজার ৩৩৫ জন।
এদিকে গত কিছুদিন ধরে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) একটি শয্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আইসিইউর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে মারা যাচ্ছে রোগীর এমন অভিযোগ আসছে গণমাধ্যমে।
নিউমোনিয়া ও গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত ১ এপ্রিল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পোস্ট-করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি ছিলেন নজরুল। সেখানে তাকে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেন দেয়া হয়েছিল। তবে, এটি যথেষ্ট ছিল না। নজরুলের প্রয়োজন ছিল আইসিইউ সাপোর্ট। গত ১ এপ্রিল থেকেই তিনি আইসিইউর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু, এই এক সপ্তাহে ঢামেকের ২০টি কোভিড আইসিইউ শয্যার একটিও তার জন্যে খালি পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে ঢামেক হাসপাতালে ফাঁকা আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বেশিরভাগ দিনই শূন্য থেকে একের মধ্যে থেকেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ২ এপ্রিল, সেদিন ছয়টি শয্যা খালি হয়েছিল।
নজরুলের ছেলে জামাল উদ্দিন পেশায় সাংবাদিক। তিনি জানান, ‘প্রতিদিনই আমরা আইসিইউ ইউনিটে গিয়েছি, আর তাদেরকে একটি শয্যার জন্যে অনুরোধ করেছি। ঢামেকের চিকিৎসকেরাই আমাদেরকে এ পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রতিদিনই আমাদের একজন আইসিইউ ইউনিটের সামনে বসে ছিলেন। আমরা বাবাকে অন্য কোনো আইসিইউতেও স্থানান্তর করতে পারিনি। কারণ, এক মিনিটের জন্যেও তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট থেকে সরানো যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় কীভাবে আমরা তাকে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে নিতাম?’ বলেন তার ছেলে।
নজরুলই একমাত্র ব্যক্তি নন যিনি আইসিইউর অপেক্ষায় থেকে মারা গেলেন। তার মৃত্যুর ছয় ঘণ্টা পরে ৫৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমও এইচডিইউতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনিও গত ৩০ মার্চ থেকে আইসিইউ শয্যার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন।
জাহাঙ্গীর হোসেন নামে রোকেয়ার এক আত্মীয় বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করে তাকে এইচডিইউতে ভর্তি করাতে পেরেছিলাম। কিন্তু, তাতে কোনো লাভ হয়নি। কারণ আমাদের রোগীর আইসিইউ শয্যা দরকার ছিল।’ ঢামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, এখন পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক।’
‘ঢামেকে আইসিইউতে ফাঁকা শয্যা পাওয়া এখন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন এরকম অনেক রোগী আশঙ্কাজনক অবস্থায় দিন গুনছেন শুধু বাঁচার একটি সুযোগের অপেক্ষায়। আমরা কাউকে ফিরিয়ে দিচ্ছি না। যেসব রোগীকে আমরা আইসিইউ শয্যা দিতে পারছি না, তাদেরকে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে’, বলেন তিনি। ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে আরও ১৪টি নতুন শয্যা যুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান হাসপাতালটির উপপরিচালক।
কুর্মিটোলায় ১০টি আইসিইউ শয্যা আছে এবং সবগুলোই রোগীতে ভর্তি। হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, অনেক মানুষ আইসিইউর জন্য অপেক্ষমাণ। আশঙ্কা করা যায়, প্রতিদিনই অপেক্ষমান তালিকায় রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে।
কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে একটি গাছের নিচে বসে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আসাদুজ্জামান। কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি থাকা তার ভাইয়ের জন্যে তিনি হন্যে হয়ে একটি আইসিইউ শয্যা খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ফুসফুসের ৪৮ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের এখন জরুরিভিত্তিতে একটি আইসিইউ শয্যা দরকার। কিন্তু, এ হাসপাতালের আইসিইউ শয্যাগুলো বেশ কিছুদিন ধরে ফাঁকা হচ্ছে না। এটা কীভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব যে, শুধুমাত্র কারও মৃত্যু হলেই কেবল আমরা আইসিইউ পেতে পারি?’
আসাদুজ্জামান ও তার অন্য আত্মীয়রা একের পর এক হাসপাতালে ফোন করছিলেন। কিন্তু, সব জায়গা থেকেই নেতিবাচক উত্তর আসে। এক পর্যায়ে পকেট থেকে টাকার একটি বান্ডিল বের করে এক আত্মীয়ের হাতে দিয়ে আসাদুজ্জামান শহরের আরেক প্রান্তের একটি হাসপাতালে গিয়ে একটি সিট খুঁজতে বলেন। কয়েক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টার পর অবশেষে তারা হাই-কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে একটি সিট খুঁজে পান।
হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক মীর ওমর ফারুক বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে এ রোগীকে এখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানে উনার এক আত্মীয় থাকার কারণেই অবশেষে তিনি ভর্তি হতে পেরেছেন। ফারুক বলেন, ‘প্রতিদিন রোগীদের মৃত্যু হয় না, আর তাই আমাদের এখানে কোনো শয্যাও ফাঁকা হয় না। আমাদের এখানে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর মতো ফাঁকা জায়গাও নেই।’
কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউ’র একজন চিকিৎসক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ওয়ার্ডের অসংখ্য রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন এবং তারা কষ্ট পাচ্ছেন। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে তারা কোথায় যাচ্ছেন? কেমন আছেন তারা? আমরা কি তাদের পরিবারের আহাজারি শুনতে পাচ্ছি?
এদিকে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়লেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ‘কার্যকর’ লকডাউনের কোন বিকল্প নেই এবং এটি কার্যকর করতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা নিতে পারে এবং জারি করতে পারে রাত্রীকালীন কারফিউ।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের গতি রোধের জন্যই গত ২৯শে মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে ১৮-দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। পরে গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হয়, যা জনসাধারণের মাঝে লকডাউন হিসেবে পরিচিত পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেটি মাত্র দু’দিন পরেই ভেঙে পড়েছে এবং কর্তৃপক্ষ নিজেই শহরের মধ্যে বাস চালনার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে অকার্যকর হয়েছে লকডাউন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির পরিচালক কাওসার আফসানা বলছেন, একটি কার্যকর লকডাউন ছাড়া সংক্রমণের গতিরোধের আর কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “পুলিশ বা আর্মি যাদের দিয়ে অন্য দেশে কন্ট্রোল করা হয়েছে, আমাদের দেশেও তা করতে হবে। দু’সপ্তাহ কঠোর লকডাউন করেন। লকডাউন মানে সব বন্ধ থাকবে। একটু আস্থা দিতে হবে যে তুমি ঘরে থাকলে কি করবো। কিন্তু লকডাউনের কোন বিকল্প নেই।”
কাওসার আফসানা বলছেন, যে কোন ধরণের জমায়েত বন্ধে কঠোরতার পাশাপাশি লকডাউনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের সরাসরি সহায়তা নিশ্চিত করে আগ্রহী করতে হবে। আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, কোভিড -১৯ সংক্রমণের গতি ঠেকাতে লকডাউনই বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি উপায়। তিনি বলেন ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লকডাউন কার্যকর করার উপায় খুঁজতে হবে কর্তৃপক্ষকে। “ওপর থেকে ঘোষণা করলাম, বা আইন শৃক্সখলা বাহিনী দিয়ে করলে হবে না। শুরুর দিকে যা করা হয়েছিলো তা এখন করলে হবে না। ব্যবস্থা এটাই যে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন জায়গায় সীমিত করণ ও কোন কোন জায়গা খুলে দেয়া। কিন্তু এটি কার্যকরে মনোযোগী হতে হবে।”
বাংলাদেশে গত বছর ২৫শে মার্চ সরকার প্রাথমিকভাবে ১০ দিনের একটি লকডাউন ঘোষণা করেছিল যা পরে কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছিলো। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় জুনের পর লকডাউন শিথিল করে নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এবারের লকডাউন কার্যত ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ব্যবসায়ীদের চাপ আর মানুষের দুর্ভোগ কমাতে যান চলাচলে অনুমতি দেয়ার কারণেই।
আবার জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অভিভাবকের জমায়েতের সুযোগ দেয়া কিংবা মেলা চালু রাখা ছাড়াও নানা জায়গায় নানা সমাবেশ করতে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলছেন, বাস্তবতার ভিত্তিতে কৌশল নিয়ে প্রয়োজনে রাত্রিকালীন কারফিউর কথাও বিবেচনা করতে পারে সরকার।
তিনি বলেন, “সমস্ত সভা সমাবেশ মেলা ও খেলা বন্ধ করতে হবে। দোকানপাট অফিস ছয় ঘণ্টা খোলা রাখা যেতে পারে এবং রাতে কারফিউ জারি হতে পারে। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর লকডাউনের জন্য সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়া বা রাত্রিকালীন কারফিউর প্রয়োজনীয়তা আছে কি-না সে বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোন মতামত পাওয়া যায়নি।
তবে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোকে ঘিরে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে এবং তার আলোকেই মঙ্গলবার মাদ্রাসাগুলো বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বুধবারই ধর্মীয় উপাসনালয়েও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ