সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

করোনায় দেশে প্রতিদিনই ভাঙছে মৃত্যুর রেকর্ড

# অপেক্ষা করছে আরও বড় বিপদ!
স্টাফ  রিপোর্টার : বাংলাদেশে গত কয়েকদিন ধরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭৮ জন, যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একদিনে মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড। এর আগের দিন মৃত্যু হয়েছিল ৭৭ জনের, যা ছিল সেদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর আগে ৯ এপ্রিল মৃত্যু হয়েছিল ৬৩ জনের, ৮ এপ্রিল মৃত্যু হয় ৭৪ জনের। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট মৃত্যু হয়েছে ৯,৭৩৯ জন। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৫,৮১৯ জন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট শনাক্ত হলেন ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে সুস্থ হয়েছেন ৪,২১২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে শনাক্তের হার ২৬.৮৬ শতাংশ বেড়েছে আর মৃত্যুর হার বেড়েছে ৩০.২৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে সুস্থতার হার বেড়েছে ৪২.৫৮ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নমুনা পরীক্ষার বিচারে করোনা ভাইরাস শনাক্তের হার ২০.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের পরীক্ষায় একজনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৩,৮৩৭ জন আর বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর মোট সুস্থ হলেন ৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৭৮ জন।
গত কয়েক দিন যাবত বেশ কয়েকবার করোনা ভাইরাসে মৃত্যু এবং শনাক্তের সংখ্যা রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশে গত বছরের মার্চের ৮ তারিখে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছিলো স্বাস্থ্য বিভাগ। এরপরের দুই মাস দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা তিন অংকের মধ্যে থাকলেও সেটা বাড়তে বাড়তে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এরপর বেশ কিছুদিন দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা কমতে কমতে এক পর্যায়ে তিনশোর ঘরে নেমে এসেছিল। তবে এবছর মার্চের শুরু থেকেই শনাক্তে ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাসপাতালগুলোর ওপর যে হারে চাপ বাড়ছে, তাতে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাপী করোনা দিন দিন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃতের তালিকা। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটির নতুন নতুন ধরন মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার টিকা আবিষ্কার হলেও এখনো অস্বস্তিতে বিশ্ববাসী। এরই মধ্যে বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৯ লাখ এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৩ কোটি ৩৬ লাখেরও বেশি মানুষ।
ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, রোববার পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১১ হাজার ২৭৪ জন এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৩ হাজার ৫৫৫ জন। এ নিয়ে বিশ্বে মোট করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২৯ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ১২৩ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০ কোটি ৯৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫২৪ জন।
করোনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। তালিকায় শীর্ষে থাকা দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ৩ কোটি ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯৮০ জন। মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫৯৩ জনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্রাজিলে এখন পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছেন ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬ জন এবং মারা গেছেন ৩ লাখ ৫১ হাজার ৪৬৯ জন।
আক্রান্তে তৃতীয় এবং মৃত্যুতে চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতে এখন পর্যন্ত করোনায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৫ জন সংক্রমিত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩০৫ জনের।
আক্রান্তের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ লাখ ২৩ হাজার ৭৮৫ জন। ভাইরাসটিতে মারা গেছেন ৯৮ হাজার ৬০২ জন। আক্রান্তের দিক থেকে রাশিয়া রয়েছে পঞ্চম স্থানে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন ৪৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৮৮ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১ লাখ ২ হাজার ৬৪৯ জন।
এদিকে আক্রান্তের তালিকায় যুক্তরাজ্য ষষ্ঠ, ইতালি সপ্তম, তুরস্ক অষ্টম, স্পেন নবম এবং জার্মানি দশম স্থানে রয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩তম।
এদিকে বৈশ্বিক মহামারি নিয়ে বিশ্বময় সতর্ক-বার্তা শোনা যাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে। তাদের ভাষায়, সঙ্কট মোটেও শেষ হয়নি। বরং সামনে করোনার আরো বড় বিপদ ‘অপেক্ষমাণ’। বিশেষজ্ঞরা এমনও জানিয়েছেন যে, ‘টিকাকরণ ও করোনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান সাফল্যটুকুই সব নয়। বিপদ এখনও কাটেনি। ফের আছড়ে পড়তে পারে সংক্রমণ ঢেউ। কোথাও কোথাও তা প্রলয়ঙ্করী আকারে শুরুও হয়ে গেছে।
ব্রিটেনের ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কাজনক অভিমত পাওয়া গেছে স্বাস্থ্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের তরফে। ব্রিটেন জুড়ে দ্রুত গতিতে টিকাকরণের জোরে আগের থেকে অনেকটা ‘সুস্থ’ হয়ে উঠছে মানুষ এবং সংক্রমণ কমে ‘উন্নতি’ হয়েছে করোনা পরিস্থিতির। হাসপাতালে রোগী ভর্তি কমছে। মৃত্যুও কম। কিন্তু সেরে ওঠার সেই আত্মবিশ্বাসী মনোভাবকে খারিজ করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।
হু-এর ইউরোপ শাখার শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন স্মলউড সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘সংক্রমণ কমলেও যে পরিমাণে এখনও ঘটছে, সেটা ভয়ের। এখনও বিপদসীমাতেই রয়েছে ব্রিটেন। আর একটা ঢেউ এলে সামলাতে পারবে না।’
দক্ষিণ আফ্রিকা জানিয়েছে, তাদের দেশে ছড়িয়ে পড়া নতুন স্ট্রেনের ক্ষেত্রে কোনও কাজ দিচ্ছে না চ্যাডক্স১। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটকে ৫ লক্ষ ডোজের মূল্য বাবদ অর্থ আগাম দিয়ে রেখেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই টিকা তারা আর কিনতে চায় না। আগাম নেওয়া অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছে সিরাম ইনস্টিটিউট। দক্ষিণ আফ্রিকা জানিয়েছে, আগে সরবরাহ করা ডোজগুলো তারা আফ্রিকা মহাদেশের অন্য দেশকে বেচে দিয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকা জানিয়েছে, ফাইজার, মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন-এর টিকা দেওয়াই তারা চালিয়ে যেতে চায়। এখনও পর্যন্ত অক্সফোর্ডের প্রতিষেধকটিকে প্রয়োগে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমেরিকায় বয়সের দিকটিকে শিথিল করে নাগরিকদের বৃহত্তর অংশকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। বাইডেন প্রশাসনও টিকাকরণের পরিধি বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রাপ্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বিশ্বব্যাপী করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা ৩০-৪০% ভাগ বেড়েছে। ব্রাজিলের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। সেখানে মৃত্যুর মিছিল চলছে। অন্যান্য দেশের ভাইরাসের নতুন নতুন ধরনের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং প্রতিদিনই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ