সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে শুরু হয়েছে বোবা কান্না

পবিত্র রমযান মাস উপলক্ষে স্বল্পমূল্যে খাদ্যসামগ্রী কিনতে রাজধানীতে টিসিবির গাড়িতে সাধারণ মানুষের উপচেপড়া ভিড় -সংগ্রাম

এইচ এম আকতার : আসন্ন রমযান আর হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়া করোনার প্রভাবে লাগামহীন হচ্ছে  নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে শুরু হয়েছে বোবা কান্না। বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনও টিসিবি’র ট্রাকের দীর্ঘলাইনে দাঁড়াচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে। গতকাল সরকার চিনির দাম কেজিতে ৩ টাকা বাড়িয়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস ক্রেতাদের।
বিশেষ করে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা দ্রব্যমূল্যের কারণে ক্ষোভে ফুঁসছেন নিম্নআয়ের মানুষ। সামনের দিনগুলোতে এ দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে না ধরলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না শেষ পর্যন্ত ক্ষোভের উদগিরণে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এপ্রিল মাসে করোনা বেড়ে যায়। এতে করে সরকার সারা দেশে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করে। এতে করে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। গত তিন মাস ধরেই দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধিতে জনমনে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকার নানা চেষ্টা করলেও তাতে তেমন কাজে আসেনি। উল্টো দাম বেড়েই চলছে। সরকার না পেরে ট্রাকে সেল শুরু করে টিসিবি। এতেই দাম নিয়ন্ত্রনে আসে না।
গত বছরে করোনার হটস্পট হিসেবে পরিচিত ঢাকা এবং  নারায়ণগঞ্জে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে। জনপ্রতিনিধি ও সরকারের তরফ থেকে পাওয়া ত্রাণের বাইরে জীবিকার মাধ্যম হারিয়ে বেশির ভাগ নিম্নআয়ের মানুষই দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দুর্দশায়।
তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। কারণ এসব পরিবারের লোকজন মুখ খুলে কাউকে বলতেও পারেননি কিংবা হাত পাততে পারেননি। সেই লকডাউন পরিস্থিতি কাটিয়ে গত কয়েক মাসে সাধারণ জীবনে ফিরে আসার চেষ্টায় থাকা এসব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি।
জানা গেছে, গত ১ মাসে গুঁড়োদুধের দাম কেজিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ থেকে ৩০ টাকা। শিশুখাদ্যের মূল্যও একইভাবে বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। এছাড়াও সয়াবিন তেল খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩৮ থেকে ১৪০ টাকা, যা গত মাসের তুলনায় ৩০ টাকা বেশি। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি, যা আগের চেয়ে কেজিতে বেড়েছে ৬-৭ টাকা এবং চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা দরে।
এছাড়াও ডাল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই মূল্যবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খোদ ব্যবসায়ীরাই। গত মাসেই সব ধরনের তরল দুধের দাম বাড়ায় মিল্ক ভিটাসহ কোম্পানিগুলো। গতকাল চিনির দাম বাড়ায় খাদ্য ও চিনি কর্পোরেশন।
গার্মেন্টকর্মীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, করোনার মধ্যে কয়েক মাস কারখানা বন্ধ ছিল। বেতন বাড়েনি। বাড়িওয়ালা করোনার কারণে কিছু ভাড়া মাফ করলেও এখন ভাড়া বাড়িয়েছেন। কারণ বাড়িওয়ালাদেরও একই সমস্যা ছিল। কিন্তু এসব সংকট না কাটতেই বাজারে মূল্য বৃদ্ধিতে আমরা দিশেহারা।
কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আমাদের বেতন দিয়েই চলতে হয়, বলতে পারেন মাপা টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। কাউকে তো কিছু বলতেও পারি না। কিন্তু ক্রয়ের সক্ষমতা হারাতে বসেছে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ। উপার্জনের সঙ্গে মিল-অমিলের হিসাব কষতে গিয়ে আমাদের বোবা কান্না কাউকে দেখানোর উপায় নেই।
এদিকে রমজান যত ঘনিয়ে আসবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্কুলশিক্ষক জানান, হঠাৎ করেই করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে। সামনে কী হয় এ নিয়ে গুজবের ডালপালাও মেলছে। আবার রমজানও ঘনিয়ে আসছে। এমনিতেই রমজানের আগে জিনিসপত্রের দাম দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাই সামনে কী আছে আমাদের ভাগ্যে জানি না।
পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেডিং করপোররেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর মাধ্যমে নিত্যপওয়োজনীয় পণ্য বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি ট্রাকে করে টিসিবির ছয়টি পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। দীর্ঘলাইন দিয়ে টিসিবি‘র এসব পণ্য কিনছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চৈত্রের তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কিনছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টিসিবির ট্রাকে সয়াবিন তেল, চিনি, মশুর ডাল, ছোলা ও খেঁজুর দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতি কেজি সয়াবিন তেল ১০০ টাকা, চিনি, ছোলা ও মশুর ডাল ৫৫ টাকা কেজি এবং খেঁজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ৫ লিটার তেল, চার কেজি করে চিনি, ছোলা ও মশুরের ডাল কিনতে পারছেন। এছাড়াও প্রতিজন খেঁজুর নিতে পারছেন ১/২ কেজি।
এদিকে রাজধানীর সেগুন বাগিচাস্থ বটতলার অপেক্ষামান টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনছেন কামরুল ইসলাম নামে একজন ক্রেতা। তিনি বলেন, বেলা ১১টা থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এখন দুপুর ১২টা। লাইনেই অপেক্ষা করছি। হয়তো আরও ১৫/২০ মিনিট লাগবে পণ্য কিনতে।
এতক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেসরকারি চাকরি করছি। গত বছর করোনার সময় ৩০ শতাংশ বেতন কমানো হয়েছে। সেটা আর বাড়েনি। বরং বর্তমানে করোনা বেড়ে যাওয়ায় চাকরি হারানোর আতঙ্কে রয়েছি। এই অবস্থায় এক ঘন্টা দাঁড়ানোর পরেও যদি টিসিবির পণ্য কিনতে পারি তাহলে কয়েকশ টাকা সাশ্রয় হবে।
একই কথা বলছেন, সুমি আক্তার। তিনি বলেন, বাজারে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৪০ টাকা। টিসিবিতে ১০০ টাকা। ৫ লিটার তেল টিসিবি থেকে কিনলে সাশ্রয় ২০০ টাকা। এছাড়াও ছোলা, মশুর ডাল ও চিনি বাজার থেকে গড়ে ২০ থেকে ৪০ টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে। তাই কষ্ট হলেও এখান থেকে পণ্য কিনছি। এ ব্যাপারে টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, পবিত্র রমজান উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে টিসিবির পণ্য বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ট্রাকে ১২০০ লিটার তেল, ৭০০ কেজি চিনি, ৫০০ কেজি মশুর ডাল, ১০০ কেজি ছোলা ৬০০ কেজি, পেঁয়াজ ৫০০ কেজি এবং খেঁজুর ১০০ কেজি বিক্রি হচ্ছে।তিনি জানান, প্রয়োজনে এর পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে।
টিসিবি’র ডিলার শফিক জানান,অনেক চাকুরিজীবীই এখন ট্রাকে দীর্ঘলাইনে দাড়িয়ে পন্য কিনছেন। যাদের আগেও কখনও দেখিনি। এখন মধ্যবিত্ত লোকেরাও ট্রাকে দাড়িয়ে পন্য কিনছে। এজন্য তাকে লাইনে দাড়িয়ে ২/৩ ঘন্টাও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। বাজারে পণ্যের যে দাম এতে বাধ্য হচ্ছে ক্রেতারা দীর্ঘলাইনে দাড়াতে। মধ্যবিত্তের বোবা কান্না আসলেই কেউ বুঝতে চায় না। জানি না এ কান্নার শেষ কোথায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ