শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

নৌপথে আর কত মৃত্যু!

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : দেশের সড়কে মৃত্যুর মিছিলের সাথে পাল্লা দিয়ে নদীতেও মৃত্যুর মিছিল। কিছুতেই দুর্ঘটনার মৃত্যু থামছে না। অথচ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। বিধায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়কে ও নৌপথে বহু মানুষের হতাহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা এখন আর কাউকে আলোড়িত করে না। একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি দুর্ঘটনা আগের ঘটনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। নৌপথে নিয়ম মেনে সব নৌযান চলাচল করার কথা থাকলেও চলছে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। এসবকে দুর্ঘটনা না বলে হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়। ৪ এপ্রিল রোববার শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামের একটি লঞ্চ অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়। এতে অন্তত ৩৫ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখন হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। নারায়ণঞ্জ থেকে যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জে যাচ্ছিল। কিন্তু সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় নির্মিতব্য শীতলক্ষ্যা ব্রিজের কাছে লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এই দুর্ঘটনার জন্য ঝড় বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী নয়! মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার জন্য মানুষই দায়ী। বিআইডব্লিউটির উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা পর ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করেছে। কিন্তু শীতলক্ষ্যার পাড়ে কান্নার রোল থামেনি। কারো ছেলে, কারো বাবা, কারো মা, কারো ভাই, কারো সন্তান হারানোর শোকে স্তব্ধ নদী পাড়ের হাজারো মানুষ। তবে মা ও সন্তানের দৃশ্যটি সবারই নজর কেড়েছে। শত কষ্টেও মা যে তার কলিজার টুকরা সন্তানকে বুকে আগলে রাখেন তার প্রমাণ শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে আবারও দেখা গেছে। শত বিপদেও সন্তানের হাত ছেড়ে দেননি মমতাময়ী মা। বুকে ১২ মাসের শিশুকন্যাকে আগলে রাখা অবস্থায় এক মায়ের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একেই বলে মায়ের ভালোবাসা। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই কান্নাই ভেঙে পড়েন। শুধু কি তাই! এক এক করে যখন লাশগুলো লঞ্চ থেকে বের করা হচ্ছিল তখন স্বজনহারাদের আর্তচিৎকারে শীতলক্ষ্যার আকাশ ভারি হয়ে উঠে। স্বজনহারা মানুষগুলোর চেহারায় দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। কাঁদতে কাঁদতে তাদের চোখ ফুলে গেছে। গলা ভেঙে গেছে। মুখের ভাষা তাদের ফুরিয়ে গেছে। এরপরও তারা কাঁদছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না। কারণ যার চলে যায় সে বুঝে বিচ্ছেদের কী যন্ত্রণা!
বাংলাদেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় না। এর আগেও লঞ্চ দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমেনি। উল্টো বেড়েই চলছে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে? এ নিয়ে বির্তক কিংবা সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু ৩৫ জন নিহত হওয়া মানুষের কী হবে? কেন তাদেরকে এভাবে জীবন দিতে হলো? সরকার কি এই দায় এড়াতে পারে? নিশ্চয় না। কারণ সরকার ভিন্নমত দমন পীড়নে যত ফন্দি করে তার ছিটে ফোঁটাও যদি লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতো তাহলে এভাবে নদীতে মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না। প্রায় প্রতিবছরই লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই শেষ। পরবর্তীতে এ নিয়ে আর তেমন কিছু হয় না। ফলে দায়ী ব্যক্তিরও শাস্তি হয় না। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। বার বার কেন নৌ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথের নৈরাজ্য, লঞ্চ চালকদের কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা ইত্যাদি। দেশে নৌ-দুর্ঘটনা কেন সংঘটিত হয় এ নিয়ে কাজ করে সোসাইটি অব মাস্টার মেরিনার্স। তাদের ভাষ্যমতে ১০টি কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। যেমন : ৩৪ শতাংশ লঞ্চে দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে, ১৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে মাস্টার-চালকের গাফিলতিতে, ১৫ শতাংশ ঘটে মাস্টারবিহীন চালনার জন্য, ৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চরায় আটকানো ও প্রবল স্রোতের কারণে, কিছু চরে ওঠার কারণে এবং বিরূপ আবহাওয়ার জন্য, ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নির্মাণজনিত ত্রুটির জন্য, আগুন লাগা, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকা এবং দুটি লঞ্চে সংঘর্ষে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজারের মতো নৌপথ রয়েছে। কিন্তু এর বেশিরভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে কয়েকগুণ বেশি নৌযান চলাচল করছে। যা দুর্ঘটনার জন্যে অনেকাংশে দায়ী। শীতলক্ষ্যা নদীতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গোটি রাতের বেলা চলছিল। অথচ রাতের বেলা মালবাহী নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কেন কার্গোটি রাতের বেলায় চলছিল? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় একটি কার্গো জাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে লঞ্চটিকে অন্তত ২০০ মিটার টেনে নিয়ে যায়। এরপর লঞ্চটি ডুবে যায়। অর্থাৎ এ দুর্ঘটনার জন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী নয়। স্রোতবিহীন পানিতে একটি কার্গো জাহাজ আরেকটি লঞ্চকে এভাবে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিল। অথচ এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো জাহাজটিকে শনাক্ত কিংবা আটক করা সম্ভব হয়নি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে ছোট বড় মিলে প্রায় ৭০০টির মতো লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৬ হাজার পাঁচশত মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। আর নিখোঁজ হয়েছে প্রায় ২ হাজারের বেশি মানুষ। এ ঘটনার ঠিক এক বছর আগে ৩০ জুন ২০২০ ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মর্নিং বার্ড নামক একটি লঞ্চকে ময়ূর-২ নামের অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি নদীতে ডুবে যায়। এতে কমপক্ষে ৩২ জন যাত্রী নিহত হয়েছিল। ২০১৯ সালের মার্চে বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চের ধাক্কায় খেয়া নৌকার ৬ আরোহী নিহত হয়েছিল। একই বছরের জানুয়ারি মাসে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে বালুবাহী নৌযান ডুবিতে ২০ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮০০ জন যাত্রী নিহত হয়েছিল। ২০০৪ সালে পাগলায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি মিতালী ডুবে গেলে ৪০০ জনের বেশি যাত্রী নিহত হয়েছিল। একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এমএল মজলিসপুর ডুবে প্রায় ৯০ জন নিহত হয়েছিল। ২০০৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এমভি মহারাজ দুর্ঘটনায় ১৫০ জন নিহত হয়েছিল।
২০০৮ সালের ২৩ মে চাঁদপুরে এমভি লাইটিং সান দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছিল। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে দিন দিন নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এবং নৌপথে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। নৌপথের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে নৌ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে ঝড়বৃষ্টির মৌসুমে নৌ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ