রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : মহামারি করোনাকালে ব্যাংকের রিজার্ভে রেকর্ড গড়েছে। বর্তমানেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বগতি অব্যহত রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিটেন্সে ভর করে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। যা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভ মহামারি মোকাবিলায় সরকারকে সাহস জোগাচ্ছে। এদিকে করোনাকালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংকের আমানত। ব্যাংকগুলো আমানতের ওপরে সুদহার কমিয়ে দিলেও মানুষ টাকা রাখার জন্য ব্যাংককেই বেছে নিচ্ছে। ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত জুলাই-জানুয়ারি এই সাত মাসে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। তথ্য বলছে, গত একবছরে ৮৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এরপরও ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশাল এই তারল্যের একটি বড় অংশ বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। বাকি টাকা ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার মাঝে প্রবাসী আয় অনেক বেশি এসেছে। এই টাকার বড় অংশই ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা হয়েছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, অপরদিকে ব্যাংকেও আমানত বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। গত ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। একবছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। আর বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে। গত জানুয়ারির শেষে ব্যাংকটিতে আমানত বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ১ লাখ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনাকালে আয় কমে গেছে। যে কারণে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া খরচ কমিয়ে দিয়েছে। আর ভবিষ্যতের বিপদ থেকে সুরক্ষা থাকার জন্য অল্প অল্প করে ব্যাংকে জমাচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীরাও সব ধরনের বিনিয়োগ ও খরচের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে সঞ্চয় শুরু করেছে। বিদেশ থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় উত্তোলন হয়েছে কম। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসের মাঝেও ব্যাংকগুলো আমানতের চাপ সহ্য করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমান জানান, মানুষের আয় কমলেও নানা কারণে ব্যাংকের প্রতি আস্থাও বেড়েছে। প্রবাসীরা যে টাকা পাঠাচ্ছে, তার একটা অংশ ব্যাংকে থেকে যাচ্ছে। ফলে আমানতে সুদ হার কমলেও ব্যাংকে টাকা রাখার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এছাড়া করোনা সবাইকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়ার কারণেই সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বেড়ে গত ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৯০ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। একবছর আগে তথা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষে আমানত ছিল ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি তথ্য বলছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ২০২ কোটি টাকা। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বেড়েছিল ৭৩ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। তারও আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।
আবার গত সেপ্টেম্বর হিসাবে দেখা গেছে, দেশের এক তৃতীয়াংশ ব্যাংকে জমা রয়েছে ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের চার ভাগের তিন ভাগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংকের কাছে রয়েছে ৭২ দশমিক ৮৪ শতাংশ বা ৯ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা। ২২টি ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকসহ পাঁচটি ইসলামিক শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আরও পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবে অগ্রণী ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকে ৭১ হাজার ১০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকে আমানত রয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংকে রয়েছে ৪১ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে ৪০ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকে রয়েছে ৩৯ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৭শ ৭ কোটি টাকা, ডাচ বাংলা ব্যাংকে রয়েছে ৩৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকে ৩৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংকে ৩২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে ৩২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে রয়েছে ৩১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকে ২৯ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ায় আমানতের পরিমাণ ২৯ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকে রয়েছে ২৮ হাজার ৭২৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, সিটি ব্যাংকে রয়েছে ২৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকে রয়েছে ২৮ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে রয়েছে ২৭ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংকে রয়েছে ২৭ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকে রয়েছে ২৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের শুরুতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতিতে গত বছরের মার্চের শেষ দিকে লকডাউন শুরু হয়। তখন থেকে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন অনেকেই। চলমান ব্যবসাও অনেকে বন্ধ করে দেন। ফলে ব্যাংকে তারল্যের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
এদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার যা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, মূলত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করেই রিজার্ভ নতুন এ উচ্চতায় উঠেছে। এ রিজার্ভ দিয়ে প্রতি মাসে চার বিলিয়ন ডলার হিসাবে প্রায় সাড়ে ১০ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীরা বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, অন্যদিকে বিদেশি ঋণ-সহায়তাও সরকার পাচ্ছে। তার মতে, রিজার্ভ মহামারি মোকাবিলায় সরকারকে সাহস জোগাচ্ছে। আর গত কয়েক বছর ধরেই রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ১০ বছর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে সেই রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ২০১৯ সালের অক্টোবরে। ২০২০ সালের ৩০ জুন সেই রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। অক্টোবরের ৮ তারিখে ছাড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। মহামারির মধ্যেই চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দুই দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ