বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

করোনায় জনজীবনে নেমেছে দুর্দশা

বাংলাদেশ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ পাড়ি দিচ্ছে। প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এ দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে দেশের শিল্প, শিক্ষা, সেবা ও সংস্কৃতিখাত আবারও জর্জড়িত  হয়ে পড়ছে। এছাড়াও প্রথম ঢেউয়ের থেকে দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং অনুযায়ী, এ দেশের সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা গত ৭ মার্চ, ৭ হাজার ৬শ’ ২৬ জন এবং সর্বোচ্চ মৃতের সংখ্যা গত ৮ মার্চ ৭৭৪ জন। এর জন্য প্রধানত ব্যক্তি অসচেতনতায় দায়ী।
সরকারের নিষেধ অমান্য করে গণপরিবহনে, শপিংমলসমূহে, বাজারে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে, এমন কি রাস্তাঘাটেও জনসমাগমের কোন কমতি ছিল না। তাদের মাঝে ন্যূনতম সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি। মাস্কবিহীন স্বাভাবিক চলাফেরায়, স্বাস্থ্যবিধি ও দূরত্ব না মানায় ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল এ দেশে করোনা সংক্রমণের হার।
এমতাবস্থায় সরকার দেশব্যাপী ৫ এপ্রিল থেকে ১১এপ্রিল লকডাউন ঘোষণা করল। অথচ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না, লকডাউনেও সাধারণ মানুষের মাঝে সতর্কতার লেশ মাত্র নেই। তারা প্রশাসনের আড়ালে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আর সংক্রমণও বাড়ছে হতাশাজনক ভাবে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গত শুক্রবার জানান, “আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য আবারও সর্বাত্মক লকডাউন জারি হতে পারে। এতে জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছুই বন্ধ থাকবে।” নিঃসন্দেহে এটি পরিস্থিতি মোকাবেলায় এক যুগোপযোগী উদ্যোগ। তবে এতে করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। পরিস্থিতির প্রভাবে গৃহবন্দী ও কর্মহারা হয়ে পড়ছে তারা।
সানেমের সর্বশেষ জরিপ, ২০২০ অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্য হার ৪২%, যা করোনা মহামারীতে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের প্রায় সকলেই দিন এনে দিন খায়। এই পরিস্থিতি সামলাতে গিয়েই তারা হিমশিম খাচ্ছে। পাশাপাশি তাদের মাঝে ক্ষুদ্র ঋণের চাপও রয়েছে। উপরন্তু, আবারও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়ে তারা উপার্জনমূখী হতে পারছে না। এতে করে পারিবারিক চাহিদা মেটানো খুবই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
আবার কোন কোন পরিবারের শুধুমাত্র একজনই উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তার কর্মে বাঁধা আসায় পরিবারকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে অনেকেই ইতোমধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছে, ঢাকা থেকে ঘরমূখী মানুষের সংখ্যাও বেশ বেড়েছে। তাদেরকেও করুণ জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। শহরের বস্তিঞ্চালের চোখে পড়ছে দুর্দশাময় জীবন, অনেকে কর্ম হারিয়ে এখন অসহায়।
 এদিকে লকডাউনকে ঘিরে এ দেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য খুব বেশি বেড়ে গেছে। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে, বাজারে সংকট তৈরি করছে। এতে করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবও চোখে পড়ার মতো। একদিকে করোনা মহামারীর প্রভাব অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপ এ দু’য়ের কবলে পড়ে এ দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি হাঁপিয়ে উঠছে। তাদের জীবনধারণের আশাটুকুও ফুরিয়ে আসছে।
যদিও সরকারের টিবিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত পণ্যসামগ্রী এর প্রভাব কিছুটা কমিয়ে এনেছে, তবুও এর সরবরাহ দেশের সর্বত্র হয়নি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষরা এ সেবা থেকে এখনও বঞ্চিত।
 তাই অনতিবিলম্বে এই অবস্থার প্রতিকার দরকার। করোনার প্রথম ঢেউ প্রতিরোধে সরকার যেমন ঘরে-ঘরে চাল, ডাল ও নগদ অর্থ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তা আবারও নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য গত ৯ এপ্রিল সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, আবারও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ৫৭২ কোটি ৯ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা ১ কোটি ২৫ লক্ষ পরিবারের নিকট পৌঁছে দেয়া হবে। তবে এর সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উগ্রপন্থী ব্যবসায়ীদের ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২৬শে মার্চ, ২০২০ এর আহ্বান-“দুর্যোগের সময় মনুষ্যত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এখনি সময় পরস্পরকে সহায়তার, মানবিকতার পরিচয় দেয়ার” এ সাড়া দিয়ে ধনীক শ্রেণিকে এ দেশের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি এই বহুরূপী কোভিড-১৯ কে পরাস্ত করতে ব্যাপকহারে জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। কেবল সকলের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলেই আমাদের এই সংকটময় সময় সুন্দরভাবে পাড়ি দিতে পাড়ব।
-রুকাইয়া মিজান মিমি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ