শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মৌসুম শুরুতেই দেখা দিতে পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। এই রোগ এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত এপ্রিল-জুন মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। এরপর ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে থাকে।
বছরের শুরুর দিকে কিউলেক্স মশার অত্যাচারে রাজধানীবাসী নাকাল ছিলেন। তবে গত কয়েকদিনের আগে হওয়া ঝড়ের পর রাজধানীতে কমেছে মশার প্রাদুর্ভাব।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ‘এখন কিউলেক্স মশা কমে যাবে। এটা প্রাকৃতিক কারণেই। একটা তো ঝড় হলো, তারপরে গরম বেড়ে গেছে। এসব কারণে কিউলেক্স মশা কমে আসবে আস্তে আস্তে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কমতেই থাকবে। তবে বৃষ্টি হলে এডিস মশার উপদ্রপ বাড়তে থাকবে।’
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বাড়ানো এবং যাতে মৃত্যু না হয়, সে বিষয়ে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, ঢাকায় ঘনবসতি বেশি। এখানকার পরিবেশও এডিস মশার জন্য সবচেয়ে অনুকূলে। শহর জুড়ে নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণকাজের এলাকায় জমে থাকা পানিতে মশা ডিম পাড়ে। এ কারণে নির্মাণাধীন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে।
হাত ধোয়ার পরিত্যক্ত বেসিন-ট্যাংকে ডেঙ্গু বাড়ার ঝুঁকি
গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়লে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বসানো হয় অস্থায়ী হাত ধোয়ার স্থান। বছর গড়াতেই হারিয়ে গেছে সেগুলো। কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে খালি বেসিন, কোথাও পানির ট্যাংকি। এসব বেসিন ও পানির ট্যাংকিতে বৃষ্টির পানি জমে ডেঙ্গুবাহী মশা জন্মানোর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আগামী বর্ষার আগেই পরিত্যক্ত এসব বেসিন, ট্যাংক পরিষ্কার করা বা সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ডোবা, নর্দমা, বাড়ির ছাদসহ যেসব স্থানে পানি জমে সেসব স্থানে নিয়মিত পরিষ্কার করার তাগিদও দিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে গতকাল শনিবার জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক, কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার  বলেন, ‘গত বছরে করোনার কারণে মানুষের হাত ধোয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে যেসব বেসিন ও পানির ট্যাংক দেয়া হয়েছে, সেগুলো যদি অকেজো থাকে বা যত্রতত্র পড়ে থাকে এবং সেগুলো যদি ঠিক করে না দেয়া হয় বা সরিয়ে ফেলা না হয়, তাহলে এসব স্থানে বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশা জন্মাতে পারে।’
এ বছরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হতে পারে উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। বৃষ্টি হলে সবকিছু দেখে বোঝা যাবে যে এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি কেমন হবে।’
লকডাউনে কারণে এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের মতোই স্থিতিশীল থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন লকডাউনে ঘরে থাকেন তখন যেকোনো ভাইরাল ডিজিসের ট্রান্সমিশন কমে যায়। গত বছর লকডাউন থাকার কারণে আমরা ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ কম দেখেছি। এর আরেকটা কারণ আছে, লকডাউনে মানুষ যখন বাসায় থাকেন তখন তিনি তার আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখেন। এসময় মানুষের কাজকর্ম কম থাকে, ব্যস্ততা কম থাকার কারণে তিনি বাড়ির আশপাশটা ঘুরে দেখেন। আশপাশের কোথাও এডিস মশা জন্ম নিলে, নিজেরাই টেক কেয়ার করেন। পরিত্যক্ত স্থানে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করেন।’
ডেঙ্গু রোগের বিস্তার
ডেঙ্গু জ্বরে প্রতি বছর আক্রান্ত হচ্ছে কয়েক কোটি মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগটি হয়ে থাকে। ডেঙ্গু রোগটি হয় এডিস স্ত্রী জাতীয় মশার কামড়ে। জমে থাকা পরিষ্কার বা স্বচ্ছ পানিতে এই মশার জন্ম হয়। এসব মশা দিনে কামড়ায়। বর্তমানে একশোটির বেশি দেশে ডেঙ্গু রোগ হয়ে থাকে। একে ‘সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোগ’ বলে বর্ণনা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত বাহক অন্য জায়গায় ভ্রমণ করার মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি যখন অন্যত্র ভ্রমণ করেন, সেখানে তাকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশার ভেতরেও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। সেসব মশা যাদের কামড়াবে, তাদের শরীরে ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ৩৯ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১২৮টি দেশের তিনশো নব্বই কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের বিস্তার
বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। প্রথমে অবশ্য এই জ্বরটি ঢাকায় একসঙ্গে অনেকের হয়েছিল বলে এর নাম হয়ে যায় ‘ঢাকা ফিভার'। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটি ডেঙ্গু জ্বর বলে শনাক্ত করেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ও আইসিডিডিআর,বির পরামর্শক ডা. মাহমুদুর রহমান বলছেন, ‘'সে সময় রোগটি ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যেই দেখা যেতো। কিন্তু মাত্র কয়েকমাস রোগটি থাকতো আর এবারের মতো এতো ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েনি বলে আলোচনা ততোটা হতো না।''
পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় রোগটির বিস্তার ঘটতে দেখা যায়। তিনি জানান, প্রথমদিকে সাধারণ জ্বরের মতো করে এর চিকিৎসা করা হতো, যেহেতু চিকিৎসকরা বুঝতে পারছিলেন না এটি ডেঙ্গু রোগ। তবে পরবর্তীতে রোগটি শনাক্ত করার পর চিকিৎসা পদ্ধতিও নির্ণয় করা হয়। ''কিন্তু এবার যত ব্যাপকভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে, এর আগে আর তেমনটা দেখা যায়নি।," বলেন মি. রহমান।
দেখা দিতে পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ
বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত ও ফাঁকা রাজধানী ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বংশ বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কাই করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, খোলা কমোড ও বিভিন্ন ধরনের পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এবং বিভিন্ন নির্মাণ সাইটে থাকা জলাধারগুলো মশার উৎস হতে পারে।
জুলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ও কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টিপাত এডিসসহ সব ধরনের মশার জন্যই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। এডিস প্রতিরোধে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছি না। এর ফলে সামনের মাসগুলোতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।’ ‘কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব একসঙ্গেই হতে পারে’, যোগ করেন তিনি। ‘সিঙ্গাপুরে একইসঙ্গে এই দুটি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে দুটো ভাইরাসই সক্রিয় রয়েছে এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৫ হাজার।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘কয়েকদিন আগে হওয়া হালকা বৃষ্টিপাত এডিস মশার বংশ বিস্তারে সহায়তা করেছিল। এডিস মশা প্রাপ্ত বয়স্ক হতে ১৫ দিনের মতো সময় লাগে।’
‘সারাদেশে পরিচ্ছনতা কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো শুরু করা উচিত’, বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও পুলিশ স্টেশনগুলো পরিষ্কার করা উচিত। নির্মাণাধীন সাইটের মালিকদের খুব সচেতন হওয়া উচিত। এ ধরনের সাইটে থাকা খাদ, বিভিন্ন ধরনের পাত্র ও জলাধারগুলোতে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা উচিত।’ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলাগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের লাইন ডিরেক্টর শাহনিলা ফেরদৌসী বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিসহ প্রত্যেককেই পরিচ্ছন্নতার মিশন শুরু করা উচিত।’ ‘কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগী যদি ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত হন, তাহলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমরা চিকিৎসকদের জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিচ্ছি’, যোগ করেন তিনি।
আক্রান্তে রেকর্ড
২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু এসেছিল অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে। একইসঙ্গে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু বিস্তৃত হয়েছিল ৬৪ জেলায়। এর আগে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ২০০০ সালে, ৯৩ জন। ওই বছরই রোগটি প্রথম ভয়াবহ আকার নেয়, আক্রান্ত হয় ৫ হাজার ৫৫১ জন। এরপর ধারাবাহিকভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও এতে মৃত্যু কমে আসে। ২০০৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বছরে আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজারের নিচে থাকে, মৃতের সংখ্যাও ছিল খুব কম। ২০১৬ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়ালেও পরের বছর আবার কমে যায়। এরপর আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে ২০১৮ সালে, ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত হয়ে ২৬ জন মারা যায়। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫০ হাজার ১৪৮ জনের ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে সরকারের খাতায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৯ সালে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন।  বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ লোক প্রাণ হারান। আর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৯।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ