মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

করোনা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে রাজনীতিই বেশী করার অভিযোগ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি এখন গত বছরের চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দেশে নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চলতি মাসে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। কিন্তু এরমধ্যেই হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ শয্যাসহ সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলছেন-পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি যখন খুবই খারাপ, তখন করোনা মোকাবেলায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে বরং এটা নিয়ে রাজনীতিই বেশী করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশের প্রায় সব কটি রাজনীতিক দল ও বিশেষজ্ঞরা যখন ঐক্যবদ্ধভাবে করোনা মোকাবেলায় করণীয় ঠিক করার তাগিদ দিচ্ছেন, তখন সরকার ব্যস্ত সমালোচনায়। করোনা নিয়ে না ভেবে বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেই নিয়েই তাদের টেনশন। সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে সবাই এখন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতসহ সরকার বিরোধীদের দমনপীড়ন নিয়ে ব্যস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি যেভাবে খারাপের দিকে যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এ বছরও রোগীদেরকে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হবে। আসলে করোনা মোকাবিলায় সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। প্রধানমন্ত্রীসহ তার মন্ত্রী স্বাস্থ্যখাত নিয়ে শুধু গলাবাজি ও চাপাবাজি করছে।
অভিযোগে প্রকাশ, গত বছর সারাদেশে করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল সরকারের খামখেয়ালি। কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল- করোনা মোকাবেলায় তারা প্রস্তুত, সব ধরনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। পরবর্তীতে দেখা গেল করোনার উপসর্গ নিয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেনি। যারা ভর্তি হয়েছেন তারাও সঠিকভাবে চিকিৎসা পাননি। বিনা চিকিৎসায় মানুষ রাস্তা-ঘাট, হাসপাতালের মাঠ ও সিঁড়িতে পড়ে মারা গেছে। এরপরও আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করেছেন তারা সঠিকভাবে করোনা মোকাবেলা করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা নাকি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। অথচ করোনায় সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ নেই দেশের হাসপাতালগুলোতে। সংকটাপন্ন করোনা রোগীর প্রাণ রক্ষায় অপরিহার্য একটি মেডিকেল ডিভাইস হলো হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা (এইচএফএনসি)। গত বছর মহামারির সূচনালগ্নেই আলোচনায় আসে ডিভাইসটি। সরকারি হাসপাতালগুলোয় ডিভাইসটির সংকট সে সময় মারাত্মক আশঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দেয়। মাঝে কয়েকটি হাসপাতালে কিছু এইচএফএনসি স্থাপন করা হলেও তা ছিল অপ্রতুল। বর্তমানে হাসপাতালগুলোয় বিদ্যমান ডিভাইসগুলোর মধ্যে অনেক অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিভাইসটি নিয়ে পুরনো সে শঙ্কা আবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোয় এ নিয়ে শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় নানা সুবিধার অপর্যাপ্ততায় হাসপাতালগুলো বেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। গত বছরের এমন সংকট থেকেও সরকার শিক্ষা নেয়নি। বরং যারা স্বাস্থ্যখাতের বিষয়ে কথা বলেছেন, তাদের সমালোচনা এমনকি নানাভঅবে হেনস্থারও শিকার হতে হয়েছে। এইচএফএনসির সরবরাহ বাড়ানো গেলে এ পরিস্থিতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যেত বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার করোনা ছড়িয়ে লকডাউনের নামে জনগণের সাথে তামাশায় মেতে উঠেছে। বিশেষ করে গেল মাসে দেশের সুবর্ণজয়ন্তীসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মবার্ষিকীর উৎসব সীমিতভাবে করা গেলে সংক্রমণের পরিধি আরও কম হতো। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞাসহ বিবিশষ্টজনেরা এক মাস আগ থেকেই সরকারকে বলেছিল-দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। করোনা ছড়িয়ে পড়লে পরে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কিন্তু সরকার কারো কথাই পাত্তা দেননি। তারা মজেছিলেন অনুষ্ঠানে। এই সময় করোনা সারাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন অচরণে দেশে যে করোনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে সেটা মানুষ ভুলেই গেছে। কেউ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি, বজায় রাখছে না সামাজিক দূরত্ব। মানুষের এসব বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ন্ত্রণেও সরকারের ছিল না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। সরকার ব্যস্ত ছিল, এখনো আছে বিরোধী প্রতিপক্ষদের দমন পীড়ণে। এরই মধ্যে কোনো প্রকার পরিকল্পনা ছাড়াই করোনা নিয়ন্ত্রণে হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণা করে সরকার।এখানেও সরকার রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সরকার সবাইকে খুশি করতে চাচ্ছে। একবার সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করে। দুইদিন পর সিটি কপোরেশন এলাকায় বাস চলাচল চালু করে। গার্মেন্টস, বইমেলাসহ অনেক কিছুই স্বাভাবিক। এখন আবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকান াট ও মার্কেটগুলো খূলে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আবার বলছে, আগামী ১৩ বা ১৪ এপ্রিল থেকে আবার সর্বাত্বক লকডাউনের ঘোষণা অসবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউন ঘোষণা করলে সাধারণ মানুষের কি হবে? মানুষ কিভাবে অফিসে যাবে? ব্যবসায়ীরা কি করবে? ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কি করবে? গার্মেন্টস শ্রমিকরা কিভাবে অফিসে যাবে? খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের খাবার কোথায় থেকে আসবে? এসব নিয়ে সরকার কোনো চিন্তা করেনি। হুট করে বলে দিচ্ছে-এক সপ্তাহের জন্য সারাদেশে লকডাউন পালন করা হবে। এখানেও সরকার দেশবাসীর সাথে রাজনীতি করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষথেকে লকডাউনের যে নীতিমালা ঘোষণা করা হচ্ছে তাতে করোনা সংক্রমণ রোধের কোন চিন্তাই নাই।  গেল সপ্তাহের নীতিমালায় জনসাধারণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।  সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের অফিস আদালত সীমিতি পরিসরে চালু থাকবে।  কিন্তু জরুরি সেবা দেয় এমন শিল্পকারখানা বিশেষ করে পোশাক কারখানা চালু থাকবে। কাঁচাবাজার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চালু থাকবে। খাবারের দোকান ও হোটেল রোস্তোরাঁ খোলা থাকলেও সেখানে বসে খাবার গ্রহণ করা যাবে না।  তবে খাবার কিনে নিয়ে যেতে পারবেন গ্রাহকরা। বিদেশ থেকে যাত্রীরা বাংলাদেশে আসতে পারবেন।  ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলা না হলেও তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় নাই। এছাড়া বলা হয়েছে, ওষুধের দোকান সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।  অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন অর্থাৎ বাস, রেল ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে।  অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলবে। চালু থাকবে সব ধরনের জরুরি সেবা এবং জরুরি পণ্য পরিবহন। শুধু তাই নয় চলছে বইমেল ও বঙ্গবন্ধু গেমসও। এই লকডাউনের খবরে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরের মানুষ এখন গ্রামে। লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে জনগণের স্থান পরিবর্তনে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় অনেকেই শহর থেকে গ্রামে গেছেন। রাজধানীর অলিগলি থেকে রাজপথ কোথাও লকডাউনের প্রভাব পড়েনি। শুধু মাত্র গণপরিবহন চলাচল ছাড়া রাজধানীর সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও যানজটও দেখা গেছে। এমনকি রাজধানীর অলিগলিগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি জমজমাট ছিল। ইচ্ছেমতো লোকজন ঘোরাফেরা করেছে। নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়াও সব ধরনের দোকান-পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। মাস্ক ছাড়াই অবাধে চলছে বেশিরভাগ লোক। কোথাও কোথাও উঠতি বয়সী তরুণরা আড্ডা দিয়েছে। ভরদুপুরেও রাজপথের কোথাও কোথও যানজট দেখা দিয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হল- এসব দেখার জন্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীরও কোনো তৎপরতা ছিল না। এ যেন বিরোধীদলের হরতালের মতো। কিছু যানবাহন বন্ধ থাকে-বাকী সবই খোলা থাকে। এখানেও সরকারের একটি রাজনীতি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে লকডাউন বলতে রাজি নন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ তার নিজের ইচ্ছামত লকডাউনের একটি সংজ্ঞা তৈরি করেছে। এর সাথে সায়েন্টিফিক লকডাউনের কোনো মিল নাই। এর ফলে করোনা আরো ছড়াবে।  বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জানান, কাঁচাবাজার খোলা থাকলে মানুষ বাজার করতে যাবে। হোটেল খোলা থাকলে মানুষ খাবার কিনতে যাবে। পোশাক কারখানা যেহেতু খোলা থাকবে, হাজার হাজার শ্রমিক বাইরে কাজে যাবেন।  দেশের বাইরে থেকেও লোক আসবেন।  আর সবচেয়ে বড় কথা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর থেকে মানুষ এখন গ্রামে যাচ্ছেন এবং সাত দিন পর তারা ফিরে আসছেন।  এর মানে হলো কয়েক লাখ মানুষ এই এক সপ্তাহে আসা-যাওয়া করেছেন। ফলে লকডাউনের যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে ঘরে আটকে রাখা, বিচ্ছন্ন রাখা তা সফল হচ্ছেনা। এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এই লকডাউন করোনা সংক্রমণ না কমিয়ে বরং করোনা সহায়ক হবে।  কারণ জনসমাগম এবং মানুষের চলাচল বা সংস্পর্শে আমার যথেষ্ঠ সুযোগ থাকছে।  
কানাডা থেকে প্রকাশিত নতুনদেশ এর প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী সাগর বলেছেন, যে দেশের মানুষ রাজনীতি নিয়ে, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে এতো সচেতন, এতো সোচ্চার, সে দেশের মানুষ করোনা ভাইরাসের মতো একটি বৈশ্বিক মহামারীর ছোবল সম্পর্কে এতো উদাসীন হয় কীভাবে? টানা এক বছর ধরে সারা বিশ্বে ভোগান্তি, মানুষের মৃত্যুও তাদের সচেতন করতে পারে না! এটা কীভাবে সম্ভব? যে দেশে ভারতে মানুষ হত্যার দায়ে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে যায়, সেই দেশে করোনার ছোবল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে, করোনার ছোবল থেকে মানুষকে বাঁচাতে তার কিয়দংশ মানুষও উদ্যোগী হতে পারে না কেন! এতো এতো মানুষের মৃত্যুর পরও ‘জান রক্ষার’ সচেতনতার জন্য সমষ্টিগতভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায় না কেন! তিনি বলেন, করোনা মাহামারী থেকে মানুষকে বাঁচানো অবশ্যই সরকারের কর্তব্য। তবে করোনার মতো মহামারিতে মানুষের জীবন রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে সরকারের বাইরেও ভুমিকা থাকতে হয়। সামাজিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি সেই ভুমিকা পালন করতে পারে। আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তি কি সেই ভূমিকা পালন করছে!
গবেষকদের মতে, করোনা ভাইরাসের যে ঢেউ আজ বয়ে যাচ্ছে, তার জন্য ভাইরাস নয়, সরকার ও মানুষ দায়ী। এর আগে আমাদের দেশে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে যায়, তখন প্রয়োজন ছিল স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে জোর দেওয়া। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেটি করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পৃথিবীর কোনো দেশেই মহামারি করোনাকালে কোনরূপ মেলা হয় না। অথচ সরকার এখানে চালু রেখেছে। এটি কাদের স্বার্থে? লকডাউন ঘোষণার আগে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রশংসিত হয় সরকার। তবে নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয় অতি ধীরে। আবার দেখা যায়, কতিপয় নির্দেশনা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেমন, লকডাউনে খোলা থাকবে অফিস-আদালত, কল-কারখানা, গার্মেন্টস।বিজ্ঞানীদের মতে, সাতদিনের লকডাউন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন দেওয়া হলে সেটা কমপক্ষে ১৪ দিন বা দুই সপ্তাহ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ করোনা ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড অর্থাৎ সুপ্তিকাল বা সংক্রমিত করার সময় ১৪ দিন সময়। করোনা ভাইরাস শরীরে ১৪ দিন পর্যন্ত ঘাপটি মেরে থাকে। শরীরে প্রবেশের ১৪তম দিনেও ভাইরাসটি রোগ তৈরিতে সক্ষম। এজন্য বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে ১৪ দিনের লকডাউন হওয়াই যৌক্তিক ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, সমন্বয় ও সময়োপযোগিতার বিরাট ঘাটতি রেখে এভাবে চললে মহামারির নতুন আঘাত সামলানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠবে। তাই নির্দেশনাগুলোর সংশোধনীতে সরকারকে অবশ্যই দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।
বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির সাবেক উপ-মহাপরিচালক ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, দেশে করোনা মহামারীর শুরুর দিনগুলো থেকেই আমাদের সমন্বয়ের অভাব ছিল, পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় মিলের চেয়ে অমিলই বেশি দেখা গেছে। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- কোথায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে আগামীদিনগুলোর জন্য বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসক, ধর্মীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
সরকারের ব্যর্থতার কারণে করোনা ভাইরাস সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিএনপি অভিযোগ করেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের ব্যর্থতার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা ফুটে উঠেছে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, আজকে গোটা জাতির কাছে নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে বাংলাদেশ করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এবং তারা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে এটাকে মোকাবেলা করতে। আমাদের কথা নয়, চীনা বিশেষজ্ঞরা যারা এসেছিল, তারাইতো বলে গেছে যে, এখানে প্রতিরোধের কোন পরিকল্পনাই ছিল না। বিএনপি মহাসচিব চিকিৎসার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বলেন, চিকিৎসা সেবার নামে যে হরিলুট চলছে,সেটা নিয়েও সরকারের মাথা ব্যাথা নেই। তারা মূলত করোনা নিয়ে রাজনীতি করছে। তারা চরম মিথ্যাচার করছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার মহামারি করোনা মোকাবিলা নয় বরং মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।  
বিএনপির এমন অভিযোগ প্রত্যাখান করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, এই দুর্যোগে বিএনপি মানুষের পাশে না থেকে সরকারের অন্ধ সমালোচনা করছে। সরকারের বিরুদ্ধে বরাবরের মতো বিরুপ সমালোচনা করতে গিয়ে বিরাজনীতিকরণের অভিযোগ এনেছেন। আমরা তাকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এ সংকটকালে সরকারতো কোন রাজনীতি করছে না। এমনকি আওয়ামী লীগও এসময়ে কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম করছে না। এখন রাজনীতি হচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা এবং মানুষকে বাঁচানো। তিনি বলেন, বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া তাদের আর কোন রাজনীতি নেই। তারা অসহায় মানুষ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনাক জাহান বলেন, যেখানে বিভাজনের রাজনীতি, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো সেধরণের রাজনীতি করেই যাবে। কিন্তু আমি বলছি, এই মুহূর্তে দেশের জনসাধারণ এতই উদ্বিগ্ন কভিড-১৯ নিয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলো একসাথে কাজ করছে নাকি কাদা ছোঁড়াছুড়ি করছে, এর কোনটার দিকে মানুষ নজর দিচ্ছে না। মানুষ বা সবাই চাচ্ছে কীভাবে তারা করোনাভাইরাস সংকট থেকে পরিত্রাণ পাবে?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ রাজনৈতিক নেতাদের কাঁদা ছোড়াছুড়ি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সংকটকালে জাতির প্রত্যাশা ছিল, এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সবাই আন্তরিক এবং মানবিক হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই কঠিন সময়েও করোনাভাইরাস নিয়ে রাজনীতি বন্ধ হয়নি। চলছে পরস্পর দোষারোপ, চলছে কাঁদা ছোড়াছুড়ি। হানিফ বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে পরস্পরের দোষারোপ এখন আর দেশবাসী দেখতে চায় না।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অবনতির মূল দায় সরকারের। দায়ের জায়গাটা হলো- জনগণকে সচেতন করে জনগণকে এর সাথে লিংক করা। সরকারের দায়িত্ব হলোু হঠকারিতা না করা। সরকারের প্রতিটা ভালো কাজও হঠকারিতার সমতুল্য হয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ