বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

আত্মহন্তারকদের বাঁচতে শেখান

আমেরিকার ডালাসে একটি বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করছিল। সম্প্রতি পরিবারটির দুই ছেলে বাবা, মা, বোন ও নানিকে হত্যা করে নিজেরাও আত্মহত্যা করে বলে সেখানকার পুলিশ জানায়। ওরা নিকটস্থ দোকান থেকে বন্দুক কিনেছিল। ঘটনাটি মর্মান্তিক। উল্লেখ্য, পরিবারটি পাবনা থেকে ডালাসে যায়। ছেলে দুটো মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত ছিল বলে প্রকাশ। আত্মহত্যার মতো অসুস্থ প্রবণতার অন্যতম কারণ মানসিক সমস্যা বা চাপ। দেশ-বিদেশের অনেকই মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু প্রকাশ করতে চান না। এমনকি চিকিৎসকের কাছে যেতেও ইতস্তত বোধ করেন। ফলে ভেতরে ভেতরে রোগ বাড়তেই থাকে। মানসিক সমস্যা ব্যতীত আরও বহুবিধ কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। পারিবারিক বিরোধ, প্রেম-ভালোবাসা, বিবাহবিচ্ছেদ, বঞ্চনা, হতাশা, ব্যর্থতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার অভাবেও আত্মহত্যা করে বসেন অনেকে। পরীক্ষায় ফেল করে কিংবা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়ে বসছেন কেউ কেউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও দুঃখজনকভাবে আত্মহননের পথ বেছে নেন।
কিছুদিন আগে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন ৩০ জন আত্মহত্যা করেন। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুসারে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১১ হাজার ৯৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ৫৬৯ জন ফাঁসিতে, বিষপানে ৩ হাজার ৪৬৭ ও গায়ে আগুন লাগিয়ে ৫৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। গত ২০১৬ তে সারাদেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ১০ হাজার ৬০৩। প্রতিবছর আত্মহত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০১৪ তে ১০ হাজার ৫০০। উল্লেখ্য, প্রতিবছর যেসংখ্যক মানুষ খুন হন তার চেয়ে ৩ গুণ বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বের যতো মানুষ যুদ্ধবিগ্রহে মরেন তার চেয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় মারা যান বেশি। প্রতিবছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেন। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী বছরগুলোতে এ সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে ১ জনে দাঁড়াবে। গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে ৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথে যান। আর্থসামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সংকটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করেন। কেউ কেউ বিভিন্নরকম যন্ত্রণা ও কষ্টে ভোগেন। এ ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতেও অনেকে জীবন বিনাশ করেন। ঢাকার ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের রিপোর্টে উচ্চ শিক্ষিত ও যোগ্য তরুণদের আত্মহত্যার জন্য বেকারত্ব বা চাকরিহীনতাকে দায়ী করা হয়েছে।
‘জীবনযন্ত্রণা’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। জীবন তথা বেঁচে থাকবার আশা যারা হারিয়ে ফেলেন তাঁরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। কথিত জীবনযন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচাতে পারলে, মানসিক শক্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হলে, জীবন সম্পর্কে ব্যঞ্জনাময় উপলব্ধি শেখাতে পারলে মানুষ অবশ্যই বাঁচতে চাইবেন। একথা সত্য যে, মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষ সাধারণত মরতে চান না। সুস্থ ও সবল মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চান। জীবন উপভোগ করতে চান সব মানুষই। তাই যারা জীবনের আলো আগেভাগে নিভিয়ে দিতে চান, তাঁদের মনের আলো আর চেতনার প্রদীপ আগে জ্বালাতে হবে। যতোটা সম্ভব হতাশাগ্রস্ত শিক্ষিত ও যোগ্যদের কাজ দিয়ে, যারা মানসিক রোগাক্রান্ত তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সেবার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন করে নতুনভাবে বাঁচতে শেখাতে হবে। প্রকৃত জীবনের সন্ধান পেলে কে না বাঁচতে চান? তাই জীবনবিমুখদের আগে বাঁচতে শেখাতে হবে। তাহলে আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক প্রবণতা কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ