বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

সংকীর্ণ করা হচ্ছে ইতিহাসের পরিসর, তবে ইতিহাসবোধ নবপ্রজন্মকে নাড়াও দিচ্ছে

সরদার আবদুর রহমান: বর্তমান সময়কালে ইতিহাসের পরিসর যেন সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ ব্যক্তি ও তার পরিম-লের মধ্যেই আটকে থাকছে জাতীয় পর্যায়ের ইতিহাস চর্চার ধারা। এটি জাতির জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হচ্ছে। তবে একথাও ঠিক যে, ইতিহাসবোধ নবপ্রজন্মকে নাড়া দিচ্ছে। তারা এই সংকীর্ণতার আবর্তে ডুবে থাকতে চায় না। ইতিহাসের অসংখ্য বই নতুন প্রচ্ছদ ও অবয়ব নিয়ে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

ইতিহাসের সাড়া জাগানো কয়েকটি গ্রন্থের প্রকাশনাকে সামনে রেখে এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গ্রন্থপ্রণেতা সরদার আবদুর রহমান। গ্রন্থ তিনটি হলো: ১. ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি, ২. উড়িষ্যা ও কামরূপ বিজয়ী বাঙালি বীর ‘কালাপাহাড়’ এবং ৩. আসাম ও কামরূপে মুসলমানদের হাজার বছর। গ্রন্থগুলো প্রকাশ করে ঢাকার অভিজাত প্রকাশনী ‘দিব্যপ্রকাশ’। বাংলা একাডেমির চলমান গ্রন্থমেলাতে বইগুলো দিব্যপ্রকাশের স্টলে যথারীতি পাওয়া যাচ্ছে।

একটি লিটল ম্যাগের জন্য সরদার আবদুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন ‘নতুন এক মাত্রা’ পত্রিকার সহকারি সম্পাদক শাহাদাৎ সরকার। এটি এখানে পত্রস্থ করা হলো।

শাহাদাৎ সরকার : আপনার ‘আসাম ও কামরূপে মুসলমানদের হাজার বছর’ বইটি সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যেই বইটি নিয়ে বেশ আলোচনাও শুরু হয়েছে। এই যে একটি বই নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা সেটাকে কিভাবে দেখেন? 

সরদার আবদুর রহমান : একজন লেখকের জন্য এটি অবশ্যই ইতিবাচক ও প্রেরণাদায়ক। আলোচনা মানে এটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আর সমালোচনা মানে পাঠক এর ভালো ও মন্দ- দুটি দিকেই মনোনিবেশ করেছেন। প্রকৃত ও গঠনমূলক সমালোচনা একজন লেখককে সমৃদ্ধ হতে সহায়তা করে। সেইসঙ্গে পাঠকের দৃষ্টিকেও স্বচ্ছ করে।

শা. স : আপনি তো সংবাদকর্মী । সেই পেশার পাশাপাশি ইতিহাস চর্চায় কেন মনোনিবেশ করলেন? 

স. আ. র : আজ যা ‘সংবাদ’ আগামীকাল তাই ‘ইতিহাস’। ফলে সংবাদপত্র ও ইতিহাসের মধ্যে জনক ও জাতকের সম্পর্ক। একজন ভালো সংবাদকর্মীকে ইতিহাসেরও ভালো পাঠক হওয়া জরুরি। তবে  ইতিহাস চর্চায় আমার মনোনিবেশ করার অন্যতম কারণ হলো, আমি বরাবরই ইতিহাসের একজন অনুরাগী পাঠক ছিলাম এবং আছি। তাছাড়া বয়সের একটা পর্যায়ে এসে লক্ষ্য করলাম যে, বাংলা ভাষায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসের অনেক কিছুই লেখার প্রয়োজন- যা পুরাতন প্রজন্মের অনেক বিভ্রান্তি নিরসন করবে এবং নতুন প্রজন্মের সেসব ইতিহাসের সত্য জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে। মূলত সেই দায়িত্ব-চেতনাবোধ থেকেই ইতিহাসের পুনর্লিখন করার এই উদ্যোগ।

শা. স : আপনার প্রকাশিত উড়িষ্যা ও কামরূপ বিজয়ী বাঙালি বীর ‘কালাপাহাড়’ এবং ‘ইখতিয়ার উদ্দীন  (৬-এর পাতায় দেখুন)

(৫-এর পাতার পর)

মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি’ ইতোমধ্যে দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে। ইতিহাসের বইয়ের এতো তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় মুদ্রণ এটা খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই ঘটে। আপনার ‘ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি’ এক বছরের মাথায় দ্বিতীয় মুদ্রণের বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? এতে কি বলা যেতে পারে আমরা ইতিহাসপ্রিয় হয়ে উঠছি?

স. আ. র : প্রথমত, মধ্য ও আধুনিক বাংলার ধারাবাহিক ইতিহাস লিখতে বা বলতে হলে ‘বখতিয়ার খলজি’ অপরিহার্য একটি চরিত্র। একজন লেখক বা পাঠক যে দৃষ্টিভঙ্গি বা চেতনার মানুষই হন না কেন- বখতিয়ার খলজিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষত, এই অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাসের জন্য তিনি এক মাইলফলক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ ও পাঠ্যপুস্তকে তাঁকে নিয়ে অধ্যায় রচিত হয়েছে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচিত হয়েছে নানাভাবে। কিন্তু তাঁর এযাবত কোনো পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখা হয়নি- বিশেষত বাংলা ভাষায়। অন্য কোনো ভাষাতেও চোখে পড়েনি। এছাড়াও বর্ণবাদী লেখকদের খপ্পরে পড়ে বখতিয়ার খলজি কোনো কোনো ক্ষেত্রে খলনায়করূপে চিত্রিত হয়েছেন। কিন্তু খলনায়ক নন, নিরপেক্ষ ইতিহাসে তিনি একজন প্রকৃত মহানায়ক হিসেবেই প্রতিভাত হয়ে উঠেছেন। দ্বিতীয়ত, ‘কালাপাহাড়’ চরিত্রটি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়- একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। তিনি সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটেও বিশেষভাবে আলোচিত। আমার কাছে এই চরিত্রটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের মূল কারণ দুটি। এক. তিনি আমাদের এই বাংলার বিশেষত বরেন্দ্রভূমির সন্তান। তিনি ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হন এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে। ইতিহাসে তিনি একাধারে ধর্ম পরিবর্তনকারী, প্রেমিক পুরুষ, সাহসী বীর, যুদ্ধ-বিজয়ী এবং স্বাধীনতাকামী পুরুষ। বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তাঁকে কেন্দ্র করে অসংখ্য ইতিহাস, কিংবদন্তি, গল্প, উপন্যাস, নাটক, যাত্রাপালা প্রভৃতি রচিত হয়েছে। ফলে একজন লেখকের রচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন তিনি।

দুই. কালাপাহাড়কে নিয়ে আমাদের এই বাংলায়ও একশ্রেণির অসচেতন ইতিহাস পাঠক বিদ্বেষী লেখকদের লেখা পাঠে বিভ্রান্ত হয়ে আছেন। তাদের সামনে একটি প্রকৃত ইতিহাস-চিত্র তুলে ধরার দায়িত্ববোধ থেকেও এই গ্রন্থটি রচনার প্রয়াস।

সম্ভবত উপরোক্ত বিষয়গুলি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। ফলে তাঁরা এই গ্রন্থ দুটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। সেই সঙ্গে অনেকেই সঠিক ইতিহাস জানার প্রতি উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন বলে মনে করা যায়। সেসব কারণে এই বই দুটির পুনর্মুদ্রণ করতে হয়ে থাকতে পারে।

শা. স : অনেকই মনে করেন যখন মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয় তখন অতীতচারী হয়ে উঠে বা অতীত নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ অতীতের সাফল্য নিয়ে বর্তমান হতাশা থেকে পালিয়ে থাকতে চায়। ইতিহাস পাঠকে আপনি সেভাবে দেখেন কিনা?

স. আ. র : এই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে তা সর্বাংশে সঠিক নয়। মানুষের একটি প্রিয় বিষয় যেমন ‘স্মৃতিচারণ’, তেমনই ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখার একটা প্রবণতা সবসময়ই কিছু মানুষের থাকে। দেখবেন, একজন পড়াশোনা করা মানুষ (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) যে বিষয়েরই ছাত্র হন না কেন, তিনি ইতিহাসেরও রস আস্বাদন করতে আগ্রহী থাকেন। এটি বরাবরই ছিল। তবে অতীতের মতো সাম্প্রতিক সময়গুলিতে ইতিহাসকে বিকৃত করার জোর প্রবণতা বেড়েছে। আবার ইতিহাসের পরিসরও অত্যন্ত সংকীর্ণ করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। প্রকৃত সচেতনতা যেমন ধর্মীয় গ্রন্থ ও বিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে আসে, তেমনই ইতিহাস পাঠে সেটি আরও স্বচ্ছ ও দৃঢ় হয়। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম চেতনাবোধ জাগ্রত না হলে তাদের ইতিহাসেরই অন্ধকার আবর্তে হারিয়ে যেতে হবে। সম্ভবত এই বোধ নবপ্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে নাড়া দিচ্ছে। ফলে তারা সাড়াও দিচ্ছে। এটি যদি সত্য হয় তাহলে তা শুভসংবাদ বলেই মনে করতে হবে।

শা. স : যখন আসামে মুসলমানদের বহিরাগত বলে এনআরসির মাধ্যমে বের করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে ঠিক তখন আপনার ‘আসাম ও কামরূপে মুসলমানদের হাজার বছর’ বইটির প্রকাশ। এটি কী পূর্ব পরিকল্পিত? নাকি উদ্ভুত সমস্যার আলোকে লেখা? 

স. আ. র : এনআরসি’র সঙ্গে এই গ্রন্থ রচনার সম্পর্ক ছিল না। তবে সেখানে মুসলমানদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করার একচোখা নীতির বিরুদ্ধে এই বইটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হতে পারে। মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের ঘনিষ্ট প্রতিবেশি হিসেবে আসাম অঞ্চলে মুসলমানদের ঐতিহাসিক পরিচয় তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ।

শা. স : আপনি শুধু ইতিহাস চর্চা করছেন নাকি সৃজনশীল কাজও করছেন? 

স. আ. র : একটা সময়ে কিছু সৃজনশীল কাজ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তাতে কিছুটা বিরতি দিয়ে ইতিহাসের দিকে ঝোঁক বাড়াতে হয়েছে। আর ইতিহাসের ভেজালপূর্ণ গভীর আবর্ত থেকে সঠিক ও প্রকৃত সত্য তুলে আনা সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম বলে মনে হচ্ছে না। আর বর্তমান সময়ে ইতিহাস চর্চার নামে একটা বিশেষ ¯্রােত তৈরির প্রক্রিয়া চলছে এবং তা বলতে গেলে একপেশে ও একগামী। এই পরিস্থিতিতে আরেকটি ¯্রােত তৈরির- তা যতোই ক্ষীণ মনে হোক না কেন- প্রচেষ্টা থাকতে হবে। সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে।

শা. স : ইতিহাস চর্চার মধ্যে দিয়ে কি আগামীর পথ নির্মাণ করা সম্ভব বলে মনে করেন? 

স. আ. র : যে সকল উপায়-উপকরণ বা কৌশল-পদ্ধতিতে আগামীর পথ নির্মাণ করা হয় বলে মনে করা হয়, ইতিহাস তার একমাত্র নয়- একটা অংশ। জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার পরিচয় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে চেতনার বিকাশ ঘটে থাকে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এটির মাধ্যমে উল্লিখিত ‘আগামীর পথ’ নির্মিত হতে পারে বলে মনে করি।

শা. স : সাধারণ পাঠককে ইতিহাসমুখি করতে কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন? 

স. আ. র : ইতিহাস রচনা ও গ্রন্থনায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। গবেষণার কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বাক্যের অতি পা-িত্য থেকে বের করে এনে রচনাকে সরস ও সাধারণ পাঠকের পাঠোপযোগী করতে হবে। তবে তা যেন গবেষকের কাজেরও উপযোগী হয় এবং পাঠকের বিশ্বাসযোগ্য থাকে সে উপায় রাখতে হবে। বহুল আলোচিত বিষয়ের চর্বিতচর্বন না করে অনালোচিত এবং গভীরের বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পাঠকের চিন্তার জগতে নতুন ভাবনার উদ্রেক করে- এমন বিষয়সমূহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আবার আলোচিত বিষয়গুলো যদি প্রবল বিকৃতির শিকার হয়ে থাকে তবে সেগুলোর পুনর্নির্মাণ করতে হবে। তবেই পাঠক ইতিহাসমুখি হতে পারে বলে মনে হয়।

শা. স : আপনাকে ধন্যবাদ।

স. আ. র : তোমাকেও ধন্যবাদ।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ