বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

মামলার জালে জড়াচ্ছে হেফাজতে ইসলাম

# মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নামে আরও তিন মামলা
# ‘শিশু বক্তা’ রফিকুল মাদানী আটক
নাছির উদ্দিন শোয়েব : মামলার জালে জড়াচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সমাবেশ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন অন্তত ১৪ জন। এর রেষ না কাটতেই হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হক দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সোনারগাঁওয়ে একটি রিসোর্টে অবরুদ্ধ করে লাঞ্ছিত করাা হয়। পরে শত শত হোফজত সমর্থক তাকে মুক্ত করে নেয়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরো কয়েকটি মামলা করে। এরই মাধ্যে বায়তুল মোকাররমে সহিংসতার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়াও পুলিশের ওপর হামলা ও রিসোর্টে ভাংচুরের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে গতকাল মামলা হয়েছে। মামলায় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩০ মামলায় অন্তত ২০ হাজারের বেশি আসামী করা হয়েছে। এ ছাড়াও হেফাজতে ইসলামের আমীর, মহাসচিবসহ ৫৪ নেতাকর্মীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মোদিবিরোধী আন্দোলনের পর তাদের ব্যাংকে কী পরিমাণ অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে তা দেখতে তাদের হিসাব তলব করা হয়। সরকারের একটি সংস্থার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এই হিসাব তলব করা হয়েছে। এদিকে রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক কথাবার্তা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগে ‘শিশুবক্তা’ হিসেবে পরিচিত মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটক করেছে র‌্যাব।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সহিংসতা রোধে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেখানেই নাশকতা হবে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না। যারা নাশকতা করবেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যারা চিহ্নিত হবেন, দোষী সাব্যস্ত হবেন তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সমস্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে কঠোর অবস্থানে যাবে সরকার। এর আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, তদন্তে হেফাজতের নেতাদের নাম আসলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম মঙ্গলবার জানিয়েছেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকসহ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৭ নেতার নামে মামলার এজাহারে এক নম্বর ও হুকুমের আসামী করা হয়েছে মামুনুল হককে। মামুনুল হককে গ্রেফতার করার বিষয়ে ডিসি বলেন, আমরা তদন্ত করব। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। তবে আমরা কোনো পদ বিবেচনায় নেব না। আমরা অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর তারা বিশেষ পর্যবেক্ষণে আছেন। একাধিক সংস্থার গোয়েন্দা জালে আছেন মামুনুল হকসহ আরো কয়েকজন হেফাজত নেতা। তারা কোথায় অবস্থান করছেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন সব তথ্য তারা সংরক্ষণ করছেন। তিনিসহ আরো কয়েকজন হেফাজত নেতার বিষয় ঊর্ধ্বতন পর্যায় সিদ্ধান্ত নিবে। সবুজ সংকেত আসলেই যেকোনো সময় পুলিশ অভিযানে যাবে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এখনই এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সূত্র। এদিকে গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে হেফাজত নেতা মামুনুল হক বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
মামুনুলসহ ৮৩ জনের নামে তিন মামলা : পুলিশের ওপর হামলা ও রিসোর্টে ভাঙচুরের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। দুটি মামলা পুলিশ বাদী হয়ে ও অপর মামলাটি আহত এক সাংবাদিক বাদী হয়ে করেছেন। এই তিন মামলার মধ্যে একটি মামলায় মামুনুল হককে আসামী করা হয়েছে। ওই মামলায় তাকে প্রধান আসামী করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সোনারগাঁ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইয়াউর রহমান সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও রয়্যাল রিসোর্ট ভাঙচুরের ঘটনায় ৪১ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামী করে একটি মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামী করা হয় মামুনুল হককে। এ ছাড়া এ মামলায় সোনারগাঁ পৌরসভা জাতীয় পার্টির সভাপতি এম এ জামান, সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মহিউদ্দিন খান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদের খতিব ইকবাল হোসেনসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের আসামী করা হয়।
এসআই আরিফ হাওলাদার বাদী হয়ে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও একটি মামলা করেন। এ মামলায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ২৫০-৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়। এ মামলায় আসামী করা হয়েছে হেফাজতে ইসলাম, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের। অপর মামলাটি করেন হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের হামলায় আহত স্থানীয় এস এ টেলিভিশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান। এ মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ ও ৭০ থেকে ৮০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামী করা হয়। তিনটি মামলা হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার তবিবুর রহমান বলেন, আসামীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর ও যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানায় আরও একাধিক মামলার প্রস্তুতি চলছে।
শিশু বক্তা’ রফিকুল মাদানী আটক:  ওয়াজ মাহফিলে ‘শিশু বক্তা’ হিসেবে আলোচিত রফিকুল ইসলাম মাদানীকে (২৭) আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার লেটিরকান্দা থেকে আটক করা হয়। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আকবর আলী মুন্সী। তিনি বলেন, আটক রফিকুল বর্তমানে র‌্যাব হেফাজতে আছেন। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক আ. ন. ম. ইমরান খান বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী উসকানিমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটকের প্রতিবাদে গতকাল বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ নেত্রকোনা শাখার ব্যানারে এই আয়োজন করা হয়। এ সময় আয়োজকেরা রফিকুল ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে বলেন, রফিকুল ইসলাম মাদানী এখন কোথায় আছেন, তা তাদের জানা নেই। তাকে কেন আটক করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা বলছে না। তাকে দ্রুত মুক্তি না দেওয়া হলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রফিকুল ইসলাম মাদানীর বড় ভাই রমজান মিয়া বলেন, তার ভাই মঙ্গলবার রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে ধর্মীয় সভা করে নিজের বাড়িতে আসেন। রাতের খাবার শেষে সবাই ঘুমিয়ে যান। রাত আড়াইটার দিকে র‌্যাব পরিচয়ে কিছু লোক প্রায় ১৯টি গাড়ি নিয়ে তাদের বাড়ি ঘেরাও করে। পরে রফিকুল ইসলাম মাদানী, তার বড় ভাই বকুল মিয়া (৩৭) ও তার দূর সম্পর্কের ভাতিজা এনামুল হককে (২৮) তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বকুল মিয়াকে রাতেই ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য দুজনের খোঁজ তাদের জানা নেই। তার দাবি, রফিকুল ইসলাম মাদানীর ব্যবহৃত দুটি মোবাইলফোনসহ তাদের পরিবারের ছয়টি ফোন জব্দ করে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলার জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবদুর কাইয়ুম, হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা আসাদুর রহমান আকন্দ, মাওলানা তোবাইদ কাসেমী প্রমুখ। হেফাজতের নেতারা দাবি করেন, রফিকুল ইসলাম মাদানী তাদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম মাদানীরা পাঁচ ভাই। রফিকুল সবার ছোট। তার বাবা মৃত শাহাবুদ্দিন। রিফকুল ইসলাম নেত্রকোনার মালনী এলাকায় জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ঢাকায় চলে যান। সেখানে লেখাপড়া করার সময় ‘শিশু বক্তা’ হিসেবে আলোচিত হন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ