বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

বন্ধ‘অ্যাপ’॥ তবে ‘খ্যাপ’এ চলছে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন

মটরসাইকেলে যাত্রী উঠানো সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার মগবাজার মোড়ে মটরসাইকেল চালকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করে -সংগ্রাম

# মোটরবাইকে রাইড শেয়ারিং চালুর দাবিতে বিক্ষোভ
তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : ছোটখাটো ফলের দোকান দিয়ে ঢাকা দক্ষিণের সবুজবাগের বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় ব্যবসা শুরু করেছিলেন বরিশালের মুলাদীর মনির হোসেন। কয়েকটা বছর যেতে না যেতেই ফলের ব্যবসায় লাভের মুখ দেখতে না পেয়ে শুরু করেন চা-পান-সিগারেটের দোকান। তাতেও যখন পরিবারের চার সদস্যের ভরণ পোষণ চলছিল না তখন বিকল্প কিছু করার চিন্তায় মশগুল হয়ে পড়েন মনির। বন্ধু-বান্ধবদের বুদ্ধি আর পরামর্শে সে দোকান ছেড়ে মোটর সাইকেল কিনে নেমে পড়েন রাইড শেয়ারিংয়ে। মোটামুটিভাবে কিছুদিন ভালোই আয়-উপার্জন চলছিল। এতে পরিবারের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সেটাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বেশিদিন। রাস্তায় চলতে গিয়ে দৈনিক-সাপ্তাহিক-মাসিক হারে চাঁদা দেয়া , করোনার কারণে যাত্রী কমে যাওয়া, যাত্রী পরিবহনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা- এসব মিলিয়ে রাইড শেয়ারিংয়ের নিত্যনতুন উটকো ঝামেলা আর উপদ্রবের কবলে পড়েন মনির। একপ্রকার বাধ্য হয়েই মোটর সাইকেল চালক মনির রাইড শেয়ারিংয়ের অ্যাপ ছেড়ে খ্যাপে যাত্রী পরিবহনের পথে ঝুঁকেন। এখন সেখানেও নানা বিপত্তি। পথে পথে দেয়া চাঁদার পরিমাণ বেড়ে এখন তা দেড়গুণ-দ্বিগুণ হয়েছে। এতে করে ওই পেশায় টিকে থাকাটা দু:স্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। শুধু একজন মনিরের অবস্থাই এমন নয়। রাজধানী ঢাকার বুকে রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করে আয়ের পথে নামা হাজারো মোটরসাইকেল চালকেরই বর্তমানে এমন অবস্থা।
এদিকে সরকার ঘোষিত এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণার পর রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’ তাদের পার্সেল ডেলিভারি ছাড়া সব কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। জনপ্রিয় এ দুটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি তাদের সেবা বন্ধ রাখলেও থেমে নেই মোটরবাইকে যাত্রী পরিবহন। অ্যাপের পরিবর্তে এখন খ্যাপে চলছে যাত্রী পারাপার। এ নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি অবস্থান থাকলেও চোখ ফাঁকি দিয়েই চলছে সেবাটি।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করে বিধি-নিষেধ আরোপ করে সরকার। এতে নগরীতে সব ধরনের গণপরিবহন দু’দিন বন্ধ থাকে। ফলে অফিসগামী যাত্রীরা অনেকটা বিপাকে পড়েন। এ সুযোগেই অ্যাপে পরিচালিত মোটরবাইকগুলো এখন অ্যাপের পরিবর্তে খ্যাপে (কন্ট্রাকে) যাত্রী পরিবহন করেছে। এর আগে থেকেও অ্যাপের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিকভাবে যাত্রী পরিবহন চলে আসছে।
সরজমিনে মঙ্গলবার সকালে নগরীর খিলগাঁও রেলগেটের পাশে সারিবদ্ধভাবে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের একজন আমির হোসেন। তিনি বলেন, রিকশায় দুজন চলতে পারে। সিএনজি চলতে পারে। তাহলে মোটরবাইক চলতে পারবে না কেন? রিকশা-সিএনজি থেকে তো মোটরবাইক আরও নিরাপদ। এখানে কেউ মুখোমুখি বসে না। তিনি আরও বলেন, অফিস আদালত, বই মেলা সবই খোলা। দোকানপাটও কমবেশি খোলা। বন্ধ শুধু রাইড শেয়ারিং অ্যাপ। তাহলে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে? অ্যাপ চলে না তাতে কী হয়েছে? এখন মানুষ প্রয়োজনেই আমাদেরকে খোঁজে। সে কারণে আমরা রাস্তায় এখন কন্ট্রাকে যাত্রী বহন করি।
তবে সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগ, অ্যাপের চেয়ে খ্যাপের মাধ্যমে মোটরবাইক চালকরা কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায় করছে। তাছাড়া গণপরিবহন বন্ধের সুযোগও তারা নিচ্ছেন। এতে বাধ্য হয়েই গন্তব্যে পৌঁছার কারণে তাদের দাবিকৃত ভাড়াই পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বাসাবো থেকে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন বাবাকে দেখার জন্য মোটরবাইকে উঠেছেন আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, অন্যদিন এই পথে একশ থেকে ১২০ টাকায় যেতাম। আজ রাস্তা ফাঁকা। ১৫০ টাকা দেবো বলার পরেও বাইকচালক রাজি হচ্ছে না। তিনি দাবি করছেন ১৭০ টাকা।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থানরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা মোটরবাইকে দুইজন পরিবহন হতে দেখলেই মামলা দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন মোটরবাইক চালকরা।
জানতে চাইলে পাঠাওয়ের মার্কেটিং ডিরেক্টর সৈয়দা নাদিলা মাহবুব বলেন, পাঠাওয়ের যাত্রীবাহী বাইক সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। তবে পাঠাও পার্সেলসহ অন্যান্য সার্ভিসগুলো চালু রয়েছে।
উবারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, করোনার কারণে তারা বাংলাদেশে তাদের পার্সেল ডেলিভারি সেবা উবার কানেক্ট ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন।
জানা গেছে, ঢাকায় অ্যাপ ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালু হওয়ার পর থেকে কিছুদিন অ্যাপের মাধ্যমেই চলাচল করেছে মোটর সাইকেল, কার। এতে রাজধানীবাসীর কাছে সেবাগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রয়োজনের তুলনায় মোটর সাইকেল-কার এর সংখ্যা কম হলেও গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীরা দীর্ঘক্ষণও অপেক্ষায় ছিলেন। একটা পর্যায়ে এসে পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে যায়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে অনেকেই এ রাইড শেয়ারিংয়ে নেমে পড়েন। হঠাৎ করেই দেখা যায়, অ্যাপের বাইরে খ্যাপের মাধ্যমে মোটর সাইকেল চলাচল করছে। এ অবস্থা এখনও । জানতে চাইলে মোটর সাইকেল চালকরা জানান, যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতেই তারা খ্যাপে যাচ্ছেন। তাছাড়া, অ্যাপে তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণের কমিশন দিতে হয়। এতে করে দিনশেষে যেটা থাকে তাতে করে পরিবার পরিজন নিয়ে চলা দায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তারা খ্যাপে ( চুক্তি ভিত্তিক) চলাচল করছেন।

মোটরবাইকে রাইড শেয়ারিং চালুর দাবিতে বিক্ষোভ
চলমান লকডাউনে অন্যান্য যানের মতো অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল পুনরায় চালুর করার দাবি জানিয়ে গতকাল বুধবার ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন রাইড শেয়ারিং মোটারসাইকেল চালকেরা।
 রাজধানীর মগবাজার, বেইলি রোড, শ্যামলী, এয়ারপোর্ট ও তেজগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ করে স্বল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মগবাজারে প্রায় আধা ঘণ্টার বিক্ষোভে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সেখানে প্রায় ২০০ মোটরসাইকেল চালক বিক্ষোভ করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সেখান থেকে বিক্ষোভকারীরা পরে চলে যান বেইলি রোডে, তারপর শ্যামলীতে।
 বিক্ষোভকারীদের একজন জামিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন বাস চলছে, বাইকারদের নিয়েই কেন সমস্যা? একটা বাইকের পেছনে একজন মানুষ গেলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকারের নিয়মে সবাই চালাতে পারলে আমরা কেন পারব না?’
ওই মোটরসাইকেল চালক আরও বলেন, ‘প্রতিদিনের আয়ে প্রতিদিন চলতে হয়। আমাদের কারও টানা কয়েক দিন (বসে) খাওয়ার মতো টাকা নেই। আমার মা-বাবার ওষুধ কিনতে হয়। এটার ওপর নিষেধাজ্ঞা হলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই মারা যাব।’
ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. এহসানুল হক প্রতিটি মোটরযান খুলে দেওয়া পরও মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা রাইডার আছি, গত বছরের লকডাউনের পর থেকে অবস্থা করুণ। অনেকের কাছ থেকে তখন ঋণ নিয়েছি। সেটা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি। শেয়ারিংয়ে টাকা দেওয়ার পর অল্প টাকা থাকে। সেটাও বন্ধ।’ তিনি বলেন, ঢাকার অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালকদের বেশির ভাগই শিক্ষিত। ফলে কারও কাছে হাত পাতার সুযোগও নেই।
এহসানুল হক বলেন, ‘লকডাউনকে প্রচণ্ড ভয় পাই। এটা শুনলেই কষ্ট হয়। লকডাউন মানেই পরিবারে কান্না দেখা, লকডাউন মানেই না খেয়ে থাকা, লকডাউন মানেই অজানা শঙ্কা কাজ করা।’
রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহনে গত ৩১ মার্চ থেকে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। আপাতত এই নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী দুই সপ্তাহের জন্য বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের বরাত দিয়ে গত বুধবার সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এ কথা জানিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ