শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

পাঁচ বছরে পদ্মায় সবচেয়ে কম পানি পাওয়ার রেকর্ড গড়াই শুকিয়ে যাওয়ায় খোকসায় হেঁটে পারাপার

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা: গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পানি এখন পদ্মা নদীতে। যৌথ নদী কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষের দিকে কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে মাত্র ২৩ হাজার কিউসেকের মতো পানি প্রবাহ রেকর্ড হয়েছে।
পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় এর প্রধান শাখা নদী গড়াই শুকিয়ে গেছে। কুষ্টিয়ার খোকসায় মানুষ হেঁটে পার হচ্ছেন এই নদী। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্পের পাম্প বন্ধ রাখায় সংকটে পড়েছেন হাজারো কৃষক।
যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে, ২০১৬ সালে মার্চের শেষে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহ ছিল ২১ হাজার ৭১০ কিউসেক। এর পরে এখানে পানির প্রবাহ কখনও ৩০ হাজার কিউসেকের নিচে নামেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা অবশ্য বলছেন, ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ১ এপ্রিল থেকে ১০ দিন ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাবে। তখন সংকট কেটে যাবে।
১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১১ থেকে ২০ মার্চ, ১ থেকে ১০ এপ্রিল এবং ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল গ্যারান্টিযুক্ত ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাবে। বাকি সময়ে ভারত পাবে গ্যারান্টিযুক্ত ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি। সে অনুযায়ী, এখন অর্থাৎ ২১ থেকে ৩১ মার্চ চলছে ভারতের প্রাপ্যতার সময়। বাংলাদেশ এখন পাচ্ছে অবশিষ্ট পানি। যৌথ নদী কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগের ১০ দিনে (১১-২০ মার্চ) যখন বাংলাদেশ গ্যারান্টিযুক্ত ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পেয়েছে, তখন ভারত পেয়েছিল অবশিষ্ট ২৪ হাজার ৫২২ কিউসেক।
গঙ্গা নদী পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশের পর কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। এখানে যৌথ নদী কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পানির হিসাব রাখে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে পদ্মায় বালুচর জাগতে দেখা গেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মোট ১৬টি গার্ডারের মধ্যে ১০টি আছে পানির মধ্যে। মাটিতে থাকা দুই পাশের দুটি বাদ দিলে বাকি চারটি গার্ডারের গোড়ায় বালু জমেছে।
যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে, এ বছর জানুয়ারি থেকেই ধারাবাহিকভাবে পানির প্রবাহ কমছে। ১০ দিন করে ভাগ করে প্রতি মাসে তিন ধাপে পানি প্রবাহের হিসাব দেয় তারা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম ধাপে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহ ছিল ৬৯ হাজার কিউসেকের ওপরে, এর পরের ১০ দিন ছিল ৫৫ হাজারের ওপরে, শেষের ১১ দিনে তা নেমে আসে সাড়ে ৫২ হাজারে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ৫০ হাজার কিউসেক থাকলেও শেষ ভাগে ছিল ৩৯ হাজার কিউসেক পানি। আর মার্চের প্রথম ১০ দিনে এখানে পানি ছিল ৩৬ হাজার ৯৭৮, মাঝের ১০ দিনে পাওয়া গেছে ৩৬ হাজার ৩৯৩ কিউসেক। এ সময় ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার মোট পানি ছিল ৫৯ হাজার ৫২২ কিউসেক। আগামী ১ এপ্রিল ২১ থেকে ৩১ মার্চের পানির প্রাপ্যতার তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন যৌথ নদী কমিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম সাইফুদ্দিন।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হেকিম যৌথ নদী কমিশনের সূত্র উল্লেখ করে জানান, মার্চের শেষে এসে পদ্মায় পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৩ হাজার কিউসেকের মতো। যে কারণে পানি ৪.১ মিটার রিডিউসড লেভেলে (আরএল) নেমে আসায় গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে বন্ধ রাখতে হচ্ছে জিকে সেচ প্রকল্পের দুটি পাম্পই।
১৯৯৬ সাল থেকে ২৬ বছরের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২১-৩১ মার্চ সবচেয়ে কম পানি থাকে গঙ্গায়। আর পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী এই সময়টিই গ্যারান্টিযুক্ত ৩৫ হাজার কিউসেক পানির প্রাপ্যতা রয়েছে ভারতের ভাগে। তাছাড়া মার্চ মাস ৩১ দিনে হওয়ায় সবচেয়ে শুষ্ক মৌসুমে ১০ দিনের জায়গায় ১১ দিন এই ভাগ নিচ্ছে ভারত।
গত বছরের মার্চ মাসের পানির হিসাবের সঙ্গে এবার তুলনা করলেও দেখা যায়, গঙ্গায় পানিপ্রবাহ অনেক কমেছে। ২০২০ সালের মার্চের প্রথম ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ছিল ৯৪ হাজার ৯৯০ কিউসেক। এবার সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৬২ হাজার ৪০২ কিউসেক। আর পরের ১০ দিনে ২০২০ সালের পাওয়া যায় ৯৫ হাজার ৯৭০ কিউসেক। এবার সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৫৯ হাজার ৫২২ কিউসেক। আর ২০২০ সালে মার্চের শেষ ১১ দিনে ফারাক্কায় পানি পাওয়া গেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬১৯ কিউসেক। প্রকৌশলীদের দেয়া হিসাবে সেখানে এবার পানি মিলতে পারে ৫৮/৫৯ হাজার কিউসেকের মতো।
ফারাক্কা পয়েন্টের আগে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বলেন, ১ হাজারটি সেচ প্রকল্প এবং ব্যারেজ নির্মাণ করেছে। সমালোচিত ইন্টার রিভার লিংকিং প্রকল্পের মাধ্যমে এসব প্রকল্প ও ব্যারেজের জন্য আগেই গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তাই ফারাক্কা পয়েন্টে কত পানি পাচ্ছি তা নিয়ে আমাদের হৈচৈ না করে পুরো গঙ্গা বেসিন ধরে হিসাব নিতে হবে।’
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী কুষ্টিয়ার গড়াই। এটি পদ্মার প্রধান শাখা নদী। কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনা হয়ে বিভিন্ন নামে এই নদী সুন্দরবনে গিয়ে সমুদ্রে মিশেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, পরিকল্পিত খননে এবার নদীতে পানি প্রবাহ বেশি আছে। আর এ কারণে সুন্দরবনসহ সমুদ্র উপকূলে কমছে লবণাক্ততার মাত্রা। এ বছর শুষ্ক মৌসুমেও কুষ্টিয়া শহরের কাছে গড়াইয়ে কিছুটা পানিপ্রবাহ আছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম জহুরুল হক জানান, নাব্যতা ধরে রাখতে টানা খনন চলছে গড়াইয়ে। সাতটি ড্রেজার দিয়ে উৎস মুখ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া থেকে ২০ কিলোমিটার খনন হবে কুমারখালী পর্যন্ত।
কুমারখালীর পরেই খোকসায় গিয়ে দেখা গেছে গড়াই একেবারে শুকিয়ে গেছে। কোনোমতে বইছে ক্ষীণ পানির ধারা। স্থানীয়রা বলেন, ‘মানুষ বাঁশের চরাট ফেলে তার ওপর দিয়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছে। পুরো নদী প্রস্থে প্রায় এক কিলোমিটার ধু ধু বালুচর জমেছে।’ কুমারখালী শহরের পাশে সেতু নির্মিত হচ্ছে বালু চরে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তাজমীর হোসেনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মূল নদী পদ্মায় পানি কমে যাওয়ায় শাখা নদী গড়াইয়েও পানি কমেছে। তবে ১ এপ্রিল থেকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পেলে অবস্থার উন্নতি হবে।’
পদ্মা নদীতে পানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের দুটি পাম্প মেশিনই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে পাম্প দুটির পানি সরবরাহ শূন্যে নিয়ে আসা হয় বলে জানান পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।পাম্প বন্ধ রাখায় চরম সংকটে পড়েছেন কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার কৃষকেরা। অনেকেই শ্যালো পাম্প দিয়ে ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে সেচ দিচ্ছেন।
কুমারখালী উপজেলার পাহাড়পুরের কৃষক মো. দেলোয়ার বলেন, ‘এখন পাম্প বন্ধ করে দেয়া তো গাছে তুলে মই টান দেয়ার মতো। আমাদের এই পেঁয়াজ এবং ভুট্টার এখন কী হবে! এ ছাড়া সামনে পাট এবং আউশ ধানের বীজতলা তৈরি করতে হবে।’
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শ্যামল কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জিকের সেচসুবিধা বন্ধ থাকলে কৃষকের অনেক ক্ষতি হবে। বোরো চাষে এই সময়ে সেচ দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেচ না দিলে ফলনে প্রভাব পড়বে।’
জিকে প্রকল্পের আওতায় বোরো মৌসুমে এবার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলায় ১৯৪ কিলোমিটার প্রধান খালের মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হেকিম বলেন, ‘নদীতে পানি বাড়লেই আবার কৃষকদের সেচ সুবিধা দেয়া যাবে। ১ এপ্রিল আবার পাম্প চালু হতে পারে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ