শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

দেশে রাজনীতির পথ একেবারেই সংকুচিত!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দেশে রাজনীতির পথ একেবারেই সংকুচিত হতে চলেছে। এমন অভিযোগ রাজনীতিবিদসহ বিশিষ্টজনদের। তারা বলছেন, সভা-সমাবেশ করা মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার হলেও ভোটবিহীন সরকার তাদের অনৈতিক এবং ফ্যাসিবাদী শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে সভা-সমাবেশে হামলা, মামলা, গ্রেফতারসহ দমন, নিপীড়ন চালিয়ে রাজনীতির পথকে সংকুচিত করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের অব্যাহত হত্যাযজ্ঞ ন্যাক্কারজনক হামলা, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে বিএনপি-হেফাজতসহ বিভিন্ন সংগঠনের দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ গাজীপুর দেশের বিভিন্ন  অঞ্চলে কর্মসূচিতে পুলিশ গুলী, টিয়াসেল ও ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। পাশাপাশি সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও ন্যাক্কারজনকভাবে তান্ডব চালায়। এতে হতাহতের সংখ্যা অসংখ্য। এসব ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সারাদেশে বিএনপিসহ আন্দোলনরতদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা করা হচ্ছে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।  
বিরোধী রাজনীতিক দলগুলো অভিযোগ করছে,  ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগের রাতে ভোটের মাধ্যমে নির্লজ্জভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী আওয়ামী সরকার এখন আরও বেপরোয়াভাবে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ শাসন করছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদেরকে রাজনীতির অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিতে তাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ণ যেন বর্তমান আওয়ামী সরকারের দৈনন্দিন কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। দেশকে বিরোধী দলশুন্য করতে বিএনপির যেকোন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা, গুলীবর্ষণ ও নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, হেফাজতসহ সরকার বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গ্রেফতার বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক অপকর্মেরই অংশ বলেই অভিযোগ করছেন তারা। সভা-সমাবেশ করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের কর্মসূচি পন্ড করতে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, তাদের ওপর হামলা, নির্যাতন-নিপীড়ণ এবং গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজী ও দখলবাজীকে সরকারি নীতিতে পরিণত করেছে। বিএনপি বলছে, সরকার দেশ শাসনে নজীরবিহীন ব্যর্থতা ঢাকতেই তিাদের নেতাকর্মীদেরকে কারাগারে আটকে রাখতে সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব মাস্টারপ্ল্যানের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা।
টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তারের পরে অভিজাত রাজনৈতিক বয়ানসর্বস্ব রাজনীতিতে গিয়ে সরকার শুধু বিরোধী দমনই করেনি, শুধু তরুণদেরই ক্ষুব্ধ করেনি বরং খোদ আওয়ামী লীগই পড়ে গেছে বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ায়। নেতারা উপলব্ধি করছেন যে আজকে ‘আমলারা মাঠে খেলছেন, রাজনৈতিক নেতারা দর্শকের আসনে খেলা দেখছেন মাত্র!’ গণতন্ত্র নির্বাসনের সাক্ষাৎ প্রতিফলন এ আমলাতন্ত্র নির্ভরতা। জবাবদিহি ও যোগ্যতাহীনতার কালে আমলাতন্ত্রই সরকারের প্রধান ভরসা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা তাই পাল্টা ভয়ের বহিঃপ্রকাশ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ তার একটি লিখায় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার কর্মকান্ড তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় রাখা দরকার, ভোটের মাঠ সব সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। এ দেশের সাধারণ মানুষ আট শতক থেকে গণতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখেছে। সুযোগ পেলেই তারা গণতান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করবে। ২০০১-এর নির্বাচনের কথা আওয়ামী লীগের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। সেবার অকল্পনীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এ বিশাল দলটির ভূমিধস পরাজয় ঘটেছিল। বিপুল আসন পেয়ে বিএনপি জয় লাভ করেছিল। কিন্তু প্রাপ্ত ভোটের বিচারে আওয়ামী লীগ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল। এরপরও শিক্ষা হয়নি। ক্ষমতায় পৌঁছার মোহ থাকলে শিক্ষা হয়ও না। তাই আমার মনে হয়, আওয়ামী লীগের ভেতর সংস্কার আনা প্রয়োজন। যে শোর উঠেছে চারদিকে, তাতে আমরা মনে করি এটিই যথার্থ সময়। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী বড় দলে জনআস্থায় থাকা অনেক রাজনীতিক আছেন। তাদের হয়তো সন্ত্রাস করার তেমন সামর্থ্য নেই, ক্যাডার বাহিনী নেই, অবৈধ অর্থ নেই। কিন্তু মানুষের আস্থার জায়গায় আছেন তারা। কঠিন দলতন্ত্র থেকে একটু যদি চোখ সরাতে পারেন দলীয় হর্তাকর্তারা, তাহলে দেখবেন দেশের জন্য এক বুক ভালোবাসা থাকা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করা, শিক্ষিত মেধাবী অনেক মানুষ আছেন- যারা রাজনীতির মাঠে সুপরিচিত না হলেও রাজনৈতিক দর্শনে প্রজ্ঞাবান। দূরদৃষ্টি নিয়ে তাদের কাছে টেনে নিতে হবে মাত্র। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই ভালো। রাজনীতির নীতিতে সংস্কার করতে পারলে শুভ ছায়ায় এ শূন্যতা পূরণ করা কঠিন নয়। তেমন হলে রূপান্তরিত আওয়ামী লীগ তার ঐতিহ্যকেই খুঁজে পাবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কর্তৃত্ববাদী এই শাসনে দেশে গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতাসহ স্বাধীন মত প্রকাশের পথ সংকুচিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনঅধিকার সংকুচিত করে দুঃশাসন এবং কর্তত্ববাদী শাসন কায়েম করছে। গোটা দেশকে আওয়ামী লীগ সরকার অস্থিতিশীল করে তুলছে। বিশেষ করে মহান স্বাধীনতা দিবস থেকে শুরু করে গত কয়েকদিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়ীয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ যুবলীগের গুলী, তান্ডবের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গুলী করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। জনগণের এই প্রতিবাদ বিক্ষোভে দিশেহারা হয়ে মানুষ হত্যার মতো হঠকারী সিন্ধান্ত নিয়ে সরকার পুরো দেশকে অশান্ত ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এরকম পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে গুলী করার নির্দেশ দিয়ে এবং ক্ষমতাসীন দলের মাস্তানদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে সরকার। কিন্তু এদেশের সাহসী জনতা অতীতেও যেমন সকল স্বৈরাচারকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে, বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারকেও তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাস্তায় নেমে এসেছে। জনগণের আন্দোলনের গণজোয়ারে অবৈধ সরকারের মসনদ অতলে তলিয়ে যাবে।
 জেএসডি সভাপতি আ স ম রব বলেন, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতে নৈতিক এবং মানবিক প্রজাতন্ত্র নির্মাণ করাই ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। কিন্তু বর্তমানে বাক, ব্যাক্তি ও গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসছে। ভোট চুরি করা, দুর্নীতি ও অপচয় শাসকদের অধিকারে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার কারণে রাজনীতি বিবর্জিত একটা বর্বর সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে। বাংলাদেশ আজ দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। উপনিবেশিক ঘুণে ধরা শাসন ব্যবস্থা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে।  এখনই সময় অমানবিক ও অনৈতিক এ শাসন ব্যবস্থা উচ্ছেদ করা।
সূত্র মতে, করোনার কারণে দীর্ঘ প্রায় একবছর রাজপথের কর্মসূচিতে নেই দেশের বিরোধী রাজনীতিক দলগুলো। যদিও বেশ কয়েকবছর ধরেই বিরোধী সভা সমাবেশসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে এক ধরণের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সভা সমাবেশে করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি নেয়া এখন বাধ্যতামূলক। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় নিবাচনে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, হামলা-মামলা, দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখাসহ নানা ইস্যুতে কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। কিন্তু কর্মসূচির শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের বাধার মুখে পড়েছে তারা। দেয়া হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। যেখানেই বিএনপি সমাবেশ বা বিক্ষোভ করছে সেখানেই বাধাসহ হামলার শিকার হতে হচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। সুবর্ণজয়ন্তী কর্মসূচিও পালন করতে পারেনি দলটি। ফলে পূর্বঘোষিত বেশ কিছু কর্মসূচি বাতিলও করেছে তারা। গত ২৬ মার্চ মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে হামলা, গুলি ও টিয়ারসেল নিক্ষেপের প্রতিবাদে দুই দিনের কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। গত সোম ও মঙ্গলবার এই কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু দেশের কোথঅও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে দলটিকে দেয়া হয়নি। বিএনপির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দলের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে তান্ডব চালিয়ে উল্টো বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা দিয়ে গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি তাতে রাজনীতির মাঠ স্বাভাবিকভাবেই আর মসৃণ থাকছে না। সরকারের জিরো টলারেন্সের কারণে দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক মাঠ আবার উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নানা ইস্যুতে দেশে চরম সঙ্কটের তৈরি হয়েছে। অধিকার আদায়ে মানুষ যে কোনো সময় রাজপথে নামতে পারে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ময়দান যে কোনো সময় সরগরম হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ