বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

গণমাধ্যমের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা : স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশক

সরদার আবদুর রহমান : একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ হলেও ভূখণ্ডের পৃথক অস্তিত্ব লাভ হয় একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। একই বছর ১৬ ডিসেম্বর ছিল সেই স্বাধীন অস্তিত্ব লাভের দিন। অতঃপর অভিযাত্রা শুরু স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের নিজস্ব শাসনব্যবস্থারও।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনগণের যে ম্যান্ডেট-তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার, বাক ও ব্যক্তির স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রভৃতি। এর মধ্যে আমাদের আলোচ্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর থেকেই সংকুচিত হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তা একেবারেই বিপন্ন দশায় পতিত হয়। এখানে সেই পরিস্থতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়ে থাকে। একটি ঘরকে তার অবস্থানে টিকে থাকতে হলে অন্তত চারটি স্তম্ভ অপরিহার্য। এর কোন একটি বিপন্ন হলে পুরো ঘরটিই বিপন্ন হয়ে পড়বে। সেই বিবেচনা থেকেই গণমাধ্যমকে একটি রাষ্ট্রের  গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভের মর্যাদা দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। সেদিক থেকে বলতে গেলে রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে ধারণ করে আছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এমনকি, দেশে যখন সংসদ কার্যকর থাকে না তখন এই গণমাধ্যমই বিকল্প পার্লামেন্টের কাজ করে থাকে বলে মনে করা হয়।
রাষ্ট্রের গণমানুষের অধিকার রক্ষা, দেশ-জনগণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা, সংবিধান ও আইনের মর্যাদা সমুন্নত রাখা, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত-দুর্গম এলাকাসহ প্রতিটি জনপদের সংকট-সমস্যার চিত্র তুলে ধরা, উন্নয়ন-অগ্রগতির পরিস্থিতি বর্ণনা করা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয়, অসঙ্গতি ও সমন্বয়হীনতার বিবরণ উপস্থাপন করা-ইত্যাকার দায়িত্ব পালন করে গণমাধ্যম। এতে দেখা যায়, রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে প্রাণ-প্রবাহই বলুন অথবা দেশের শরীরে রক্তপ্রবাহ-তার নিত্যসঞ্চালনের গতি স্বাভাবিক রাখার অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নিয়ত পালন করার কথা এই গণমাধ্যম এবং তার কর্মীদের। যে কোন জলধারার প্রবাহ বন্ধ কিংবা স্তিমিত হয়ে গেলে যেমন তা বদ্ধতা ও হেঁজে যাওয়ার অবস্থা দেখা দেয়, তা থেকে দুর্গন্ধ উৎপন্ন হয়, পচন ধরে এবং এক পর্যায়ে তা জনপদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়ে-তেমনি সংবাদপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র-সমাজের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি দেখা দিতে পারে। ফলে একে স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে সকলেরই ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মগজ ও হাত সক্রিয় রাখার জন্য কিছু কর্মকাণ্ড থাকতে হবে- একথাও স্বীকার্য।
সাংবাদিকতার দুঃসময় : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কোনো আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংসদে আনা হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের স¤পূর্ণ পরিপন্থী উক্ত সংশোধনীর ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশালের জগদ্দল পাথর। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছর ১৬ জুন আওয়ামী লীগ থেকে উত্তরণ ঘটা বিতর্কিত বাকশাল সরকার প্রণয়ন করে ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’। আসলে সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা নয়, এমনকি কেবল নিয়ন্ত্রণও নয়, ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিধন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এই কলঙ্কজনক আইন প্রবর্তন করা হয়। এর মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী খবর ‘সেন্সর’-এর লিখিত-অলিখিত অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করে। সে সময় সর্বত্র অতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করতে গিয়ে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করা হয় যেখানে সংবাদপত্রে অনেক কিছুই লেখা যেতো না। প্রণীত বিধি-বিধানের যাঁতাকলে পড়ে ‘সংবাদ’ তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলতো। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঐ ঘোরকৃষ্ণ অধ্যায়ে সরকারের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে প্রায় ৮ হাজার সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হয়। বেকার অবস্থায় দীর্ঘ দিন সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয় বহু সাংবাদিককে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন। ‘কালো’ জুনের পর সারাদেশে চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে শুধুমাত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে মাত্র চারটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এগুলো হলো- দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস। যে ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগকে সমর্থনের জন্য সেই ইত্তেফাকের প্রায় দুই যুগের ইতিহাস মুছে ফেলে বাকশাল সরকারের নির্দেশে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখতে হয় ‘১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা’। পরে অবশ্য ইত্তেফাক ২৪ আগস্ট পূর্বের সিরিয়ালে ফিরে যায় ৬৮ দিনের এপিসোডের পর এবং দৈনিক বাংলা তার পূর্ব সিরিয়ালে ফিরে যায় ১৯৭৫ সালের ৬ নবেম্বর।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। গণতন্ত্রে মানুষের নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। মানুষের স্বাধীনতার মূল শর্ত হচ্ছে বাক, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষমতাসীনরা স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল-স্পিরিট থেকে বিচ্যুত হয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলাকে বন্ধ করে দিয়ে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ ছিল মূলত বিবেকের বন্দিত্ব।
সংবাদপত্রের কালো দিবস : সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ১৬ জুন বাকশাল সরকার ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’-এর সাহায্যে সরকারি প্রচারপত্র হিসেবে চারটি পত্রিকা সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেখে বাকি সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে প্রায় ৮ হাজার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হন। বেকার অবস্থায় দীর্ঘদিন সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে বহু সাংবাদিককে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। ‘কালো’ জুনের পর সারাদেশে চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে শুধু সরকারের নিয়ন্ত্রণে মাত্র চারটি পত্রিকা বের হতো। এগুলো হলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস। এ কারণে ১৯৭৮ সালে অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) বার্ষিক কাউন্সিলে গৃহীত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দিনটিকে ‘কালো দিবস’ ঘোষণা করা হয়।
গণমাধ্যমের প্রতি এই বিরূপ আচরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ১৬ জুনের আগেও অর্থাৎ ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে অনেক দৈনিক-সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। গণশক্তি, হক কথা, লাল পতাকা, মুখপত্র, বাংলার মুখ, স্পোকসম্যান প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। বেশ কয়েকটির সম্পাদকও গ্রেফতার হন। এর মধ্যে গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদ ছিলেন অন্যতম। বাহাত্তর সালেই অন্তত ১০টি পত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত এবং একটি পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হয়। সাপ্তাহিক হক কথার প্রকাশক ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্সের ২৬ ধারা অনুসারে হক কথার প্রকাশনা বাতিল করা হয়। পত্রিকাটির ছাপাখানা শান্তি প্রেসকে ওই অধ্যাদেশের ২৩ (ক) ধারায় বই, সংবাদপত্র না ছাপানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এর আগেই টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত হক কথার সম্পাদক ইরফানুল বারীকে ১৯৭২ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার করা হয়। এর পর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭২ সালে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লেখা খোলা চিঠিতে আক্ষেপ করে লেখেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে পত্রিকা প্রকাশের সাধারণ অধিকারটুকুও না থাকলে আমি এ দেশে থাকতে চাই না। হয় পত্রিকা প্রকাশনার অনুমতি দানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দাও, নয়তো আমাকে এ দেশ থেকে বহিষ্কার করো।’
পরিবর্তনের সূচনা : অতঃপর পরিবর্তন এলো। আর তা এলো ঐতিহাসিক ৭ নবেম্বরের হাত ধরে। জাতি বহুকাক্সিক্ষত একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমের যে বিপন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয় জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এক নবতর অধ্যায় শুরু করেন। সংবিধানের ঐতিহাসিক সংশোধনীর মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ প্রসারের পথ সুগম হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও এর অবাধ প্রসারে গৃহীত নীতির কার্যকারিতা অচিরেই বাস্তব রূপ লাভ করে। এসময় বিলুপ্ত সব গণমাধ্যমকে পুনরুজ্জীবিত করে তাদের হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এখানে এসব প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো।
সংবাদপত্রের বিকাশ : চতুর্থ সংশোধনীকালে দেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল ৩৫৫টি। কিন্তু বিধি জারি করে এর সংখ্যা ৪টিতে সীমিত করা হয়। এর ধকল ও জের চলে ১৯৭৭ পর্যন্ত। এই সংশোধনী বাতিল হওয়ার মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের বিকাশের পথ খুলে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সংবাদপত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৩টি। (চলবে)
 ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে তা ৪২৮টিতে উন্নীত হয়। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে এই সংখ্যা ছিল ৫১২টি। (সূত্র: সংবাদ বিষয়ক আইন: গাজী শামছুর রহমান)।
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট : ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট জিয়াউর রহমান সরকারের একটি রেজিউলুশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। পিআইবি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনা নিয়ে কাজ করা একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত- যা সাংবাদিকদের নিয়মিতভাবে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান ও গণমাধ্যম সংক্রান্ত প্রকাশনা প্রকাশ করে থাকে।
প্রেস ইনস্টিটিউটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো হলো:
কর্মরত সাংবাদিক এবং সরকার অথবা যে কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে কর্মরত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রদান করা; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমধর্মী প্রতিষ্ঠানের সাথে সাংবাদিকতা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ এবং এই সম্পর্কিত উপাত্ত ও তথ্য প্রকাশ করা; যে কোন সংবাদপত্র বা বার্তা সংস্থায় উপদেশক ও পরামর্শক সেবা প্রদান করা; এই অনুচ্ছেদে উল্লেখিত কার্যক্রমের সমধর্মী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ের সংস্থাসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা; সংবাদপত্র সংক্রান্ত কোন বিষয়ে সরকার মতামত চাইলে সেই বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদান করা; বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যক্রম ও উদ্যোগ গ্রহণ করা; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (এক শিক্ষাবর্ষ মেয়াদি) পরিচালনা করা প্রভৃতি।
প্রেস কাউন্সিল : সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মান বজায় রাখার ও সংশোধন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও সুরক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রেস কাউন্সিল আইনের অধীন বাংলাদেশের সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ও বাক স্বাধীনতা রক্ষা করে। এর সদর দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। জিয়াউর রহমানের সরকার কর্তৃক ১৯৭৯ সালের ১৮ আগস্ট এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ আইন কমিশন সুপারিশ করে যে, প্রেস কাউন্সিলকে সাময়িকভাবে কোন সংবাদপত্র বন্ধ করার ক্ষমতা দেয়া হবে। এই কাউন্সিলের পরিচালনা কমিটিতে একজন চেয়ারম্যান ও ১৪ জন সদস্য রাখা হয়। ১৯৮০ সালের অক্টোবর থেকে এই সংস্থা তার কার্যক্রম শুরু করে। প্রেস কাউন্সিল হলো বাংলাদেশের একটি আধা-বিচারবিভাগীয় সংস্থা।
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট : ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং একাডেমি হিসেবে ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমান সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়। এটি প্রশিক্ষণার্থীদের গণমাধ্যম সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি গণমাধ্যম নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এরশাদ সরকারের সময়ে সামরিক আইন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং একাডেমির নাম পরিবর্তন করে ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট’ রাখা হয়।
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তর
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সৃষ্ট প্রকাশনা বিভাগ ও চলচ্চিত্র বিভাগকে একীভূত করে জিয়াউর রহমান সরকারের সিদ্ধান্তে ১৯৭৬ সালের ২১ জুন ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তর’ (ডিএফপি) গঠন করা হয়। দপ্তরটি পরবর্তীতে অধিদপ্তর হিসেবে উন্নীত করা হয়।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ
১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে জিয়া সরকারের উদ্যোগে ‘ফিল্ম ইন্সটিটিউট এন্ড আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠানটি ব্রাসেলসে অবস্থিত ফিল্ম আর্কাইভসমূহের আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ’-এর সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ’ করা হয় ও এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
রঙীন বিটিভি
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বাংলাদেশের সরকারি টেলিভিশন সংস্থা। এটি ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ হতে সাদা-কালো সম্প্রচার শুরু করে। জিয়ার আমলে ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এটি রঙিন সম্প্রচার শুরু করে। এর প্রধান সম্প্রচার কেন্দ্র ঢাকা শহরের রামপুরা এলাকায় অবস্থিত। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে বিটিভি বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারের জন্য বিটিভি ওয়ার্ল্ড নামে উপগ্রহভিত্তিক চ্যানেল স্থাপন করে।
জাতীয় প্রেস ক্লাব
পাকিস্তান আমলে জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর নিজস্ব জায়গা ও ভবন বরাদ্দ হয় ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর। জিয়াউর রহমানের সরকার রাজধানীর তোপখানা রোডের বর্তমান জায়গাটি নিজস্ব জায়গা হিসেবে বরাদ্দ দেয় এবং নতুন ভবন নির্মাণ করে দেয়। ১৯৭৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর সরকার জাতীয় প্রেসক্লাবের অনুকূলে ১.১২ একরের এই জায়গাটির মূল্য বাবদ ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা মঞ্জুর করে। এই টাকা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এজেডএম এনায়েতুল্লাহ খানের কাছে সরকারিভাবে হস্তান্তর করা হয়। (সূত্র: দৈনিক বার্তা, ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭)। ১৯৭৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং এর সমুদয় ব্যয়ভার সরকার বহন করে।  ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সাংবাদিকরা বিষয়টি তাঁর নজরে আনলে তিনি প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে আসেন। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান জায়গা (১.১২ একর) ৩০ বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেন। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে শিয়া ইসমাইলি মুসলমানদের ৪৯তম ইমাম এবং আগা খান উন্নয়ন নেটওয়ার্কের (একেডিএন) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রিন্স করিম আগা খান বাংলাদেশে আসেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রেসক্লাবের ভবন নির্মাণে অর্থ সাহায্যের ঘোষণা দেন । কিন্তু সে কথা জানতে পেরে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে ডেকে নিয়ে জানিয়ে দেন, প্রেস ক্লাব জাতীয় প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের টাকায় এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মিত হবে, বিদেশীদের টাকায় নয়। ফলে প্রিন্স আগা খানের টাকা আর নেয়া হয়নি। ১৯৭৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্লাবের এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তুরও স্থাপন করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রেস ক্লাবকে দেয়া হয় ২৫ লাখ টাকা। তখন প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের তৎকালীন সম্পাদক এবং পরে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। দুটি অডিটোরিয়াম, ভিআইপি লাউঞ্জ, ক্যান্টিন, টিভি কক্ষ, অতিথিশালা, কম্পিউটার সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার- সব মিলে জাতীয় প্রেসক্লাব আজ একটি পরিপূর্ণ উন্নতমানের প্রতিষ্ঠান।
দৈনিক বার্তা
১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ উপলক্ষে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহীতে অবস্থানকালে স্থানীয় সাংবাদিক ও কিছু সচেতন ব্যক্তি এখানে পত্রিকা প্রকাশের চেষ্টা চালানোর অনুরোধ করেন। ভাসানী তাঁদের দাবির প্রেক্ষিতে সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (পরে প্রেসিডেন্ট) জিয়াউর রহমান দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ও পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এর ফলশ্রুতি দৈনিক বার্তা। বার্তা প্রকাশের জন্য হেলাল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিসিং কোম্পানির ব্যবহৃত রোটারি মেশিন, ব্লক নির্মাণের ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি রাজশাহীতে আনা হয়। বর্তমানে এর অফিস নগরীর আলুপট্টির নিজস্ব কমপ্লেক্স ভবনে অবস্থিত। একটি ট্রাস্টি বোর্ড এর ব্যবস্থাপনা করে থাকে। ১৯৭৬ সালের ১৫ অক্টোবর  রাজশাহী শহরের আলুপট্টিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের তথ্য ও বেতার দফতরের ভারপ্রাপ্ত সদস্য আকবর কবীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একই মন্ত্রণালয়ের সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফা।
চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড
১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার ‘সেন্সরশিপ অব ফিল্ম রুলস’ অনুসারে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড গঠন করেন। প্রতিষ্ঠানটি উক্ত নীতিমালার ১৩নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধি অনুসারে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা আইন-শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ধর্মীয় অনুভূতি, অনৈতিক বা অশ্লীলতা, বীভৎসতা, অপরাধ, নকল প্রভৃতি দিক বিবেচনা করে একটি চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র প্রদান করে থাকে। সরকার কর্তৃক চলচ্চিত্র বাছাইয়ের জন্য সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের লোকদের নিয়ে একটি বোর্ড গঠিত হয় যারা চলচ্চিত্র ছাড়পত্র দিয়ে থাকে।
একথা গভীরভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অবিভাজ্য সত্তা। সেই ভাবনা থেকেই ছিয়াত্তর-পরবর্তী সরকার গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপনে উদ্যোগী হতে সমর্থ হয়। ইতিহাস সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ