বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম রব ও কর্নেল অলির ভাষ্য

আসিফ আরসালান : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে গত বেশ কিছুদিন ধরেই অনেক লেখালেখি হচ্ছে। ২৬ মার্চ অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। ২৬ মার্চের আগে থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় স্বাধীনতার পূর্বাপর নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যেহেতু স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত তাই ঐসব আলোচনার সবটাই যে নির্মোহ হয়েছে এমন কথা বলা যাবে না। এই যে পক্ষাবলম্বনের ব্যাপার এটা কিন্তু খোদ স্বাধীনতাকে নিয়ে নয়। এটা হলো স্বাধীনতা অর্জনে ব্যক্তি বা দল, কার অবদান বেশি, কার অবলম্বন কম, এসব নিয়ে। কে কাকে আন্ডারমাইন করছে, কে কার ভূমিকাকে মাত্রাতিরিক্তভাবে হাইলাইট করছে, এইসব নিয়ে। সমগ্র মার্চ মাস জুড়েই আমি এসব লেখা ফলো করে আসছি। গত পরশুদিন শুক্রবার, অর্থাৎ ২৬ মার্চ যেসব পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে, সেগুলোতে প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়েও কিছুটা নাড়াচাড়া করেছি। বিগত ৫০ বছর ধরে ইতিহাস এবং ঘটনাবলী সেভাবেই বর্ণিত হয়ে আসছে। এসব পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করতে এসে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত দুটি নিবন্ধে এসে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। একটি নিবন্ধের শিরোনাম হলো, ‘দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল আজকের বাংলাদেশ’। লেখক বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি আ স ম আব্দুর রব। অপরটির লেখক হলেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব) অলি আহমদ। তার নিবন্ধের শিরোনাম, ‘আমরা বিদ্রোহ করি’। দুইজনই বীর মুক্তিযোদ্ধা। কর্নেল অলি একজন বীর বিক্রম। যেহেতু তাঁরা দু’জনই সম্মুখ সারির মুক্তিযোদ্ধা তাই তাদের লেখা ইন্টারেস্ট নিয়েই পড়লাম। তাঁদের রচনায় বিধৃত যে অংশ তাৎক্ষণিকভাবে আমার নজরে এসেছে সেগুলো আমি পাঠকবৃন্দের অবগতির জন্য নীচে তুলে ধরছি।
কর্নেল অলি আহমদ তাঁর লেখার এক স্থানে বলেছেন, “২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমি সর্বপ্রথম অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি। সে সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন কর্নেল আবদুর রশিদ জানজুয়া এবং সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহের শুরুতেই কর্নেল জানজুয়াসহ মেজর আবদুল হামিদ, ক্যাপ্টেন আহমদ আলী, লেফটেন্যান্ট আজম, বিডিআর অফিসার ক্যাপ্টেন নজর নিহত হন। এ বিদ্রোহ ক্ষণিকের কোনো উত্তেজনা ছিল না, ছিল পরিকল্পিত এবং এভাবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।”
কর্নেল অলির অনেক তথ্য পাওয়া যায়, যার একটি তথ্য ওপরে উদ্ধৃত করলাম। তিনি আরো কিছু তথ্য দিয়েছেন যা অতীতে শোনা যায়নি। তিনি অতঃপর বলেন, “৭০-এর নির্বাচনের ফলাফলের পরই আমাদের মনে হয়েছে, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা ছাড়বে না। তাই আমরা নির্বাচিত নেতার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। কারণ, তারা মনে করছে, আপনি যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে পাকিস্তানি জেনারেলরা হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া সত্তরের ওই নির্বাচনের পরই দেখছি নতুন নতুন পাকিস্তানি রেজিমেন্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসছে। ’৭১ সালে আমরা বাঙালি অফিসার, যারা সামরিক বাহিনীতে ছিলাম তারা নিশ্চিত ছিলাম যে, পাকিস্তানিদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই তারা ক্র্যাকডাউন করবে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসেই আমরা বিদ্রোহের পরিকল্পনার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিলাম।”
এরপর কর্নেল অলি বলেন, “কিন্তু এসব শুনে তিনি বললেন, না, তোমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আমার নাই”।
কর্নেল অলি আরো বলেন, “ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমরা অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের  সৈনিকরা বিদ্রোহ করি। বিদ্রোহ পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলাম আমরা, সিলেটের গোলাপগঞ্জের রণকেলি গ্রামের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুজিবুর রহমান চৌধুরী, জিয়াউর রহমান ও আমি। ২৫ মার্চ ঢাকায় যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আমাদের বিদ্রোহের প্রথম লগ্নেই রেজিমেন্ট অধিনায়ক জানজুয়া নিহত হন। এরপর ব্যারাকে ফিরে মেজর জিয়া আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এ সময় আমি তার সঙ্গেই ছিলাম। প্রথমেই আমরা চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করি, সেখান থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।”
॥ দুই ॥
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সরকারি এবং বিরোধী দল থেকে স্বাধীনতার এই মাসে অনেক কথাই বলা হচ্ছে। অনেক নতুন তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তারমধ্যে একটি হলো এই যে ২৫ ও ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান আর্মির অফিসার হিসাবে সহস্তে অনেক বাঙ্গালীকে গুলি করে হত্যা করেছেন। কিন্তু কর্নেল অলির যে বক্তব্য একটু আগে দেওয়া হলো, সেই বক্তব্য সরকারি বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। দীর্ঘদিন থেকে দেশের মানুষ জেনে আসছেন যে কর্নেল অলি কর্মক্ষেত্রে জিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ট জন। চট্টগ্রাম ব্যারাকে জিয়াই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর নেতৃত্বেই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করা হয়। তিনিই সেই বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর নির্দেশে অথবা তিনি নিজে পাকিস্তানের কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করেন।
মনে রাখতে হবে, আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে। ৫০ বছর একটি জাতির জীবনে কম নয়। ৫০ বছরেও স্বাধীনতা অর্জনে কার কি অবদান সেটি সঠিকভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।
॥ তিন ॥
এবার আসছি আ স ম আব্দুর রবের নিবন্ধে। রব বলেছেন, আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের পর শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাঁর কারামুক্তির পর “বাঙ্গালি জাতির তরফ থেকে বিশাল জনসমুদ্রে সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনায় কিংবদন্তি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।” শেখ মুজিবুর রহমানকে তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন সে ব্যাপারে প্রশ্নের কোনো অবকাশ নাই। রেসকোর্সের যে বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয় সেই জনসভায় আমি, অর্থাৎ এই কলামের লেখক উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু তোফায়েল আহমদ যে এই খেতাবটি সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনায় দিয়েছিলেন সেটি এবারই এই প্রথম এই নিবন্ধের মাধ্যমে জানা গেল। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে জনাব রব ভুল বলেছেন। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে এটি একটি বিরাট, ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী ঘটনা। বাংলাদেশে আজ বঙ্গবন্ধুকে শেখ মুজিব বলে লেখা হয় না, হয় বঙ্গবন্ধু বলে। এতবড় একটি খেতাব বা সম্মান দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন যে ব্যক্তিটি সেই সিরাজুল আলম খান Unsung রয়ে গেলেন। সে জন্যই বলছি যে যদি আব্দুর রবের বক্তব্য সঠিক হয় তাহলে এ ব্যাপারে সিরাজুল আলম খানের যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু তাকে দেওয়া উচিত।
॥ চার ॥
ঐ নিবন্ধে আ স ম আব্দুর রব বলেন, “অসহযোগ আন্দোলন এবং পরবর্তীতে সশস্ত্র সংগ্রামের ফসল হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ। আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলনে প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে নেপথ্যে বিরাট এক ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে বেষ্টন করে আছে। লাগাতার ও নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৬২ সালে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা ‘নিউক্লিয়াসের’ জন্ম হয়েছিল সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে।” নিবন্ধে আ স ম আব্দুর রব আরো বলেন, “৭০ এর ১লা মার্চ দিবাগত রাতে নিউক্লিয়াসের নির্দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২রা মার্চ ছাত্র সমাবেশে স্বাধীনতাউন্মুখ জনতার পক্ষে নিউক্লিয়াসের পরিকল্পনায় আমি স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করলাম। পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক ক্ষণে অংশীদার হয়েছেন নূরে আলম সিদ্দকী, শাহ্জাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যান্য ছাত্র নেতৃবৃন্দ।”
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আ স ম আব্দুর রব তাঁর ঐ নিবন্ধে বলেন, “উদ্দীপ্ত জনসমুদ্রে জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশনা সম্বলিত সুদূরপ্রসারী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু প্রেরণাদায়ী ভাষণ দান করেন। কোনো সুচিন্তিত পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া উপনিবেশ থেকে একটি জাতিকে স্বাধীন করার জন্য কখনো সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশ দেয়া যায় না।”
এই নিউক্লিয়াস নিয়ে রয়েছে প্রবল বিতর্ক। ছাত্রলীগের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “নিউক্লিয়াসের নামগন্ধ আমার জানা ছিল না”। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১ জুলাই ২০১৯)। নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন আমীর হোসেন আমু এবং তোফায়েল আহমদ। সিরাজুল আলম খান একটি বই লিখেছেন। নাম, ‘আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’। এই পুস্তকের ছত্রে ছত্রে রয়েছে নিউক্লিয়াসের কর্মকাণ্ড এবং এর সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কথা। এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এই রকম ৩/৪ টি কলামের প্রয়োজন। সময় সুযোগ হলে তখন এই আলোচনার ইচ্ছা রইলো।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ