শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

রক্তে কেনা আমাদের স্বাধীনতা 

এহসান বিন মুজাহির: পরিক্রমায় ঘুরে আবার আমাদের মাঝে এলো মহান স্বাধীনতার মাস। এই মাসটা এলেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা, কত বীরত্ব ও অসামান্য আত্মত্যাগের কথা। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে জয় লাভের এই মাসটিকে আমরা বড় আবেগের, আনন্দ ও বেদনা নিয়ে উদযাপন করি। ছাব্বিশ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। উনিশ‘শ একাত্তর সালের এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে অজুুত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদতবরণ করেছেন। ইজ্জত লুন্ঠন হয়েছে অসংখ্য মা-বোনের। সারাজীবনের জন্য পংঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অগণিত মুক্তিযোদ্ধা। সাগরসম রক্ত ও লাশের পাহাড় পেড়িয়ে এদেশে এসেছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা কারো দয়ার দান নয়। বহু রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের স্বাধীনতা। একাত্তরের ছাব্বিশ মার্চ আমরা পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। ফিরিয়ে এনেছি স্বাধীনতা। এদেশের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকা উড্ডিন করার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাঁরা হলেন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা। 

প্রতি বছরের এই দিনে একাত্তরের সেই স্মৃতিকে সামনে নিয়ে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হবে। কিন্তু যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা, সেই মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কতটুকু স্মরণ করা হচ্ছে? দেশের জন্য যারাএতো ত্যাগ স্বীকার করলেন এর বিনিময়ে তাদেরকে কি কিছু দিতে পেরেছি? মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশ এবং দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে নিজের প্রিয় জন্মভূমিকে বাঁচাতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানী শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে প্রমাণ করলেন, দেশ ও বাংলার জনগণকে জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। আর মুক্তিযোদ্ধারাই হলেন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ কবরের বাসিন্দা। যদিও তাঁরা আজ আমাদের মাঝে নেই এরপরও রয়েছেন স্মৃতির অ্যালবামে অমর। মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে যারা এখনও জীবিত আছেন তাদের অনেকেই পঙ্গুত্বতা নিয়ে দিনাতিপাত করছেন। অনেকেই শারীরিভাবে প্রতিবন্ধী এবং অসুস্থ হয়ে উন্নত চিকিৎসার অভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় হতাশার সুরে বলেন-আমাদের দেখার কেউ নেই। দেশের জন্য জীবন যৌবন ক্ষয় করলাম আজ কেউই আমাদের খবর রাখে না। এমনও অনেক মুক্তিযুদ্ধারা রয়েছেন যারা এখনও মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে কোন মর্যাদা পাননি রাষ্ট্রীয়ভাবে। আমরা কি পেরেছি তাদের রক্তের ইজ্জত দিতে? 

আফসোসের বিষয়, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন এমন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙিয়ে নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সব সুবিধা ভোগে তৎপর। সন্তানদের চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় তাদের উপস্থিতিও কম নয়! ঊনপঞ্চাশ বছর পরও যদি নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধি হতেই থাকেন তাহলে অগণিত দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা শহীদগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার সফলতা ও স্বার্থকতা কোথায়?  স্বাধীনতা প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। স্বাধীনতা মানে নয় কারো গোলামি করা। নয় পরাধীনতা।  দেশের স্বাধীন নাগরিকরা কতুটুকু স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পেরেছেন? স্বাধীনতা, গণতন্ত্র  যেন আজ  অধরা। স্বাধীনতার মর্ম কথা আমরা ভুলতে বসেছি। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন নাগরিকদের

সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের স্বাধীনতা। বিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসেও সা¤্রাজ্যবাদী ও কায়েমীবাদী স্বার্থপরের আচার-আচরণে জনগণের ভাগ্য আজ বিড়ম্বনার শিকার। মানবাধিকার আজ ভূলণ্ঠিত। গুম, হত্যা, দুর্নীতি, ইভটিজিং, চুরি-ডাকাতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, ব্যাংক লোপাট, ছিনতাই, শোষণ, জুলুম  থেমে নেই। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির তকমা আমাদের জাতির ভাগ্যে লিখন হয়ে ওঠছে বারবার। 

স্বাধীনতার চার যুগ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বনির্ভর হতে পারেনি। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড আজ শিল্প উন্নয়ন বিশ্বের উদাহরণ। অথচ, বাংলাদেশ পরনির্ভরশীল। দেশে দরিদ্র্যতা কমেনি, মাথাপিছু আয় বাড়েনি। গরিবের মাথা গোঁজাবার ঘর নেই। নৈতিক শিক্ষা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি খেয়ে ফেলেছে আমাদের বিবেক। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও এখনো আমরা সোনার বাংলা গড়তে পারিনি। গরিবদের ভাগ্যে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। দুঃখী, হতদরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারিনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে পারিনি। বেকারত্বের সংখ্য ক্রমাগত বেড়েই চলছে। তাদের কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা করতে পারিনি আজও। রাজনৈতিক রেষারেষির বিষাক্ত ছোবলে দেশের জনগণ উৎকন্ঠিত। আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন একটি দেশ। স্বাধীন দেশে প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, কলমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার অবাধ স্বাধীনতা, ইসলামী রাজনীতির স্বাধীনতা, ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের অবাধ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র চর্চার স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার কতটুকু সুফল ভোগ করতে পেরেছি আমরা? এজন্যই মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরকমান্ডার মেজর জলিল বলেছিলেন,‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’। 

স্বাধীনতার ৫০ বছর বছরে বাংলাদেশের অর্জন আশানুরূপ না হলেও দেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং আর্থসামাজিক অবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে, এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। দেশের জনগণের প্রত্যাশিত ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন না হওয়ার জন্য একদিকে যেমন জনসংখ্যার আধিক্য, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনাও কম দায়ী নয়। আমাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতার সাথে সাথে আমরা চাই আমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, কলমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার অবাধ স্বাধীনতা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ