শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

জনগণের স্বাধীনতায় জনগণই বিতারিত

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: বাংলাদেশে এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব চলছে। এই উৎসব যে কার জন্য এবং কোথায় হচ্ছে সেটা খুঁজে বের করা দায়। কেননা জনগণ এ ধরনের কোন উৎসবের আয়োজনও করতে পারছে না। যেসব জায়গায় উৎসবের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে পত্রিকায় সেসব জায়গায় যাওয়ার অধিকারও পাচ্ছে না। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে খুবিত আশা ছিলো যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনায় আনন্দ ফুর্তিতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উৎযাপন করবে কিন্তু সেটা তাদের ভাগ্যে ঘটেনি। পুলিশের তাড়া খেয়ে তারা দিকবিদিক ছুটাছুটি করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে সরকারকে শাপশাপান্ত করেছে । মানুষ রয়েছে দূরে।

আমরা কী দেখলাম। আমরা দেখলাম প্রতিবেশি দেশের পাঁচজন রাষ্ট্রপ্রতি-প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে দাওয়াত করে নিয়ে আসা হয়েছে। কি তাদের আসার উদ্দেশ্য সেটি স্পষ্ট নয়। এই সব ক্ষেত্রে যখন কোন উদ্দেশ্য থাকে তখন আমরা বলি সমঝোতার স্মারক সাক্ষরিত হয়েছে। সমঝোতা স্মারক কোন চুক্তি নয়। চুক্তির উপবর্তী ধারণ। ভবিষ্যতে এগুলো কার্যকর হতেও পারে নাও হতে পারে। এগুলো আসলে একধরনের লোক দেখানো তৎপরতা। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন কখন যে কি বলেন তার কোন ঠিকঠিকানা নাই। মালদ্বিপের প্রেসিডেন্ট, নেপালের প্রেসিডেন্ট, শ্রীলংকা ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে অনেক কথাই তিনি বলেছেন। বিশেষ করে ভারতের কথা বলেছেন যে নদ-নদীর পানির হিস্যা আদায় তার এই সফরের লক্ষ্য নয়। তিনি এসেছেন বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানাতে। সরকারের তরফ থেকে এদের সকলকেই বিশ^নেতা বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোথায় বিশ^ কোথায় নেতা। মোদির হাত মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত। এখনও পশ্চিমবঙ্গে যে নির্বাচনী প্রচার চলছে তাতে মুসলমান বিরোধী বক্তব্য অস্পষ্ট নয়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি সরকার আসিন হতে পারে তাহলে সেখানকার মুসলমানদের খবর আছে। দেশের ভিতরে অনেকে এমন কথাও বলছেন যে, অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চরম সম্প্রদায়িক মোদিকে ডাকার কোন প্রয়োজন ছিলো না। গতকালও ঢাকায় মোদি বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। সারাদেশে বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ চলছে। সরকার বলছে মোদি বিরোধী কোন তৎপরতা বরদাস্ত করা হবে না। আমরা এই সরকারকে চিনতে পারছি না। এরা কারা। এদেশে ৯০ভাগ মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব এরা কি করেন। এদের কর্মকা-ে তা মনে হয় না। 

আর কারো ব্যাপারে নয় বর্তমান সরকার ভারতকে যেন পুরো বাংলাদেশটাই উজাড় করে দিয়েছে। ট্রানজ্রিট দিয়েছে, ট্রানশিপ্টম্যান্ট দিয়েছে, রেল নৌ সড়ক পথ উজাড় করে দিয়েছে। কোন ফিরও প্রয়োজন হয় না। ভারত তার দেশের ভিতরেও এই রকম সুবিধা পায় না। সুতরাং ভারতের আর কিছু চাইবার নেই। কিন্তু আমাদের চাইবার ছিলো অনেক কিছু। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি, সিমান্ত হত্যা বন্ধ, নেপাল-ভুটান যাওয়ার পথ সবকিছু রুদ্ধ হয়ে আছে। সরকার যখন ভারতে কিছু দেয় তখন বলে আমরা ভারতের উপরদিয়ে নেপালে অবাধে বাণিজ্য করতে পারবো। আমাদের পর্যটকরা গাড়ি করে নেপালে চলে যেতে পারবে সোজা, ভারত বাধা দেবে না কিন্তু সেটি আর হয়নি। ভারত আমাদের কাছ থেকে সুবিধাটুকু নিয়েছে আমাদের প্রাপ্য সুবিধা দেয়নি। খুবিই হাশির কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। তিনি বলেছেন, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে তার স্বদেশে ফিরে গিয়ে ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। বাংলাদেশ বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে তিনি এতো বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিন লক্ষ লোকের ছোট্ট দেশ ভুটান সেখানে করোনা সংক্রমণের প্রথম থেকেই কঠোর কড়াকড়ি আরোপের ফলে করোনা ভাইরাস প্রবেশ করতে পারেনি। আব্দুল মোমেনের এই ত্যাগ স্বীকার তত্ত্ব হাসির খোরাক জুগিয়েছে। কিন্তু দ্বিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি এরকম কথা আরো বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। অনেকটা উন্মাদের প্রলাপের মতো মনে হয়। কিন্তু তিনিতো বলেছেন।

বিদেশীরা যখন বাংলাদেশে মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে বলে গণতন্ত্র তলানিতে একনায়কতন্ত্র জেঁকে বসেছে। তখন তিনি পুষ্পের হাসি হাসেন। বলেন, বাংলাদেশ এক তাজ্জবের দেশ। বিদেশীরা কেন কথা বলবে। অথচ বিদেশীরা যেসব কথা বলছেন সেগুলো নিয়ে তিনি করছেন। 

বলছিলাম স্বাধীনতার উৎসবে জনগণ লাঠির আঘাতে পর্যুদস্ত এ পথে যেও না, ওপথ বন্ধ, সময় নিয়ে বের হবে, পথে দেরি হতে পারে। আমার দেশ আমার স্বাধীনতার উৎসব আমি আমার মতো করেই পালন করবো। আপনি পুলিশ দিয়ে ঠেকাবার কে? কিন্তু ঠেকানো তো হচ্ছে। কথা নেই বার্তা নেই রাস্তা ঘন্টারপর ঘন্টা বন্ধ। মানুষের দুর্ভোগ চরমে। মানুষকে ঠেঙিয়ে মানুষের উৎসব। সত্যিই তাজ্জবের দেশ বাংলাদেশ। 

এখানে আরো ঘটনা আছে। সরকার ভিন্ন প্রচার প্রচারণায় মনে হতে পারে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়াদি উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিলেন এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তারপর জাদুমন্ত্র বলে দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। ঘটনাটি এমন ছিলো না। শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তাজউদ্দিন আহমদরা ক্যাসেট নিয়ে ঘোষণার জন্য পীড়াপীড়ি করলে এবং শেখ মুজিবকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বলে ছিলেন তোদের মতো তোরা চলে যা। আমার ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। তবুও পীড়াপীড়ি করছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তখন শেখ মুজিব তাদের জানান, ২৭ মার্চ হরতাল ডেকে দিয়েছি। এবার তোরা যা, নাকে তেল দিয়ে ঘুমা। 

ব্যর্থমনরথ হয়ে ফিরে এসেছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তারপরের দীর্ঘ কাহিনী তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম. খন্দকার মোস্তাক আহমদ, জেনারেল আতাউল গণি উসমানি, জিয়াউর রহমান, শফিউল্লাহ, অলি আমহদ প্রমুখ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দ যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশন্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকলেন। এই নয়মাস ধরে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আত্মত্যাগ করেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছেন। সেই রক্ত¯্রতোধারা অতিক্রম করে বাংলাদশ স্বাধীনাতা অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের এই পুরোটা সময় শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন।

এখানে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের যে বিশাল অবদান রয়েছে সেকথা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। কিন্তু ইতিহাস তো ইতিহাসই। ইতিহাসের সত্য কখনো মুছে যাওয়ার নয়। স্বাধীনতার এই সুবর্ণজন্তীতে কোথাও তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী,  সৈয়দ নজরুল, কর্ণেল ওসমানি বা অন্যকোন বীরের ছবি কিংব গাঁথা আমরা দেখলাম না। এটা ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর।

তবে একথা ঠিক  যে, স্বাধীনতার ৫০বছর পূর্তিতে এই নেতৃবৃন্দের বীরত্বগাঁথাও সমান গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হওয়া উচিত ছিলো। তা না হলে ইতিহাস কি আমাদের ক্ষমা করবে।  স্বাধীনতা যুদ্ধ এক ব্যক্তি এক ঘোষণায় আসে না। যুদ্ধের বিজয়ও একব্যক্তি অর্জন করতে পারেন না। তার জন্য লাখ মানুষের  অবদান থাকে। আমরা যদি সে অবদান অস্বীকার করি তাহলে বাংলাদেশকেই অস্বীকার করা হবে। সবকিছু সাদা চোখে দেখা দরকার। সবকিছু ন্যায্যতা দিয়ে বিচার করা দরকার। সেটি আমরা পারছি না বা করছি না। ফলে এক খন্ডিত ইতিহাস নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটি জাতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ