শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

‘সুবর্ণজয়ন্তী’ ও ‘বিবর্ণ অনুতাপ’

আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা অর্ধশতাব্দী হয়ে এলো। এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি আমরা। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলান প্রাপ্তির খাতাটা আমাদের জন্য ততটা সমৃদ্ধ হতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে। ১৯৭১ সালে আমাদের বার্ষিক জাতীয় বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। তা এখন ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। ১২৯ ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশটি বর্তমান মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার। সময় পেরিয়েছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনও কক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। আমাদের অপ্রাপ্তিটা মূলত সেখানেই।

জাতীয় উন্নয়নের মাপকাঠি মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য, উৎপাদন, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, ব্যাংক রিজার্ভের পরিমাণ প্রভৃতির উপর নির্ভর করে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) এর প্রতিবেদন অনুসারে উন্নত দেশের তালিকায় পৃথিবীর ১৫৬টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, সম্পদ উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত বাস্তবিক অর্থে একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি বা অগ্রগতি নির্ভর করে বেশকিছু নিয়ামকের উপর। জনগণের জীবনযাত্রার বাস্তব রূপ, খাদ্যনিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, মতপ্রকাশের অধিকার, মানসম্মত বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা, কর্মসংস্থান প্রভৃতির মাপকাঠি প্রকৃত উন্নয়নের চিত্র প্রদর্শন করে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন এখনো হতাশার বৃত্তেই রয়ে গেছে।

একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হলো দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিদেশী বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর উপর নির্ভরশীল। আমাদের সবচেয়ে বড় হতাশার বিষয়টি নেতিবাচক ও বিভক্তির রাজনীতি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হলেও বাংলাদেশে ক্রমাগত পশ্চাদমুখী রাজনীতি চর্চার ফলে জাতীয় ঐক্যের সৃষ্টি হতে পারেনি। ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও আদর্শহীন রাজনীতি এজন্য প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়। ফলে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নগুলোও অধরাই রয়ে গেছে।

দেশে বর্তমানে কোন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি আমাদের সকল অর্জনকেই ম্লান করে দিয়েছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশের আইনের শাসনের সূচকও একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। তাই স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণতান্ত্রিক চর্চাকে নির্বিঘœ ও অবারিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফিরে আনতে হবে গতিশীলতা। রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। মনে রাখতে হবে কোন শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জন্য স্বাধীনতার ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ যেন ‘বিবর্ণ আনুতাপ’-এর অনুষঙ্গ না হয়। এ দায়িত্ব আপনার-আমার সকলের।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ