রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ॥ বাড়ছে মৃত্যু

নাছির উদ্দিন শোয়েব : ফরিদপুরে একদিনে একই পরিবারের ছয়জনসহ ১২ জন নিহত হওয়ার পরদিনই গতকাল ফের তিন জেলায় চারজন নিহত হয়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন মানুষ। একদিকে করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত মানুষ। পাশাপাশি সড়কেও ঝরছে প্রান। নতুন সড়ক আইনেও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না।
এদিকে ফরিদপুরের মধুখালীতে ট্রাক-মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। এছাড়াও এদিন জেলা সদর ও ভাঙ্গা উপজেলায় আরও তিন জন নিহত হন। সড়ক দুর্ঘটনায় একদিনে ১২ জনের মৃত্যুতে জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এছাড়াও এসব দুর্ঘটনায় আরও অন্তত ৫ জন আহত হয়ে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে। স্বজন হারানোর বেদনা সারা জীবন বইতে হয়। প্রিয়জন হারানোর কষ্টের কোনো বর্ণনা হয় না। যে হারায় কেবল সেই বোঝে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট।
যাত্রী সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন-বেপরোয়া গতি-চালকদের অদক্ষতাসহ ১০ কারণে ঘটেছে এসব দুর্ঘটনা’। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ রাজনীতির ধারাবাহিক চর্চার কারণে গড়ে উঠেছে। এখানে অনেকগুলো কারণ জড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। তবে প্রধান ও উৎস কারণ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির তথাকথিত রাজনীতি। তাই সমস্যাটির সমাধান করতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। দেশের সুষম ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেজন্য জাতীয় স্বার্থেই সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত।
২০২০ সালে দেশে চার হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং সাত হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন বলে রোডটি সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’ এ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত পাঁচ হাজার ৪৩১ জনের মধ্যে ৮৭১ জন নারী ও ৬৪৯ জন শিশু।  প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছর এক হাজার ৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৬৩ জন নিহত হয়েছেন। যা মোট নিহতের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। দুর্ঘটনায় এক হাজার ৫১২ জন পথচারী নিহত হয়েছে। যা মোট নিহতের ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৮৩ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত বছরব্যাপী ১১৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২৭২ জন নিহত, ১৩৭ জন আহত ও ৬২ জন নিখোঁজ হন। ১০৮টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২২৮ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হন।
মোট দুর্ঘটনার মধ্যে পাঁচ দশমিক ২৩ শতাংশ ঘটেছে ভোরে, ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ সকালে, ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ দুপুরে ২০ দশমিক ০৪ শতাংশ বিকেলে, নয় দশমিক ৭৫ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ঘটেছে রাতে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। আর সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগেভ জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ময়মনসিংহে এবং সবচেয়ে কম মেহেরপুরে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সাতটি জাতীয় দৈনিক, পাঁচটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রাণহানি বেড়েছে চার দশমিক ২২ শতাংশ এবং আহতের হার বেড়েছে তিন দশমিক ৮৮ শতাংশ। আগের বছরে তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। করোনার সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালে দুই মাস সড়কে পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকার পরেও দুর্ঘটনা ২০১৯ সালের তুলনায় বেঢ়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; বি আরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছে এই সংগঠনটি। সেগুলো হলো-দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে; চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; বি আরটিএ’র সক্ষমতা বাড়াতে হবে; পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা তৈরি করতে হবে; পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের ওপর চাপ কমাতে হবে; টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’র সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছে।  এ সময় আহত হয়েছেন আরও দুজন। সকাল ৯টার দিকে উপজেলার বিবিরহাটের জেইউ পার্কের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের একজন মানিক আচার্য্য (৫০)। তিনি নোয়াখালীর কবিরহাট থানার মৃত রাজেন্দ্র আচার্য্যের ছেলে। তবে নিহত অপর যুবকের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফটিকছড়ি ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) মীর সরওয়ার আলম বলেন, ‘সকাল ৯টার দিকে বিবিরহাট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলে এবং অপরজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।’
জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ট্রাক্টর উল্টে চালক সিফাত মিয়া (১৯) নিহত হয়েছেন। গতকাল সকালে উপজেলার মহাদান ইউনিয়নের সেঙ্গুয়া সিরাজাঙ্গাল বিল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সিফাত মিয়া জামালপুর সদর উপজেলার পলাশতলা গ্রামের মো. আমিনুল ইসলামের ছেলে। অন্যদিকে নাটোরে বাসচাপায় আব্দুর রাজ্জাক (২৮) নামের সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সকাল সাড়ে ১০টায় নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের দিঘাপতিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুর রাজ্জাক দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের শিবদূর গ্রামের নাজির আলীর ছেলে। তিনি সোনালী ব্যাংকের বড়াইগ্রাম শাখায় কর্মরত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ