বৃহস্পতিবার ২২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান চলে গেলেন

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : মৃত্যু যেমন সত্য, তেমনি অবধারিত। জীবনের অমোঘ নিয়তি। অদৃশ্য এ বাঁধন থেকে কারও মুক্তি নেই। এই মহা বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলার সুযোগ বা সাধ্য জগত সংসারে কারও নেই। দুনিয়া ও আরশের মহা অধিপতি কর্তৃক নির্ধারিত দিনক্ষণে প্রত্যেকটি প্রাণীর মৃত্যুর ফায়সালা হয়। চাওয়ার পাওয়ার এই পৃথিবীতে যত মানুষ দুনিয়াতে এসেছেন কেউ চিরস্থায়ী হিসেবে থাকতে পারেনি। ভবিষ্যতে যারা আসবেন তারাও চিরস্থায়ী হবেন না। তবু কিছু মানুষের মৃত্যুতে হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। তিনি আর কেউ নন। তিনি হচ্ছেন একজন মানবদরদী কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান। তিনি গত ২০ মার্চ রোজ শনিবার সকাল ১০টায় ইবনে সিনা হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। মরহুমের প্রথম নামাজে জানাযা বাদ জোহর ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। বাদ আসর নেভাল হেডকোয়ার্টারে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাদ এশা নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের প্রভাকার্দি মিয়ার বাড়ি জামে মসজিদে মরহুমের তৃতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একনজর মরহুমকে দেখার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন ছুটে আসেন। পরে তৃতীয় দফা জানাযা শেষে বরেণ্য এই কিংবদন্তিকে আড়াইহাজারের ব্রাক্ষনদী ইউনিয়নের প্রভাকার্দি গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তাঁর চলে যাওয়া বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করল। এই শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামী অর্থনীতির একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।
দেশের বিরাজমান প্রেক্ষাপটে তার অকাল চলে যাওয়া মানে একটি ইতিহাসের খসে পড়া তারার পতন। সব মৃত্যুই প্রকৃত মৃত্যু নয়। আর প্রত্যেক মৃত্যুকেই মানুষ মনে রাখে না। কোনো কোনো মানুষের মৃত্যু অবিস্মরণীয় হয়ে প্রেরণা জোগায়। কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। এটা ঠিক। কিন্তু পরোপকারী এই মানুষটি হাজারো মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় আজীবন বেঁচে থাকবেন। এই মানুষটির সাথে আমার রক্তের কোন সর্ম্পক নেই। এটা ঠিক। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সংবাদ মেনে নিতে পারিনি। মনের অজান্তে চোখের কোণ দিয়ে পানি ঝরেছে। আমরা একজন পরোপকারী অভিভাবককে হারালাম। তাঁকে ভুলা সম্ভব না। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ২০০৯ সালের দিকে। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁকে একজন অভিভাবক হিসেবেই কাছে পেয়েছি। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর সাথে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সফর করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেদিনও তাঁকে একজন অভিভাবক হিসেবে কাছে পেয়েছিলাম। যা স্মৃতির ফ্রেমে এখনো আমাকে ভালোবাসার পরশ দেয়। এত উঁচু মাপের একজন ব্যক্তি সম্পর্কে হাজার পৃষ্ঠা লিখলেও সমাপ্তি টানা যাবে না। আমি তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানি তা সত্যিই অসাধারণ। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান এক শোকবার্তায় বলেন, আমি তাঁর ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবক। ইসলামী অর্থনীতি বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরের বিকাশে এবং বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর ইন্তিকালে জাতি একজন প্রথিতযশা ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও মানবদরদী ব্যক্তিকে হারাল। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়। তাঁর সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, ইসলামী দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, লেখক ও অর্থনীতিবিদ জনাব শাহ আব্দুল হান্নান বলেন, কমোডর (অব:) এম আতাউর রহমান সাহেবের সাথে আমার পরিচয় হয় যখন আমি খুলনায় কালেক্টর অব কাস্টম হিসেবে কর্মরত। তখন তিনি মংলা পোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি নিজ উদ্যোগে তাঁর অফিসে এবং বাসায় দেখা করি এবং ক্রমে ক্রমে সম্পর্ক আমাদের বন্ধুত্ব পর্যায়ে চলে যায়। তার ছোট মেয়ে তখন স্কুলে পড়ে। আমি তাঁকে আমার ছাত্রী বানানোর চেষ্টা করি এবং ইসলাম সম্পর্কে নানা ধারণা দেই। কমোডর সাহেবকে আমি অনেকগুলো ইসলামী বই দেই। ক্রমে ক্রমে তিনি ইসলামের ভক্ত হয়ে যান এবং ইসলামী কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যান। অবসর নেয়ার পর যখন তিনি ঢাকায় আসলেন তখন আমি কমোডর সাহেবকে ইবনে সিনা ট্রাস্টের সঙ্গে জড়িয়ে নেই এবং একইভাবে মানারত বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়িয়ে নেই। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। ইসলামের একান্ত অনুগত ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ইসলামের পুরাপুরি অনুসরণ করতেন। তিনি সকল ইসলামি প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করতেন। ইবনে সিনা ট্রাস্টে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে।
জন্ম ও কর্মজীবন : মরহুম এম আতাউর রহমান ১৯২৭ সালের ১৮ অক্টোবর নারাণণগঞ্জের আড়াইহাজারের প্রভাকার্দি গ্রামে এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ১৯৫০ সালে পাকিস্তান নেভীতে সাব লেফটেন্যান্ট হিসাবে যোগ দেন। ১৯৫১ সালের দিকে ইংল্যান্ডের প্লিমাউথের ম্যানাডন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদমর্যাদায় কাজ করেন। চাকরিজীবনে তিনি বিআইডব্লিউটিসি, চালনা বন্দর ও টিসিবি ও ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানর পদ থেকে ১৯৮৪ সালের ৩১ জানুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন। চাকরিজীবন থেকে তিনি অবসর নিলেও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ থেকে অবসর নিতে পারেননি। সারাটা জীবন ইসলামের কাজে এবং মানুষের কল্যাণের জন্য মৃত্যুর আগ মুর্হূত পর্যন্ত নিবেদিত ছিলেন। তিনি ইসলামী ব্যংক বাংলাদেশ লিমিটেডের দ্বিতীয় বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ইবনে সিনা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান, মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ও মানারত ট্রাস্টের সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা বোর্ড চেয়ারম্যান ছিলেন। এর বাইরেও বহুসংখ্যক সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন।
পরিচিত পরিমণ্ডলে তিনি কিংবদন্তিতুল্য একজন পরোপকারী ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে মরহুম কমোডর অব.এম আতাউর রহমান ২ মেয়ে এক ছেলের জনক ছিলেন। বড় মেয়ে ডা: সারাহ ইয়াসমিন হোসেন ব্রিটেনে কর্মরত, দ্বিতীয় মেয়ে বুয়েটের অধ্যাপিকা। ছেলে জিয়াউর রহমান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। আরশের অধিপতির নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর ভুলত্রুটিগুলোকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ