শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

সুনামগঞ্জে হিন্দুদের গ্রামে হামলা : হোতাদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসছে

আসিফ আরসালান : সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘর বাড়িতে হামলার একটি খবর গত ১৮ বৃহস্পতিবার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই হামলা অবশ্যই নিন্দনীয়। দৈনিক সংগ্রাম এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। হিন্দুরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাই তাদের উপর হামলা হিন্দুদের উপর হামলা হিসেবে না দেখে সেটিকে বরং বাংলাদেশের একটি গোষ্ঠীর ওপর হামলা হিসেবে আমরা বিবেচনা করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কারা এই হামলা করেছে? হামলার খবর পরিবেশনের সময় সেখানে হেফাজতে ইসলামের নামটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গালাগালি করে জনৈক হিন্দু যুবক ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেই স্ট্যাটাসের সূত্র ধরেই নাকি শাল্লার হিন্দু পল্লীতে আক্রমণ হয়েছে।
এই ধরনের সংবাদ পরিবেশন সাংবাদিকতার কোন স্ট্যান্ডার্ডে পড়ে সেটি আমরা বুঝতে অক্ষম। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একটি হামলার ঘটনা ঘটলো। সেটির অগ্রপশ্চাৎ অনুসন্ধান না করে, কোনরূপ প্রাথমিক তদন্ত না করেই তাৎক্ষণিকভাবে বলা হলো যে এটা অমুক করেছে। এটি কোন ধরনের সাংবাদিকতা? এর পরপরই হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। গত ১৯ মার্চ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেক্যুলারপন্থী কোন পত্রপত্রিকার অনলাইন সংস্করণে সেই বিবৃতি দেখলাম না। কোনরূপ অনুসন্ধান নাই, তদন্ত নাই, কিন্তু বিদ্যুৎ গতিতে হেফাজতের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে মেইনস্ট্রীম পত্রিকাগুলো একটি খবর ছাপলো এবং ইসলামপন্থী একটি দলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিলো। কিন্তু যখন ঐ দলটি নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দিলো তখন সেই বিবৃতি ওদের কেউ ছাপলো না। এটাকে তথ্য সন্ত্রাস ছাড়া আর কি বলবেন? অথচ হেফাজতের ঐ বিবৃতিতে এমন সব পয়েন্টস উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো সিরিয়াসলি বিবেচনার দাবী রাখে।
॥ দুই ॥
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামবাদী এক বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দুদের বাড়ি ঘরে হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বিবৃতিতে তিনি প্রশ্ন করেন, কারা এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কারা হাজার হাজার হামলাকারীকে সংগঠিত করেছে? হাজার হাজার মানুষ সেখানে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা করলো, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সেখান থেকে কাউকেও গ্রেফতার করা হলো না কেন? সেখানকার আক্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায় বলেছেন, তারা আগেই আক্রমণের খবর মাইকে শুনে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে গেছেন। এই হামলার খবর অগ্রিম তাদেরকে কারা জানালো? হামলা হবে, সেটা আগে ভাগে জেনেও স্থানীয় প্রশাসন কেন সময়মত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি? এই অবহেলা বা ব্যর্থতার দায় অবশ্যই সেখানকার প্রশাসনকে নিতে হবে। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হামলা। আর হিন্দু গ্রাম মহল্লায় জলমহালের দখল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে দাঙ্গা ও হানাহানির ঘটনা নিয়মিত এবং পুরানা। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, পর্যাপ্ত তদন্ত, অনুসন্ধান ও প্রমাণ ছাড়াই হেফাজতকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলক প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে কয়েকটি চিহ্নিত ভারতপন্থী মিডিয়া। আমরা তাদের এহেন অপেশাদার ও হলুদ সাংবাদিকতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, অতীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপসনালয়ে হামলা বা ভাংচুরের ঘটনা ঘটলে হেফাজতে ইসলাম সেটার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা সবাইকে স্পষ্ট জানাতে চাই, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাড়িঘর ও উপসনালয়ে কোনো ধরনের হামলাকে হেফাজত সমর্থন করে না।
বাংলাদেশে যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ‘অগ্রসর সমাজ’ বা প্রগতিশীল বলে দাবী করেন তারা এবারের মত অতীতেও এধরনের ঘটনা ঘটলে কাল বিলম্ব না করে বিভিন্ন ইসলামী দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেন। অথচ সেসব ঘটনার সাথে জামায়াতের দূরতম সম্পর্কও ছিল না। আজ পর্যন্ত জামায়াতের একজন কর্মীর বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। বরং দেখা গেছে এই যে এইসব তথাকথিত প্রগতিবাদীরাই ‘সর্প হইয়া দংশন করে আবার ওঝা হইয়া ঝাড়তে’ চেয়েছে। কিন্তু ধর্মের ঢোল আপনেই বেজে উঠেছে। সব অপকর্মেই জামায়াতকে ‘ কেষ্ট বেটাই চোর’ ঠাওরানোর অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
॥ তিন ॥
কথায় বলে, মিথ্যার মায়াজালে সত্যকে চিরদিন ঢেকে রাখা যায় না। সত্য একদিন না একদিন তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে সংঘটিত হামলার হোতাদেরও পরিচয় দিনের আলোর মত প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। হামলা ও ভাংচুরের প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর স্থানীয় যুবলীগ সভাপতি স্বাধীন মিয়াকে প্রধান আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছেন শাল্লা উপজেলার হাবীবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। বলা হয়েছে যে এই হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ সভাপতি স্বাধীন মিয়া এবং তার পিতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা কেরামত আলী। স্বাধীন মিয়া এ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য (মেম্বার)। স্বাধীন মিয়া সহ ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে শাল্লা থানায় মামলা দায়ের করার ২৪ ঘন্টা পার হয়েছে (শুক্রবার সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত)। কিন্তু তখন পর্যন্ত কাউকেও গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক জানান, হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি দায়ের করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। এতে অজ্ঞাতনামাদের আসামী করা হয়েছে। গ্রামবাসীর পক্ষে আরেকটি মামলায় ৫০ জনের নাম উল্লেখ সহ অনেক অজ্ঞাতনামাকে আসামী করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম এবং হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হককে নিয়ে কটুক্তি ও আপত্তিকর পোস্ট দেন শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামের গোপেন্দ দাসের ছেলে ঝুটন দাস আপন বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে ঐ রাতেই জনতার সাহায্যে শাঁসকাই বাজার থেকে তাকে আটক করে পুলিশ।
প্রিয় পাঠক, আমি কিছুক্ষণ আগেই লিখেছি যে মিথ্যার মায়াজালে সত্যকে চিরদিন ঢেকে রাখা যায় না। ঐ  সময়ও আমি জানতাম না যে হিন্দু সম্প্রদায়েরই বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল, আওয়ামী লীগ নেতা কেরামত আলী এবং তার ছেলে যুবলীগের সভাপতি স্বাধীন মিয়ার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছে। লেখাটি ঐ পর্যায়ে আসার পর কম্পিউটারে বিবেকানন্দ মজুমদারের মামলার খবর দেখি।
॥ চার ॥
লেখাটি শেষ পর্যায়ে আসার পর গতকাল শনিবার ঢাকার দুইটি বাংলা দৈনিক পত্রিকায় এ সম্পর্কে দুটি সংবাদ দেখলাম। একটি প্রথম আলো। অপরটি যুগান্তরে। প্রথম আলোর রিপোর্টে স্বীকার করা হয় যে হামলা হবে, এ আঁচ করতে পেরে সেই আশঙ্কা নাকি আগেভাগেই পুলিশকে জানানো হয়েছিল। পত্রিকাটি যে রিপোর্ট দিয়েছে সেটি অর্ধসত্য। অপ্রাসঙ্গিকভাবে সেখানে হেফাজতের আমীর বাবুনগরী এবং যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকের ওয়াজ মাহফিল তথা জনসমাবেশের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানির মতো একটি শব্দও তারা ওই সমাবেশে উচ্চারণ করেনি। ঝুটন দাস ওরফে আপন কি তার স্ট্যাটাস শুধুমাত্র মাওলানা মামুনুল হকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে? সেই স্ট্যাটাসে তো ইসলামকেও কটুক্তি করা হয়। সেই কথাটি প্রথম আলো লেখে নি কেন? তার পরেও পুলিশ ঝুটন দাসকে গ্রেফতার করেনি কেন? একটি গ্রামের লোকজন তো ঝুটন দাসকে ধরে পুলিশের নিকট সোপর্দ করে।
হেফাজতের বিবৃতিতে জলমহাল নিয়ে কোন্দলের একটি দুটি বাক্য আছে। প্রথম আলোর রিপোর্টেও তার স্বীকৃতি মেলে। প্রথম আলোর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে ‘গোসাইয়ের বিল’ এবং ‘নিত্যার দাইর’ নামে সেখানে দুটি জলমহাল রয়েছে। ওয়াক্ফ স্টেট থেকে ইজারা নিয়ে সেখান থেকে মাছ ধরছেন স্থানীয় যুবলীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম স্বাধীন। ইজারার নীতিমালা না মেনে তারা পাম্প দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরেন। পানি সেচের ফলে বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ব্যাপারে হরিপদ চন্দ্র দাস, জগদীশ চন্দ্র দাস সহ কয়েক ব্যক্তি থানায় যুবলীগ নেতা স্বাধীন ও তার পিতা আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার না হওয়ায় তারা পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজির নিকট অভিযোগ দাখিল করেন। পুলিশ যুবলীগ সভাপতির এক সহযোগী ফকরকে আটক করে এবং পাঞ্চ মেশিনটি ৩৫ হাজার টাকায় বেচে দেয়। এই নিয়ে যুবলীগ নেতা স্বাধীন এবং তার পিতা নোয়াগাঁওয়ের আদিবাসীদের ওপর ক্ষীপ্ত ছিলেন। গ্রামবাসীর তরফ থেকে হামলা সম্পর্কে যে মামলা করা হয়েছে তার ১নং আসামী যুবলীগ নেতা স্বাধীন।
আমি সেজন্যই বলেছি যে সত্যকে কোনোদিন ছাই চাপা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের একটি সংগঠন হেফাজতের আমীর বাবুনগরী এবং অন্যতম নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতারের দাবী জানিয়েছে। সরকারপন্থী সংগঠন হলে এসব দাবী তোলাই যায়। কিন্তু তারা এই দুই নেতার বক্তৃতার রেকর্ড বাজিয়ে প্রমাণ করুন যে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্যে একটি শব্দও আছে কিনা, অথবা সাম্প্রদায়িক উস্কানির একটি শব্দও আছে কিনা।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ