শনিবার ০৮ মে ২০২১
Online Edition

ঘরে ঘরে ডটকম

এম এ কবীর:

সবার আগে সব খবর পান কিভাবে? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো সাংবাদিকদের সব সময়। প্রশ্নটা জটিল হলেও ছিল আত্মতৃপ্তি।

গর্বের সাথেই প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি মেশানো ছিল উত্তরটা । মুখে উত্তর যা-ই হোক, মনের ভাবনা ছিল, ‘এখানেই তো সাংবাদিকদের ক্যারিশমা। সবার আগে সব খবর পাই বলেই তো আমরা সাংবাদিক।’  নিজেদের এগিয়ে রাখতেই ছিল ইচ্ছা-অনিচ্ছার সব সমঝোতা। ভুলে যেতেন রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে সংবাদ সংগ্রহের কষ্টের কথা। অগ্রজদের মুখে মুখে চলতো সেই গল্প। এখন সেগুলো ফিকে। এর অনেক কারণের একটি বেশি গুঞ্জরিত - ‘ঘরে ঘরে ডটকম’। 

একটা কম্পিউটার নিয়ে যে কেউ খুলে বসছে অনলাইন পাত্রিকা। খবর সংগ্রহের মাধ্যমও  অনলাইন। কপি-পেস্ট । প্রয়োজন নেই প্রতিবেদকের। প্রয়োজন নেই সোর্সের। ল্যাপটপ আর নেট থাকলেই হলো। 

দেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা কমপক্ষে দশ হাজার।  প্রথম ধাপে নিবন্ধনের জন্য কয়েকটি অনলাইন পোর্টালের নাম চূড়ান্ত করেছে তথ্যমন্ত্রণালয়। সে তালিকায়ও অনেক নামমাত্র অনলাইন রয়েছে। যাদের পেশাদারিত্ব বলতে কিছু নেই । পেশাদারিত্ব এবং মোটামুটি পেশাদারিত্ব আছে এমন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা নয়-দশের বেশি হবে না (টেলিভিষন ও দৈনিক পত্রিকার ওয়েবসাইট বাদে)। শতাংশের হিসাবে তা ০.১ ভাগ। তার মানে হলো ৯৯.৯ ভাগ পোর্টালের পেশাদারিত্ব নেই। এই পোর্টালগুলো অন্য পোর্টালের সংবাদ নির্লজ্জভাবে চুরি করে কিছুটা পরিবর্তন করে বা হুবহু প্রকাশ করে।   বিনিয়োগ নেই। সংবাদকর্মী নেই। মূলধনও চৌর্যবৃত্তি। মানে কপি, পেস্ট। কপি ঠেকানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এ পোর্টালগুলোর জন্মের পর-পরই মৃত্যু হতো। হয়তো জন্মই হতো না। 

সংবাদ সরবরাহের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই অনলাইনগুলো চালু করা। পাঠক উপকৃত হোক চাই না হোক, কিছু মানুষ কোনো প্রকারের দক্ষতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই সম্পাদক বনে যেতে পারেন । চায়ের দোকানি,পাড়ার বেকার ছেলেটা, রাতারাতি ধনী হয়ে যাওয়া প্রতিবেশি থেকে শুরু করে স্কুলের গন্ডিতে আটকে যাওয়া বন্ধুটা পর্যন্ত এখন সাংবাদিক। 

এত সব ভুঁইফোড় গণমাধ্যমের ভেতর কিছু মানসম্পন্ন অনলাইন গণমাধ্যমও আছে। এতে অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিকও কাজ করেন।  বোদ্ধা পাঠক এদের গ্রহণও করেন। তবে মাঝে-মধ্যে এরাও হতাশ করতে ছাড়েন না। এদের পর্যাপ্ত সোর্স আছে, প্রতিবেদক, সম্পাদনা পরিষদ, সবই আছে। তাহলে হতাশ করছে কেন? কারণ সব থাকার পরও আছে বেশি হিট অর্জনের প্রতিযোগিতা। 

 সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সাবেক অধিনায়ক ও  সংসদ সদস্য মাশরাফির একটি স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। হঠাৎই অন্তর্জাল দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ‘ মাশরাফি বিন মোর্তজা অন্যের স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়েছেন’ শিরোনামে একটি খবর। শিরোনাম দেখে বোঝার উপায় নেই প্রকৃত ঘটনা কী। বরং নোংরা হেডলাইনে ভুল বার্তা পেয়েছে পাঠক।

বিষয়টি মাশরাফির দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘What a headline, journalism at his best... যারা বছরের পর বছর এ পেশাটাকে শুধু পেশা হিসাবেই না সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে করে আসছেন উনারাও এসব দেখে লজ্জা পান, মনে হয়....’

মূল ঘটনা ছিল- ‘ মাশরাফির নির্বাচনী এলাকা লোহগড়ায় ১ জুন ইতি খানম নামের এক অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নির্যাতন করে রাস্তায় ফেলে যান তার স্বামী। নির্যাতন সইতে না পেরে অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে ইতি। পরে জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি জানান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে পুলিশ। এরপর থেকে স্বামী, শ^শুরবাড়ি কিংবা বাবার বাড়ির কেউ খোঁজখবর নেয়নি ইতির।

পরে মাশরাফি ঘটনাটি জানতে পেরে নির্যাতিতাকে তার শ^শুর বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ওই নারীকে আশ^স্ত করেন, সার্বিক সহযোগিতায় পাশে থাকবেন । এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খবর প্রকাশ করতে গিয়ে নোংরা শিরোনাম ব্যবহার করা হয়। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। 

শুধু এটি কেন? মূল ধারার গণমাধ্যম দাবি করা অনেক অনলাইন পত্রিকাই এ ধরণের শিরোনামের পেছনে ছোটে প্রতিনিয়ত। চটকদার শিরোনাম চাই, যেন পাঠক আকৃষ্ট হন। নতুবা প্রতিবেদক বা সাব-এডিটর অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। কর্তৃপক্ষের চাই হিট। আর এই হিটের পেছনে ছুটেই পাঠককে বিভ্রান্ত করা হয়। 

তখন ক্রিকেট বিশ^কাপ চলছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের বিদায় যে দিন নিশ্চিত হলো, সেদিন ‘ বিশ^কাপ থেকে বাংলাদেশ ছিটকে পড়ায় সাবিকের আত্মহত্যা’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে একটি গণমাধ্যম। 

এই সংবাদটি অন্য একটি গণমাধ্যমে ছাপা হয়- ‘বড় ভাইয়ের সঙ্গে অভিমান করে স্কুলছাত্রের আত্মহত্যা’ শিরোনামে।

 সংবাদটি ছিল - ‘সাকিব নামের এক ছেলে আত্মহত্যা করেছে বড় ভাইয়ের সঙ্গে অভিমান করে।’

প্রযুক্তির অগ্রসরের আলোচনায় প্রায়ই আসে- আগামীর দুনিয়া অনলাইন গণমাধ্যমের। প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

  আমরা বিশ^াস রাখি না। কারণ ওপরের ঘটনাগুলো সবার জানা। এসব কারণে দুনিয়ার সব জায়গায় অনলাইন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা পেলেও বাংলাদেশে হয়ত সম্ভব নয়। হিটের পেছনে অনলাইনগুলোর যে অদ্ভুদ ভূতুড়ে দৌড় তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। সাংবাদিকতা পেশা যেমন মহান, তেমন রয়েছে দায়িত্বশীলতাও। এ কাজে ঝুঁকি থাকলেও মজাও কিন্তু কম নয়। ফলে হাজার পেশার ভিড়ে এই পেশাটি একজন ব্যক্তির আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। 

দেশে জাতীয় দৈনিকের সংখ্যা কয়েক‘শ থাকলেও সাধারণ মানুষ হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা চেনে। অন্যান্য পত্রিকার নাম পরিচয় মানুষ খুব একটা জানেনা, সচরাচর কিনতেও পাওয়া যায়না। এ পত্রিকাগুলোকে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকাও বলা হয়। 

এমনই কিছু পত্রিকা টাকার বিনিময়ে সাংবাদিক পরিচয়ের আইডি কার্ড দেয়। কার্ড গ্রহীতাও নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বেড়ান। কার্ডধারী এসব সাংবাদিকের অপকর্মের অভিযোগ প্রশাসনে থাকে। জনতার হাতে আটক হতেও দেখা যায়। 

  চোর-বাটপার থেকে শুরু করে অটো ড্রাইভার, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীর কাছেও রয়েছে প্রেস কার্ড । কোন সমস্যায় পড়লে তারা তাৎক্ষণিক সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করার অপচেষ্টা করে। 

পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালেই সীমাবদ্ধ নয় এরকম হরেকরকম আইপি টিভির সাংবাদিককেও দেখা যায় যারা বিশেষ প্রতিনিধি পরিচয়ে গোটা জেলা আর স্টাফ রিপোর্টার পরিচয়ে সমগ্র দেশ চষে বেড়ান। 

তথ্যই জ্ঞান। জ্ঞানই শক্তি। গণমাধ্যম জনগণকে শিক্ষিত করে, সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের মাধ্যমে তাদের বুদ্ধিমান করে। গণমাধ্যম জনগণকে স্থানীয় ও বিশ^ব্যাপী জানায়। তাদের ক্ষমতা প্রদান করে। এ কারণে গণমাধ্যমকে বিশ্বের জনগণের ক্ষমতার উৎস বলা হয়। মুদ্রণ ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে সর্বশেষ খবর পাওয়ার মাধ্যমে মানুষ রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস হয়ে ওঠে। দেশের সমস্যা ও সমাধান, জনগণের চাহিদা ও দাবি পূরণ, গণতন্ত্র ও সুশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারা যায়, তা গণমাধ্যম সরকারকে জানাতে সাহায্য করে। 

গণমাধ্যমের দ্বারা উঠে আসে প্রান্তিক কৃষকের সফলতার খবর থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা নেতাদের দুঃশাসন, প্রশাসনের স্বেচ্ছারিতাসহ সব কিছুই। 

এই সংবাদ পাঠের মধ্য দিয়েই কি তার মূল্য শেষ হয়ে যায়? কখনোই নয়। বরং গণমাধ্যম কাজ করে হাতিয়ার হিসেবে। যখনই একটি ইস্যু গণমাধ্যমে আসে, তা সমাধান ও উত্তরণের বিষয়ে সুযোগ তৈরি হয়।  ফলে গণমাধ্যমকে অতি গুরুত্বপূর্ণ আনুষঙ্গিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যারা গণমাধ্যমে কাজ করেন, তাদেরও বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হয়। যেসব গণমাধ্যম সত্য, নিরপেক্ষ সংবাদ সংগ্রহ, প্রচার ও পরিবেশন করে থাকে, নিঃসন্দেহে তারা শুধু আয় নয়, বরং সমাজ বিপ্লবের অংশীদার হতেই কাজ করে। 

মূলধারার গণমাধ্যম  টেলিভিশন, রেডিও ও প্রিন্ট পত্রিকার পাশাপাশি বর্তমানে অনলাইন গণমাধ্যম বেশ অগ্রগামী। অনলাইন পোর্টাল হলেও কিছু কিছু অনলাইন গণমাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমকেও ছাপিয়ে গেছে। জনপ্রিয়তা, সংবাদ পরিবেশনে সূক্ষ্মতা কিংবা দায়িত্বশীলতার দিক দিয়ে সকলের ঊর্ধ্বে। এসব অনলাইন গণমাধ্যমকে সরকার নবম ওয়েজ বোর্ডের মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় এনেছে। নিঃসন্দেহ এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সব অনলাইন গণমাধ্যম এই সুযোগ পাবে না, কিন্তু সুযোগের জন্য যে মানদ- দরকার তার জন্য হয়তো অনেকেই অনলাইন গণমাধ্যমকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করবে না।

 কৈফিয়তের জায়গা তৈরি করতে পারলে অনলাইন গণমাধ্যমও সঠিক, সত্য ও তথ্যবহুল সংবাদ পরিবেশনের দিকে নজর বাড়াবে।

নিবন্ধনের মাপকাঠিতে অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা তাদের বৈধ পরিচয় পাচ্ছেন। যারা অনিবন্ধিত,তাদের সাথে যেসব সংবাদকর্মী কাজ করছেন, তারা সাংবাদিকতা চর্চার মধ্যদিয়ে এগোচ্ছেন যা তাদের সাংবাদিকতা শেখাকে উৎসাহিত করে। 

যোগ্যতার ঘাটতি ও অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে অনেকেই মূলধারার গণমাধ্যমে কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। তারা ঝুঁকছে অনলাইনে। এটির অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। তারা উৎসাহিত হচ্ছে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূলধারার গণমাধ্যমে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ আছে, অনলাইন গণমাধ্যম চালু করে টাকার বিনিময়ে প্রতিনিধি নেয়ার। আবার সময়মতো উধাও হয়ে যায় তারা। খুঁজে ফেরে অন্য গ্রাহককে। 

মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর আয়ের সুযোগ আছে। তারা বিভিন্ন কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে তারা এই গণমাধ্যম ব্যবসাকে পরিচালিত করে। বিপরীতে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো ব্যক্তিমালিকানায় তৈরি হয়ে থাকে। এদের আয়ের একমাত্র পথ ‘গুগল অ্যাডসেন্স’। যারা মানদ- বজায় রাখতে পারে, তারা ‘গুগল অ্যাডসেন্স’ থেকে আয় করার মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত পরিশ্রমের পারিশ্রমিক হাসিল করতে পারেন। কিন্তু যারা এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ, তারা অনলাইন গণমাধ্যমকে পুঁজি করে চাঁদাবাজি, ভাঁওতাবাজিসহ অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। 

ব্যক্তিবিশেষের এজেন্ডা বাস্তবায়নেও গড়ে উঠছে ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টাল। শুধু নিজের গুণকীর্তন প্রচারের জন্য এই অনলাইন পোর্টাল। এটি গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ।

দেশের অনলাইন গণমাধ্যমকে শুধু নিবন্ধনের আওয়াভুক্তকরণ নয়, বরং মনিটরিং করা সময়ের দাবি। তবে হস্তক্ষেপ করে তা কুক্ষিগত করার মতো পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। বরং উৎসাহ দিতে হবে যাতে তারা সেসব সংবাদকে গুরুত্ব দেয় যা মূলধারার গণমাধ্যমে জায়গা পায় না অথচ গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যে এক বা একাধিক মানদ- নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। কে বা কারা অনলাইন গণমাধ্যম চালু করতে পারবে, তারও একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। অনুমোদনের মাধ্যমে অনলাইন গণমাধ্যমের যাত্রা শুরু হলে এর দ্বারা সংঘটিত অনৈতিক কাজগুলো বন্ধ হবে।

আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির কথা বিবেচনায় রেখে আর কোনো খণ্ড খণ্ড নীতিমালা প্রণয়ন না করে একটি সমন্বিত গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন দরকার। এ নীতিমালার অধীনে সরকারি, বেসরকারি ও কমিউনিটি মালিকাধীন সব খাতের মাধ্যম পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। 

তাহলেই প্রকৃত গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মী সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হবে। গতানুগতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে পর্যাপ্ত বিকাশ ঘটাতে পারে না, সেখানে বিকল্প পন্থার আবির্ভাব ঘটে। যারা মতামতের প্রকাশ দেখতে চায়, নিজের মতের প্রকাশ চায়, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের কাছে প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। মানুষ এখানে তাদের অভিযোগ জানাচ্ছে। সাহায্যের  আবেদন জানাচ্ছে। কনভেনশনাল মতপ্রকাশের ক্ষেত্রগুলো সঙ্কুচিত হওয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্র বাড়ছে। এটা এখন প্রায় সমান্তরাল বিশ^ হয়ে উঠেছে।

অনলাইন মিডিয়ার সাথে আছে সোশ্যাল মিডিয়া, যেখানে একটি অপরটির ভোক্তা ও উৎপাদনকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। আর এখানে শুধু অনলাইন আর প্রিন্ট মিডিয়াই নেই বরং টিভি,রেডিও-ও রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিন্ট বা পেইড মিডিয়ার চেয়ে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর বেশি নির্ভর করছে।

বিজ্ঞাপনদাতারা এক সময় প্রিন্ট মিডিয়াতে তাদের বিজ্ঞাপনগুলো বড় আকারে প্রকাশ করতে পছন্দ করতো কিন্তু ভোক্তাদের আচরণের সাথে সাথে ডিজিটাল স্পেসের ব্যবহারও বদলে গেছে। ডিজিটাল মিডিয়ায় ভালোমানের বিজ্ঞাপন দেয়া এবং সেগুলো দেখার মাত্রা বেশি হওয়ায় বাজার অর্থনীতিতে একটা পরিবর্তন ঘটেছে এবং ডিজিটাল মিডিয়া আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

ভোক্তারা এখন শুধু অনলাইন সংবাদপত্র পড়ছেই না বরং একইসাথে ইউটিউব দেখছে, ফেসবুক লাইভ,অনলাইন টিভি, ভিডিও ক্লিপ দেখছে। সে কারণে অনলাইনে শুধু যে তথ্যই বেশি তা নয়, বরং সেখানে ভোক্তাও অনেক বেশি।

এক কাপ ধোঁয়াওঠা চায়ের সাথে ষোল পাতার দৈনিকটি যেন ছোট্ট এক টুকরো পৃথিবী। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, হিমালয় থেকে এন্টার্কটিকা অথবা আমাজনের গহিন জঙ্গল সব খবর অনায়াসেই মেলে ধরে চোখের সামনে। অথবা টিভির রিমোটের বোতাম চাপলেই দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিনোদন এক নিমিষেই ঢুকে পড়ে শোবার ঘরে।

শুধুই কি খবর? খবর,খবরের পেছনের খবর,আলোচনা,পর্যালোচনা,সমালোচনা, বিষয়ভিত্তিক সংবাদ, জেলাভিত্তিক খবর, ব্রেকিং নিউজ, আন্তর্জাতিক, উন্নয়ন সংবাদ, ক্রাইম, আরও কত কি। আবার মানুষকে সচেতন করতে ক্রাইমকে ভিত্তি করে নির্মিত হয় ক্রাইম ফিকশন। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালে, টিভি স্ক্রিনে চোখ রাখলে বা রেডিওতে কান পাতলে পুরো দুনিয়ার সাথে আমরা যুক্ত হয়ে যাই মুহূর্তেই।  

একবারও কি ভেবে দেখেছি সে মানুষগুলোর কথা যারা এই সংবাদগুলো সংগ্রহ, উপস্থাপন করেন? সময়ের সাথে আমাদের এগিয়ে রাখতে যারা রোদ বৃষ্টি, ঝড়ে, সন্ত্রাসীদের ডেরা থেকে, ল্যান্ডমাইন পোঁতা যুদ্ধ ক্ষেত্রে, চোরাকারবারিদের আস্তানা থেকে, করোনা ভাইরাসের হাসপাতালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কুড়িয়ে আনেন খবর,তাদের খবর কি আমরা রাখি?

ভাবুন তো, মাত্র একদিন সব সংবাদমাধ্যম বন্ধ। কোনও খবর জানার উপায় নেই। ইংলিশ লীগের আপডেট, শেয়ার মার্কেটের সূচক, সিরিয়ার অভুক্ত শিশু, ইয়েমেনের বোমা হামলা, ইউরোপের আবিষ্কার আমরা কিছুই জানলাম না। ভালো লাগবে? চলবে জীবন? তাইতো সংবাদ-কর্মীদের কোনো নিজস্ব জীবন নেই। ছুটি নেই, উইকএ্যন্ড নেই, ভয়ডর নেই এমনকি অসুখ বিসুখও হতে নেই। কারণ সংবাদ কর্মীরা কাজে না গেলে,থেমে যায় পৃথিবী, পিছিয়ে পড়ি আমরা। তাইতো তারা  ব্রত নিয়েছেন আমাদের হারতে দেবেন না কোনোভাবেই।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ