শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

আকর্ষণীয় স্থাপত্যশিল্পে নির্মিত দোলেশ্বর হানাফিয়া মসজিদ

মুহাম্মদ নূরে আলম : দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই ছড়িয়ে ছিটিতে আছে নান্দনিক, ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক নানান মসজিদ। মিনার, গম্বুজ ও নানান নকশার ভিত্তিতে তৈরি এক নান্দনিক মসজিদ। এই মসজিদের আছে বহু পুরনো ইতিহাস। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ নিয়েই আজকে আলোচনা। মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে দোলেশ^র হানাফিয়া মসজিদ বা আয়না বা কাচেঁর মসজিদ। দুর্দান্ত স্থাপত্যশৈলী, গঠন এবং সৌন্দর্যের এই মসজিদটি ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপত্যের একটি। অনবদ্য ডিজাইনশৈলী এবং দেশীয় সংস্কুতি ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে আছে যে মসজিদ। ব্যতিক্রমধর্মী নান্দনিক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদের নকশা করেছেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার প্রাপ্ত স্থাপত্যবিদ কাসেফ মাহবুব চৌধুরী। মূল পুরাতন মসজিদের সাথের বর্ধিত অংশ অত্যন্ত চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। সুন্দর এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে আসেন এখানে।

১৮৬৮ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন দারোগা আমিনউদ্দীন আহম্মদ। তাই এটি পরিচিত ছিলো ‘দারোগা মসজিদ’ নামেও ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন এই মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু ইতিহাস আর ঘটনার সাক্ষী। বাংলা ১২৭৫ (ইংরেজি ১৮৬৮; হিজরি ১২৮৫) সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন দারোগা আমিনউদ্দীন আহম্মদ। তাই এটি পরিচিত ছিলো “দারোগা মসজিদ” নামেও। তার ছেলে মইজ উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন মসজিদের প্রথম মোতোয়ালি।

বংশ পরম্পরায় মসজিদটির নির্মাণ ও সংস্কার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। খিদির বক্স-কাদের বক্স নামে দুই সহোদর এবং মইজ উদ্দিনের পরিবার। কাদের বক্সের দৌহিত্র সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক হামিদুর রহমান ১৯৬৮ সালে মিনারসহ মসজিদটির বর্ধিতাংশ নির্মাণ করেন। 

পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবং মূল অবকাঠামো অক্ষুণœ রেখে মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার করেন অধ্যাপক হামিদুর রহমানের ছেলে বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। স্থানীয়দের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার পর্যটকরা কেরানীগঞ্জে গেলে একবার দেখে আসেন মসজিদটিকে। প্রায় দুইশ’ বছরের পুরনো মসজিদটির পুরনো আদল সম্পূর্ণরূপে ঠিক রেখে সুনিপুণ হাতে পুনর্র্নিমাণের কাজ করেছেন স্থপতি আবু সাঈদ এম. আহমেদ। 

স্থাপত্য শৈলী: মসজিদটি এমন ভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে, যার ভেতরে বসেই যেমন ঝকঝকে রোদের দেখা মিলবে, তেমনি ঝম ঝম বৃষ্টিতে এখানে বসেই বর্ষার দারুন আবহ উপভোগ করা যাবে। ভবনটিতে এমন ভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার ফলে যে কোন ঋতুতেই মসজিদটির ভিতরের তাপমাত্রা থাকবে প্রায় অপরিবর্তিত। 

 মসজিদটির আলো প্রবেশের পথ এবং ভবনের ছাদের বৈচিত্র্য নিমার্ণ শৈলীর কারণে আয়না ছিদ্র করে আলো প্রবেশের ব্যাবস্থা এবং একই সাথে আলো নান্দনিক আলো ছায়ার খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার ফলে দিনের বেলা এখানে কখনোই কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন পরবে না নান্দনিক এই মসজিদ ভবনটি। মসজিদের পাশা পাশি এখানে একটি মক্তব চালু করা হয়েছে। মসজিদটির নির্মাণ শৈলী সুলতানি স্থাপত্য রীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। এবং সনাতন পদ্ধতির ইটের ব্যাবহারের সাথে সমকালীন স্থাপত্য রীতি মিশ্রিত হয়েছে। মসজিদটির সিলিং এর ফুটোগুলো ঠিক যেন আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তারার মেলা। ন্যাচারাল লাইট আর ভেন্টিলেশনের এত চমৎকার কাজ। 

মসজিদটি সম্পুর্ন ইটের তৈরি, কোন রঙ বা প্লাস্টারের কাজ এখানে করা হয়নি। লাল ইটের ছিদ্রযুক্ত দেয়াল তৈরী করা হয়েছে যা প্রাচীন মসজিদের জালির প্রতিনিধিত্ব করছে।

বিভিন্ন দরজা ও জানালার অনুপাত এবং বিন্যাসও নেয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অনুকরনে। এর স্থাপত্যের বিশেষ দিক হলো, এর বায়ু চলাচলব্যবস্থা ও আলোর চমৎকার বিচ্ছুরণ মসজিদের পরিবেশকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। 

সরাসরি আলো প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে কিন্তু পুরো নামাজ কক্ষই থাকবে আলোকিত। এজন্য চারদিকে রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মসজিদের স্থপতি আবু সাঈদ এম. আহমেদ মসজিদটির বিশেষত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন-মসজিদটি তৈরি হয়েছে একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। 

প্রচলিত মসজিদগুলোর ধরন থেকে আলাদা। পরিবেশবান্ধব এবং আলো-বাতাসের বিষয়টি মাথায় রেখে এর ডিজাইন করেছি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবহাওয়াসহ নানা বিষয় মাথায় রেখে এর নির্মাণ করা হয়েছে। আর ব্যবহৃত সব উপকরণই স্থানীয়। 

কিভাবে যাবেন: জুরাইন রেল গেইট (পোস্তাগোলা ব্রিজ এর কাছে) থেকে সিএনজিতে দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ