শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মশাতেই কাবু ঢাকাবাসী

ইবরাহীম খলিল : গত ডেঙ্গু মওসুমে মশার ভয়াবহতা রাজধানীবাসীর মধ্যে যে ভয় ঢুকিয়েছিল, তা এখনো কাটেনি বলা যায়। এর মধ্যে ফের রাজধানীতে বেড়ে গেছে মশার উপদ্রব। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নগরজীবন। মশার এই উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে তাড়া করছে মশাবাহিত রোগের ভয়। বিশেষ করে কিউলেক্স মশা বেড়ে যাওয়ায় ভয়ের মধ্যে রাজধানীবাসী। অনেকেই বলছেন যে মশাতেই কাবু রাজধানী ঢাকাবাসী। 

গত মওসুমে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে লাখো মানুষ চিকিৎসা নেন। ওই ভয়াবহতার কারণে সেই মওসুমে মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে তৎপর হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নগরের দুই ভাগেই মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যায়। সেজন্য জানুয়ারির শেষ দিক থেকে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। আর এখন পরিস্থিতি আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। ফলে নগরবাসী দিন পার করছেন গত মওসুমের ভয়াবহতা ভেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার পাশাপাশি ইদানীং কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে ঢাকায়। কার্যকর পূর্ব প্রস্তুতি না নিতে পারলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সেজন্য মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। যদিও এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনের পদ্ধতি ভিন্ন ধরনের। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন এক্ষেত্রে টেকসই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। নইলে আসছে মওসুমে নগরবাসীর কপালে দুর্ভোগ আছে।

দুই সিটিতেই মেয়র আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী যথাক্রমে আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপস।  শপথানুষ্ঠানেই খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের মশা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঢাকায় যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন। মশার উপদ্রব কমাবেন। ক্ষুদ্র প্রাণী হলেও মশা কিন্তু খুব শক্তিশালী প্রাণী। মশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। তা না হলে মশা কিন্তু আপনার ভোট খেয়ে ফেলবে। কিন্তু সেই মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী।। 

রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, গত মওসুমে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নেয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে রাজধানীবাসী। বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি তখন এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না। ইদানীং মশার উপদ্রব আবারও বেড়ে গেছে। এতই বেড়েছে যে, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশা কামড়াচ্ছে। কোথাও শান্তি নেই। দিন নেই, রাত নেই সব সময়ই মশার উৎপাত।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন খুব বুলি আওড়াচ্ছে যে, তারা নাকি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগই আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। আমাদের আশ-পাশের এলাকার কেউ বলতে পারবে না যে, তারা গত কিছুদিনের মধ্যে কোনো মশক নিধনকর্মীকে ওষুধ ছিটাতে দেখেছে। তাদের দেখাই পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে মশার উৎপাত এত বাড়ে যে মশারি ছাড়া টেকাই যায় না। কিন্তু মশারির মধ্যে আর কত সময় থাকা যায়? কর্তৃপক্ষের উচিত, নগরবাসী যেন গতবারের মতো না ভোগে, সেই ব্যবস্থা নেয়া।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা কাউছার আলী বলেন, মশার যন্ত্রণা আমরা বড়রা তাও কিছুটা সহ্য করতে পারলেও বাসায় ছোট বাচ্চারা এটা কীভাবে সহ্য করবে? মশা প্রতিদিন কামড়ে ছোট বাচ্চাদের হাত-পা-শরীর লাল করে ফুলিয়ে তুলছে। তাদের আর কতক্ষণ মশারির মধ্যে রাখা যায়। অ্যারোসল বা মশার কয়েল দিলে তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হয়ে যায়। তাই বাচ্চাদের নিয়ে পড়েছি মহাভোগান্তিতে। আমরা সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা, সিটি করপোরেশন তাহলে আমাদের জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছে? এভাবে আমরা আর কতোদিন সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে থাকবো?

বাড্ডার চা-দোকানী মকলেছুর রহমান বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে ২-৩টা কয়েল একসাথে জ্বালাতে হয়। তবু মশার উৎপাত কমে না। আমিসহ সব কাস্টমারকে মশা ঘিরে ধরে। ইদানীং এতো মশা হয়েছে যে কেউ ৪-৫ মিনিটও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না দোকানে। আর মশা মারার জন্য সিটি করপোরেশনের কোনো লোককেও দেখা যায় না। যে কারণে ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই মশার যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে আমাদের।

রাজধানী ঢাকায় গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। আর মশা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মার্চ মাস পর্যন্ত মশার ঘনত্ব বেড়ে চরমে পৌঁছাবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য জানিয়ে বলা  হয়, গত জানুয়ারির শেষের দিকে দেখা যায়, মশার ঘনত্ব অন্য সময়ে যা থাকে তার চেয়ে চারগুণ বেশি বেড়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে শুরু করা হলে জানুয়ারিতে অন্যান্য মাসের তুলনায় চারগুণ মশার ঘনত্ব পাওয়া গেছে। 

মশার ঘনত্ব কেমন বাড়ছে সেটা জানতে ঢাকার উত্তরা, খিলগাও, শনির-আখড়া, শাঁখারিবাজার, মোহাম্মদপুর ও পরীবাগসহ ছয়টি এলাকার নমুনা নিয়ে গবেষণা চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ছয়টা জায়গাতে গড় ঘনত্ব প্রতি ডিপে (মশার ঘনত্ব বের করার পরিমাপক) ৬০টিরও বেশি। যেখানে অন্যান্য সময় পাওয়া যায়  ১৫-২০টি।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কবিরুল বাশার বলেন, এই সময়ে যে মশা দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে ৯৯% হচ্ছে কিউলেক্স মশা। যেটি আসলে এডিস মশা নয়। তিনি জানান, এই মশা সাধারণত পঁচা পানিতে হয়। নর্দমা, ড্রেন, ডোবা, বিল ঝিলে পানি এখন পঁচে গেছে। সেই সাথে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে এবং পানি বহমান না থাকার কারণে কিউলেক্স মশার জন্মানোর হার বেড়ে যায়। শীতের শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে প্রকৃতিতে যে মশার ডিম থাকে সেগুলো একযোগে ফুটে যায়। যার কারণে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে মশার ঘনত্ব বেড়ে যায়। কিউলেক্স মশার কামড়ে অনেক সময় গোদ রোগ হয়। যেটাকে ফাইলেরিয়াসিস বা এলিফ্যান্টিয়াসিসও বলা হয়। এটি হলে হাত পা ফুলে বড় হয়ে যায়।

অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন যে, মশা মারতে বা তাড়াতে এর আগে কয়েল এবং অ্যারোসল স্প্রে ব্যবহার করা হলে তা কাজ করতো। তবে ইদানীং কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করলেও মশা তাড়ানো যাচ্ছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. কবিরুল বাশার বলেন, নির্দিষ্ট কোন একটি কীটনাশক একটানা পাঁচ বছরের বেশি ব্যবহার করা হলে মশা সেই কীটনাশকের বিপক্ষে সহনশীলতা তৈরি করে।

এই প্রক্রিয়ায় ওই কীটনাশকের প্রতি সহনশীল হওয়ায় সেটি আর কাজ করে না। আর এজন্যই মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতি পাঁচ বছর পর পর কীটনাশক পরিবর্তন করা দরকার। মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে র‌্যাপিড অ্যাকশনের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। এর আওতায় সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি জায়গায় যেখানে পানি রয়েছে সেখানে একযোগে লার্ভা নিধনের ওষুধ দেয়া ছিটিয়ে দিতে হবে। সেই সাথে জনগণের সহায়তা বিল-ঝিল-ডোবা-নর্দমা পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এসব স্থানেই মশা বেশি জন্মায়। আর প্রাপ্ত বয়স্ক মশা দমনে ফগিং করতে হবে। এই অভিযান শুরু করার পর তিন দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। যাতে মশা আবার ডিম পাড়ার সুযোগ না পায়।

এছাড়া স্থায়ীভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সারা বছরব্যাপী সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। যার মধ্যে প্রথমেই পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অর্থাৎ আশপাশের পরিবেশ বা জলাশয় পরিষ্কার ও দূষণমূক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ। এক্ষেত্রে যেসব প্রাণী প্রাকৃতিকগতভাবেই মশা খেয়ে থাকে সেগুলো যেমন গাপ্পি ফিস, ব্যাং, ড্রাগন ফ্লাই-এগুলো ব্যবহার করতে হবে। এগুলোকে প্রকৃতিতে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়টি হচ্ছে কীটনাশক। দুই ধরণের কীটনাশক রয়েছে যাদের মধ্যে এক ধরণের কীটনাশক লার্ভা ধ্বংস করে এবং অন্যটি পূর্ণ বয়স্ক মশা মেরে ফেলতে ব্যবহার করা হয়।

আর চতুর্থটি হচ্ছে, মশা নিধন কর্মযজ্ঞে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। শুধু কোন একটি কর্তৃপক্ষ বা সিটি কর্পোরেশনের একার পদক্ষেপে মশা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। এর জন্য জনগণের সচেতনতা এবং অংশগ্রহণ দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ