শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

করোনার এক বছরে ঢাকা বিভাগেই মৃত্যু ৪ হাজার ৭৩৫ জনের

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : চলতি বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ইতোমধ্যে করোনা কেড়ে নিয়েছে বুদ্ধিজীবী, লেখক, ব্যবসায়ীসহ দেশের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বকে। দেশে গত এক বছরে করোনায় মারা যাওয়া ৮ হাজার ৪৬২ জনের মধ্যে ৪ হাজার ৭৩৫ জন ঢাকা বিভাগের। ২০২০ সালের ৮ মার্চ একদিনে প্রথম তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে দুজন বিদেশফেরত, অন্যজন দেশে থাকা তাদের পরিবারের এক সদস্য। এরপর প্রথম শনাক্তের ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম মৃত্যু ঘটে রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগে। এরপর থেকেই প্রতিদিন শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছরের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল। ২ জুলাই একদিনে চার হাজার ১৯ জন আক্রান্ত হন। আর জুন মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল। ৩০ জুন একদিনে সর্বাধিক মৃত্যুর রেকর্ড হয় ৬৪ জন।

বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুসারে করোনায় মোট মৃতের প্রায় ৭৪ শতাংশের বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। তবে শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগেই মোট মৃত্যুর ৫৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়। আক্রান্ত মোট রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণে সুস্থ হয়ে উঠেছেন পাঁচ লাখ তিন হাজার তিনজন।

দেশে গত এক বছরে মারা যাওয়া ৮ হাজার ৪৬২ জনের মধ্যে তাদের মধ্যে পুরুষ ৬ হাজার ৩৯৮ জন (৭৫ দশমিক ৬০ শতাংশ) ও নারী দুই হাজার ৬৫ জন (২৪ শূন্য ৪০ শতাংশ)। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৭১২ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এছাড়াও ২ হাজার ৯৪ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৯৫৮ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৪২৪ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, ১৭৩ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, ৬৪ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ৩৭ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের কম।

এর মধ্যে ৪ হাজার ৭৩৫ জন ঢাকা বিভাগের, ১ হাজার ৫৫৯ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৪৮১ জন রাজশাহী বিভাগের, ৫৬৩ জন খুলনা বিভাগের, ২৫৪ জন বরিশাল বিভাগের, ৩১১ জন সিলেট বিভাগের, ৩৬৩ জন রংপুর বিভাগের এবং ১৯৬ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

দেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার ঠিক এক বছরের মাথায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেল। বছর শেষে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৩৩০ জনে। আর মৃতের মোট সংখ্যা পৌছছে ৮ হাজার ৪৬২ জনে। সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা ৫ লাখ ৩ হাজার ৩ জন। গতবছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়, তিন মাস পর ১৮ জুন তা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর ঠিক এক মাস পর ১৮ জুলাই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখে। এর পরের এক লাখ রোগী শনাক্ত হয় এক মাস নয় দিনে, ২৬ অগাস্ট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়ায় তিন লাখ। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়ে যায় এর দুই মাস পর, ২৬ অক্টোবর। ৫৫ দিন পর গত ২০ ডিসেম্বর তা পাঁচ লাখে পৌঁছায়। এর পরের ৭৭ দিনে শনাক্ত রোগীর  তালিকায় যুক্ত হল আরও ৫০ হাজার নাম। এর মধ্যে গত ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চলতি বছর ২৩ জানুয়ারি তা আট হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন এক দিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু। অজানা এ রোগ নিয়ে সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী এ রোগের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপদ্ধতি ও কার্যকর ওষুধ সম্পর্কে তখনও অস্পষ্টতা থাকায় শুরুর দিকে করোনা রোগীর চিকিৎসায় হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানে বিশেষায়িত হাসপাতাল, প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, নমুনা পরীক্ষার ল্যাবরেটরি না থাকা, নমুনা পরীক্ষার কীটের অপ্রতুলতা, এন-৯৫ মাস্ক সংকট ও হাইফ্লো অক্সিজেন মেশিনসহ নানান কারণে কোথাও সুচিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হয়। শুরুর দুই-তিন মাস করোনা আতঙ্ক এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক পরিবারের সদস্যরা ভয়ে আপনজনকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ফেলে রেখে গেছে। মৃত্যুর পর লাশ দাফন পর্যন্ত করতে যায়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে নমুনা পরীক্ষার কীট সংগ্রহ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে করোনা শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাবরেটরি চালু করা, প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্সসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল তৈরির মাধ্যমে মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভীতি দূর হয়। ধীরে ধীরে কমতে থাকে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা, যা আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। ইতিমধ্যেই করোনা টিকাদান শুরু হয়েছে। ৫০ লাখের বেশি মানুষ করোনা টিকা গ্রহণের জন্য নিবন্ধনও সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ টিকা নিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে চলতি ২০২১ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজধানীসহ সারাদেশে ৪১ লাখ ৪৬ হাজার ২০৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারে করোনা রোগীর সংখ্যা ১ জুন ৫০ হাজার, ১৮ জুন একলাখ, ১ জুলাই একলাখ ৫০ হাজার, ১৭ জুলাই দুই লাখ, ২৫ আগস্ট তিন লাখ এবং ২০ সেপ্টেম্বর রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে তিন লাখে উন্নীত হয়। গত বছরের ২০ জুলাই একদিনে সর্বোচ্চ চার হাজার ১৯ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ৩৩তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩৯তম অবস্থানে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় গত এক বছরে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৩১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৪টি। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে ৯ লাখ ৬১ হাজার ৫৭১টি। গড় অনুসারে দৈনিক শনাক্তের হার ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ, মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ। সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৪০ শতাংশ, মৃত্যুহার ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বের মতো স্থবির হয়ে পড়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-। সরকার সাধারণ ছুটি তথা ‘লকডাউন’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ফলে বহু মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়ে অগণিত মানুষ। বস্তুত করোনা বাড়িয়ে দিয়েছে দরিদ্র মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ। করোনার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমে। একটি বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক এবং পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষাও নেওয়া সম্ভব হয়নি করোনা পরিস্থিতির কারণে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার এক বছর পর দেশের জনজীবনে একটু একটু করে প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করেছে। ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করেছে অর্থনীতি, যদিও বিপর্যয় কাটেনি এখনো। বিশেষ করে বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানি ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আরও সময় লাগবে। করোনার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে সব খাতে এখনো এ অর্থ পৌঁছেনি। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বেরিয়ে এসেছে এ খাতের নানা অব্যবস্থা ও দুর্নীতির চিত্র।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলমগীর হোসেনের কাছে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে দেশে বর্তমানে করোনার সংক্রমণ আগের তুলনায় কম। টিকা নেয়ার পরও মুখে মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ