ঢাকা, রোববার 26 September 2021, ১১ আশ্বিন ১৪২৮, ১৮ সফর ১৪৪৩ হিজরী
Online Edition

সাদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব

মুহাম্মদ আবুল হুসাইন:

আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরের একটু বেশি। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বিবিএস এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে,  আমাদের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৬ বছর।এর মধ্যে প্রায় ত্রিশ বছরই চলে যায় ক্যারিয়ার গঠনের পেছনে।গড়ে আমাদের কর্মজীবন শুরু হয় ত্রিশ বছর বয়স থেকে।আর গড়ে আমাদের জীবনে বার্ধক্য বা অবসরে যাওয়ার সময় চলে আসে ৬০ বছর বয়সেই।তাই বলা যায়, আমরা মূলতঃ ভালভাবে কাজ করার সময় পাই ত্রিশ থেকে ৩৫ বছর।আর এই ৩০-৩৫ বছরের কর্মজীবনে আমরা যত কাজ করি তার প্রায় পুরোটাই দুনিয়ার জন্য।অর্থাৎ পার্থিব জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করার সংগ্রাম করতে করতেই আমাদের কবরে চলে যাওয়ার সময় হয়ে যায়।অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের বিত্ত-বৈভব, বাড়ি-গাড়ী, ব্যাংক-ব্যালেন্স, সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্যই আমরা যতটা ব্যাতি-ব্যস্ত থাকি; এজন্য যতটা সময় ব্যস্ত থাকি তার একশো ভাগের এক ভাগও আমরা আখেরাতের অনন্ত জীবনের জন্য ভাবি না বা এ বিষয়টি আমাদের স্মরণেই আসে না।অথচ আখেরাতের জীবনের তুলনায় আমাদের এই পার্থিব জীবন নিতান্তই তুচ্ছ।আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের নগণ্যতা বুঝাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, পরকালের তুলনায় দুনিয়ার উপমা শুধু এতটুকুই যেমন তোমাদের মাঝে কেউ নিজের একটি অঙ্গুলি সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে তুলে নিল। অতঃপর দেখ তাতে কতটুকু পানি লেগে এসেছে।’ -সহিহ মুসলিম শরিফ।

আসলে পরকালের জীবনই আসল জীবন। যে জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।অথচ আখেরাতের সেই অনন্ত জীবনের জন্য ভাবনার সময় আমাদের নেই।আমরা রাত-দিন দুনিয়ার পিছনেই ছুটছি। এমনকি সারাদিনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে আমরা যখন নামাজের জন্য দাঁড়াই তখনও আল্লাহকে আমরা খুব কমই স্মরণ করি, নামাজের মধ্যেও দুনিয়ার চিন্তাই আমাদেরকে অস্থির করে রাখে।আর এই দুনিয়ার ধান্দা করতে করতেই যখন আমাদের প্রভূর কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক আসে তখন দুনিয়ার এই সব বিত্ত-বৈভব সব কিছু মাটির উপরে রেখে আমাদেরকে মাটির নীচে চলে যেতে হয়।তখন দুনিয়ার কিছুই আমাদের সাথে যায় না, যায় শুধু আমাদের আমল।নেক বা বদ যে আমলই আমরা দুনিয়ায় করেছি তাই আমাদের সাথে যাবে। এ কারণেই বলা হয় ‘দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।’ এখানে যে আমল আমরা করেছি আখেরাতের অনন্ত জীবনে তাই আমাদের ভোগ করতে হবে।

আসলে দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগী আখেরাতের অনন্ত জীন্দেগীর কামিয়াবির জন্য একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র মাত্র।আর মৃত্যুর মাধ্যমে এই পরীক্ষা ও মানুষের দুনিয়ার জিন্দেগীর অবসান ঘটে।পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে গেলে যেমন আর উত্তর লেখার সুযোগ থাকে না, তেমনি মৃত্যু এসে গেলে আর আমলের সুযোগ থাকে না।মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দুনিয়ার জীন্দেগীর অবসান হয় এবং একই সাথে আখেরাতের অনন্ত জীবনের যাত্রা শুরু হয়।

সদকায়ে জারিয়া

তবে এমন কিছু আমল আছে, যা জীবদ্দশায় করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব ও উপকারিতার ধারা অব্যাহত থাকে। এগুলোকে সদকায়ে জারিয়া বলে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন ব্যক্তি মারা যায়, তখন তার আমলের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না। এক হল, সদকায়ে জারিয়া, দুই হল, ঐ ইলম যা দ্বারা অন্যরা উপকৃত হয়, তৃতীয় হল, নেক সন্তান যে, তার জন্য দুআ করে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৩১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৮৮০]

‘সদকা’ শব্দের অর্থ দান করা। আর ‘জারিয়া’ অর্থ অব্যাহত। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে এমন কাজ করে যাওয়া যা ব্যক্তির মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

সদকায়ে জারিয়ার কারণে মৃত্যুর পরও দানকারীর ‘সওয়াব সঞ্চয়’ সমৃদ্ধ হতে থাকে। এর স্রোতধারা তার ‘পুণ্য তরি’কে চলমান রাখে। এটা আল্লাহতায়ালার বিশেষ নিয়ামত ও রহমত। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমলের ধারা বন্ধ হয়ে গেলেও জীবদ্দশায় নির্দিষ্ট কিছু আমল করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব জারি থাকে। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের জন্য সওয়াব পৌঁছার ব্যবস্থা করে যেতে পারে এবং চাইলে তার জারি করা ভাল কাজের কারণে উপকারভোগী অন্য মানুষের মাধ্যমেও তার নেক আমলের পাল্লা ভারি হতে পারে।এ উভয় পদ্ধতিই আল্লাহতায়ালার একান্ত দয়া ও অনুগ্রহ।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, ওঠা-বসা, চলাফেরা, লেনদেন, বিভিন্ন কাজে-কর্মে অনেক ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে। এর থেকে তওবা না করে মারা গেলে নেকির পাল্লা হালকা হয়ে বান্দা বিপদে পড়তে পারে। তাইতো আল্লাহ বান্দার দুরবস্থা দূর করার জন্য মৃত্যুর পরও নেকি অর্জনের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। 

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ, এতিমখানা তৈরি, গরিব ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও হাসপাতাল নির্মাণ, পুকুর খনন, নলকূপ বসানো, পাঠাগার ও সেতু নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, মানব কল্যাণ বা সমাজসেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান গড়া, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বিস্তার প্রভৃতি হলো সদকায়ে জারিয়া।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিত্তশালী লোকদের ওপর সম্পদের জাকাত এবং ওশর ফরজ করেছেন। সেই সাথে সদকার ব্যাপারেও তাকিদ দিয়েছেন। ইসলাম জাকাত এবং ওশরের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু সদকার ব্যাপারে কোনো সীমা বেঁধে দেয়নি। এ জন্য যে, এর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে মজবুত অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। অপর দিকে সদকার ব্যাপারে ধনী-দরিদ্রের কোনো শর্ত নেই। সবাই সদকা করতে পারেন। তাই সদকা করা বিশেষত সদকায়ে জারিয়ার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। 

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ