বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির  আকাশ দেখা

সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ বত্রিশ ॥

ভাবনার গলিপথে শুকনো পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আগে বাড়তে গেলেই মচমচ করে উঠছে। আব্বার কিসসা কাহিনী শুনে আশার সূতায় টান পড়লো। তবে কি চন্দ্রনাথের সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ হবে না। হতাশা দৌড়ঝাপ করছে চারপাশটায়। আব্বা বললেন এতে মন খারাপের কি আছে। কতো চন্দ্রনাথ যাবে আবার কত চন্দ্রনাথ আসবে। এমনটাই তো জগতের নিয়ম। দেখবে আরেক চন্দ্রনাথ চলে আসবে তোমার বন্ধু হতে। মনে হচ্ছে আমি যেনো মহা শূন্যতায় সাঁতার কাটছি। আম্মা তাকিদ দিচ্ছেন কি ব্যাপার, স্কুলের সময় যে চলে যাচ্ছে। তৈরি হতে হবে না? দুঃখ আর বেদনার দু’টি বিশাল হাত আমাকে চেপে ধরে রেখেছে। উঠতে গিয়েও টাল খাচ্ছি। চোখের মণিতে কুয়াশার উড়না উড়ছে। স্কুলে পৌঁছে দেখি রহমান আর উদয়ন অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। এমনটা হররোজই ঘটে। স্কুলের পেছনটায় ছিলো হেডস্যারের বাড়ি। লম্বা মতো একটি ঘর। তর্জার বেড়া, ছাউনিও তর্জার। সামনে উঠান। উঠানের এক কোনায় একটি তুলশি গাছ। রক্তজবাসহ বেশ কয়েক পদের ফুলগাছ। হাসির ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুল শুরু হবার আগে আর টিফিনের সময়টায় আমরা স্যারের বাসায় যেতাম আচার ঘুমনি কিনতে। হেডস্যারের বউ উঠানের এক কোনায় আচারের দোকান সাজিয়ে বসতেন। সেখান থেকে এক পয়সার আচার কোনো কোনো সময়, এক পয়সার ঘুমনি কিনতাম। এটি প্রায় রোজকার নিয়ম ছিল আমাদের। আরো কয়েকজন ফেরিওয়ালা আসতো নানান খাবার দাবার নিয়ে। স্কুল মাঠের একপাশে ওরা বসতো। সেখানেও ভিড় জমে যেতো। ঘন্টা বাজার সাথে সাথে হুড়মুড় করে সবাই স্কুলে ঢুকতাম। রামচন্দ্র পাঠশালার পড়াশোনা, খেলাধুলা আর আড্ডাফাড্ডা সব মিলেঝিলে মজাটাই ছিলো অন্যরকম, আলাদা। একদিন রহমান জানালো সামনেই নাকি একটি বড় ব গাছ। সে গাছে অনেক বাদুর ঝুলে থাকে। অনেকেই যায় সেখানে বাদুর দেখতে। এলাকাটির নাম নাকি বাদুরতলা। আমরাও ঠিক করলাম বাদুরতলা যাবো। আমি তখনো বাদুর কি রকম জানি না। বাদুর পাখি না পশু, কে জানে। 

একদিন ঠিকঠিকই টিফিন প্রিয়ডে বাদুরতলা গেলাম আমি উদয়ন আর রহমান। রামচন্দ্র পাঠশালা থেকো মিনিট ছয় সাতেকের পথ। কান্দিরপাড় পৌঁছে বামদিকে ঘুরলেই দেখা যায় বিশাল বটগাছ। এ এলাকাটির নামই নাকি বাদুরতলা। 

আমরা যখন বাদুরতলা গিয়ে পৌঁছলাম সময়টা তখন দুপুরের কাছাকাছি। একটি বিশাল বটগাছ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পাতা আর ডালের ফাঁক-ফোকড়ে নজর ঘুরিয়ে আনলাম কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুরের দেখা মিললো না। আমরা রহমানকে জিজ্ঞেসে করলাম বাদুর কই। বাদুর তো দেখছি না তেমন। তুইনা বলেছিলি শত শত বাদুর। রহমানও বোকা বনে গেলো। আমাদের উশখুশ অবস্থা  দেকে পাশের দোকানের একলোক এসে বললেন খোকারা তোমরা কি খুঁজছো। আমি  আগবাড়িয়ে বললাম আমরা বাদুর খুঁজছি। নাম বাদুরতলা কিন্তু গাছে তেমন বাদুর নাই ব্যাপার কি? লোকটি হেসে জানালেন এ সময়টাতে তো বেশি বেশি বাদুর দেখা  যাবে না। বাদুর দেখতে চাইলে সন্ধ্যার আগে আগে আসতে হবে। আসরের পর থেকে বাদুর ওড়াউড়ি শুরু হয়। মাগরিবের পর থেকে বাদুরে  বাদুরে গাছের ডালপাতা সব ঢাকা পড়ে যায়। তখন এসো অনেক অনেক বাদুর দেখতে পাবে। আমরা একজন আর একজনের চোখে চোখ রাখলা। তিনজনেই বুঝলাম ভালোভাবে কোনো কিছু না জেনেশোনে করতে নেই। বোকা বোকা চেহারা নিয়ে রামচন্দ্র পাঠশালার পথে হাঁটতে লাগলাম। রহমান মনমরা হয়ে থাকলো কতক সময়। ওর কি দোষ! সে তো জানে না কখন বাদুর আসে আবার কখন উড়াল দেয়। তার ভাবনা, নাম যখন বাদুরতলা বাদুরতো থাকতেই হবে। কিন্তু কান্ড ঘটলো উলটা। বাদুর তো রাতে চলাফেলা করে সে খবর আমাদেরও জানা ছিল না।                         (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ