শুক্রবার ০৭ মে ২০২১
Online Edition

ভারত থেকে আরো বিদ্যুৎ আমদানি করতে চায় সরকার

স্টাফ রিপোর্টার : একদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়েছে অন্যদিকে ব্যয়বহুল এলএনজির কারণে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার। সেক্ষেত্রে  এসব কারনে  প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আরও বিদ্যুৎ আমদানি করতে চায় সরকার। দেশে চাহিদার চেয়ে উৎপাদনক্ষমতা বেশি থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও বিতরণে ভুল নীতি-পরিকল্পনার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে,  ২০১৩ সালের অক্টোবরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা গ্রিডলাইন হয়ে বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুৎ রপ্তানি করে ভারত। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে দৈনিক ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। গত ছয় বছরে এ আমদানি বাবদ ১৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা খরচ করেছে পিডিবি।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সরকার ভুল নীতি গ্রহণ করেছে। তার মাশুল দিতে হচ্ছে জনগণকে। ভবিষ্যতে আরও বিপর্যয় নিয়ে আসবে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণনীতি এবং প্রক্রিয়া কোনোভাবেই আদর্শ অবস্থায় নেই।’
পেট্রোবাংলা এবং পিডিবি সূত্র জানায়, দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করছে সরকার। দেশজ প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলএনজি মিশিয়ে যে পরিমাণ গ্যাস পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে তার অর্ধেকের বেশি অংশ ব্যবহার করছে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলো। একদিকে ব্যয়বহুল জ্বালানি থেকে উৎপাদন, অন্যদিকে ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেশের জ্বালানি অর্থনীতিতে বড় সংকট তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে পিডিবিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করাকে ভালো বিকল্প মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, আমদানিকৃত প্রতি ঘনফুট এলএনজির বর্তমান দাম প্রায় ২৭ টাকা। আর পিডিবির কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে চার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ঘনফুটে মূল্যঘাটতি ২৩ টাকা। পিডিবি চার টাকা মূল্যে গ্যাস পেয়েও ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও গুরুত্বসহ বিবেচনায় রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২১ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট। কয়েকটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আগামী দুই বছরের মধ্যে আরও সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গড় চাহিদা দৈনিক সাড়ে ৯ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। অর্থাৎ বিদ্যুতের মোট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহূত হচ্ছে না।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিভিন্ন উৎস জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমদানি আরও বাড়বে। তবে তা শুধু ভারত থেকেই নয়, নিকটবর্তী অন্য দেশ থেকেও হতে পারে। সরকারের সে পরিকল্পনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। ভবিষ্যতে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র আসবে, সেগুলোর জন্য আরো ১ হাজার ৪৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের একটি চাহিদাপত্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ দেশীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি শিগিগরই হচ্ছে না।
বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৭৯টি। এগুলোর মধ্যে সরকারি ৩৭টি, আইপিপি ২৯টি এবং রেন্টাল কেন্দ্র ১৩টি। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের অনুমোদিত লোড ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ১ হাজার ২৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এদিকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে সকল সিডি, ট্যাক্স ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতি চেয়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক কারণে বা ভারতীয় আইন পরিবর্তন হলে যদি কোন আর্থিক ক্ষতি হয় তবে তা কীভাবে মেটানো হবে তাও জানতে চায় বাংলাদেশ। সম্প্রতি ঢাকায় বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির ১৯তম সভা হয়েছে। সভায় দুদেশের বিদ্যুতের চলমান কর্মকাণ্ড নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি নির্দেশিকা পর্যালোচনা করা হয়। সভায় ভেড়ামারা ও বহররমপুর আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনার পাশাপাশি এর ২য় ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এসময় প্রস্তাবিত কাটিহার-পার্বতীপুর-বরানগর ৭৬৫ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। নেপালে উৎপাদিত জল বিদ্যুৎ ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে আমদানির অগ্রগতি এবং ভুটানে জল বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এছাড়া সভায় রামপালে বাস্তবায়নাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় বিদ্যুৎ সচিব মো. হাবিবুর রহমান এবং ভারতের বিদ্যুৎ সচিব সঞ্জীব নন্দন সাহাই দুই দেশের নেতৃত্ব দেন।
এর আগে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৯তম সভা ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটি ও জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৮তম সভা গত বছর মার্চ মাসে ভারতে হয়। কমিটির পরবর্তী সভা জুলাই মাসে ভারতে হওয়ার কথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ