শনিবার ১৯ জুন ২০২১
Online Edition

‘নক্ষত্র বিভাব’ জাতিসত্তা ও শেকড় সন্ধানের প্রয়াস

 

মীম মিজান: তরুণ মননশীল লেখক সীমান্ত আকরামের মননশীলতার পরিচয়ের প্রথম নিবন্ধগ্রন্থের নাম ‘নক্ষত্র বিভাব’ । গ্রন্থটি আমাদেরকে জাতিসত্তা জানার ও শেকড়ের সন্ধানে প্রয়াসী করে। বইমেলা ২০১৭ তে সাহিত্যকাল প্রকাশনী থেকে মোট ১৫টি নিবন্ধের সমন্বয়ে গ্রন্থটি প্রকাশ হযেছে। প্রসঙ্গ কথার পর বাংলা সাহিত্যের চিরভাস্বর কবি নজরুলকে নিয়ে তিনটি লেখা স্থান পেয়েছে। প্রথম নিবন্ধটির নাম হল ‘কুমিল্লায় নজরুল: বিচিত্র জীবনের খ-িত অংশ’ এই নিবন্ধে জাতীয় কবির জীবনের দু’জন নারী আশালতা সেনগুপ্ত ও নার্গিসের সঙ্গে প্রেম-প্রণয় ঘটনা বিবৃত হয়েছে। নজরুল তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় এখানে কাটিয়েছেন। প্রকৃতির সাথে মিশেছেন। মিশেছেন সবার সাথে। এ বিষয়গুলো এসেছে এ নিবন্ধে। দু’জন নারীর জন্য নজরুলের কাব্য করা, চিঠি লেখা ইত্যাদি তুলে ধরেছেন লেখক। 

দ্বিতীয় নিবন্ধে সীমান্ত আকরাম নজরুলের সাহিত্য সম্ভারে ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের নিষ্কলুষ উৎসব ঈদ নিয়ে কাব্য, পঙ্ক্তি, গল্প, কাব্য, নাটক ইত্যাদি বিষয়ে। ‘নজরুল সাহিত্যে ঈদ ভাবনা’ শিরোনামের এ  চমৎকার ও পরিশ্রমী নিবন্ধে আকরাম নজরুলর সাহিত্যভা-ারের গহীনে সাঁতার করে সেই কবিতা, গল্প, নাটক ও সংগীতের উদাহরণ দিয়ে তার নিবন্ধটিকে করেছেন ঋদ্ধ।

নজরুলকে নিয়ে তৃতীয় নিবন্ধটির শিরোনাম ‘নজরুলের নাট্যচর্চা’। নজরুল যে শুধুমাত্র একজন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সংগীতকারক নন তিনি যে সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় সফল পদচারণা করেছেন তার অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ তার নাট্যসাহিত্য। স্বল্প পরিসরে আকরাম নজরুলর নাট্যাবদানের মূল্যায়ন করেছেন।

বাংলাদেশের পল্লীকবি জসিমউদদীনের গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন আকরাম। তাইতো তিনি পল্লীকবির গানে আবহমান বাংলার চিত্ররূপ নিয়ে নিবন্ধে পল্লী গায়ের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের, সব ধর্ম-জাতির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আবহমান সংস্কৃতির চিত্রকল্প এঁকেছেন। এ নিবন্ধ পাঠে পল্লীকবির গানের সমাহারে বিহার হয়।

বিপ্লবী ও ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখের ইসলামী গানের অবদান নিয়ে ‘ইসলামী গানের ভুবনে কবি ফররুখ আহমদ’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সাহিত্যকর্ম আলোচনার পরেই ইসলামী গান নিয়ে আলোচনা করেছেন আকরাম। 

বাংলাদেশের একসময়কার বিখ্যাত কন্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দিনকে নিয়ে আকরাম একটি নিবন্ধ স্থান দিয়েছেন তার এ গ্রন্থের ষষ্ঠতম নিবন্ধে। শিরোনাম বলা যেতে পারে ‘দরদী গানের মরমী কন্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দিন’। নিবন্ধে নিবন্ধকার শিল্পীর কিয়দংশ পরিচয় টেনে তাঁর গান নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। সত্যই নিবন্ধকার তার এ নিবন্ধে আব্বাসউদ্দিনের গানের আলোচনা করে তার পাঠকদের কাছে শিল্পীকে সম্যকরূপে উপস্থাপন করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাহিত্যিক তিতাশ চৌধুরীকে নিয়ে তিনি তার সপ্তম নিবন্ধটি লিখেছেন। বর্তমান বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি আল মাহমুদকে নিয়ে গ্রন্থটির অষ্টম নিবন্ধে নিবন্ধকার কবির কাব্য থেকে ছত্র উল্লেখপূর্বক তাঁকে আধুনিক চিত্রকল্পের কবি হিসেবে প্রমাণ করার প্রয়াস করেছেন। যা সফল হয়েছে বলে মনে করি। এখানেও নিবন্ধকার আল মাহমুদের জীবনী ও সাহিত্যকর্ম সংক্ষিপ্তভাবে তুলে এনেছেন।

আমাদের সাহিত্যাঙ্গন ও শিক্ষিত মহলে উপেক্ষিত বিদ্যুৎসাহী ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে নিয়ে নবীন এ নিবন্ধকার আমাদেরকে সচেতন করেছেন। জানিয়েছেন ফয়জুন্নেছার নারীশিক্ষায় বিদ্যুৎসাহীতা ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। জনহিতৈষীণি ফয়জুন্নেছার প্রায় সমগ্র জীবনী তুলে এনেছেন। তাঁর মতো সমাজকর্মীর জীবনী বেশি বেশি আলোচিত হওয়া সময়ের দাবি।

আমাদের বাংলাভাষার প্রখ্যাত প্রেমিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সূর্যসন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে আকরাম দশম নিবন্ধটি লিখেছেন। শিরোনাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রস্তাবক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’। এরপরের নিবন্ধটি কুমিল্লার সন্তান সংগীত জগতের নক্ষত্র শচীন দেব বর্মণকে নিয়ে। ‘সংগীতের মহারাজা শচীন দেব বর্মণ’ শীর্ষক নিবন্ধে নিবন্ধকার বর্মণের জীবনী ও সঙ্গীত নিয়ে লিখেছেন। নিবন্ধের শেষে শচীন বর্মণের গানের শিরোনামগুলো লিখেছেন। বর্মণের পরেই আরেকজন গানের মানুষ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন আকরাম।

অন্যান্যদের মতো এখানে আলাউদ্দিন খাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও গানের আলোচনা আছে। পল্লী উন্নয়নের রূপকার আখতার হামিদকে নিয়ে ত্রয়োদশ নিবন্ধটি। চতুর্দশ নিবন্ধটিতে কবি ও কণ্ঠশিল্পী মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা ও গান নিয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে। মল্লিকের গান যে, মানুষকে বিশুদ্ধতার দিকে টানে সে বিষয়টি গানের উদ্ধৃতিসহ লিখেছেন নিবন্ধকার। সর্বশেষে নিবন্ধটি কবি, কন্ঠশিল্পী,  গীতিকার ও হস্তশিল্পী গোলাম মোহাম্মদকে নিয়ে। গোলাম মোহাম্মদের গানের অভ্যন্তরে যে শাশ্বত সত্যের আহবান সেটি নিবন্ধকার উপস্থাপন করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা ও মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদীর একটি প্রসঙ্গ কথা দিয়ে শুরু হওয়া নিবন্ধ গ্রন্থটি কবি আল মাহমুদকে উৎসর্গ করেছেন গ্রন্থকার। শেষাংশে তথ্যসূত্র যোগ করে নিবন্ধের তথ্যের ব্যাপারে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। গ্রন্থটির বেশ কয়েক জায়গায় বানান জনিত ক্রুটি লক্ষিত হয়েছে। কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ব্যক্তিগণই অধিকাংশ জায়গাজুড়ে স্থান পেয়েছেন। সার্বজনীনতার প্রশ্নে সীমান্ত আকরামকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের স্থান দেয়া উচিত।

নক্ষত্র বিভাব

প্রকাশনী: সাহিত্যকাল

প্রচ্ছদ: হামিদুল ইসলাম

মূল্য: ১৮০ টাকা

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ