শনিবার ১৯ জুন ২০২১
Online Edition

কবি মোহাম্মদ রাফিকুর রহমান : কিছু স্মৃতি

জহির-উল-ইসলাম: তিন দশক আগের কথা। তখন কলেজে পড়ি। গণিতের ছাত্র ছিলাম। পার্ট টু পরীক্ষার আর কয়েক মাস বাকি। জোর পড়াশোনা চলছে। অবশ্য পড়াশোনা বললে ভুল হবে। রাতদিন কলম চালানো। প্রবাবিলিটি, স্ট্যাটিসটিক্স, স্ট্যাটিক্স, ডিন্যামিক্স, অ্যাস্ট্রোনমি, ভেক্টর, টেনসর ইত্যাদির মধ্যে ডুবে থেকে সারাদিন টানটান টেনশন নিয়ে দিন গুজরান করছি। সমাজ-বন্ধু, আত্মীয়-পরিজন সব ছেড়ে বড় নিঃসঙ্গ জীবন। এমন নিরানন্দ জীবনে সঙ্গে পেলাম একটি টেপরেকর্ডার ও দু’তিনটি অডিও ক্যাসেট। গণিত-মগ্নতার পাশাপাশি রাতদিন ক্লান্তিহীনভাবে শুনতাম অডিওগুলি। অন্যভাবে বলা যায়, এগুলি আমাকে একাগ্রতার সাথে পড়ার টেবিলে বেঁধে রাখত। একটি সংগীত ছিল, ‘তোমার দেয়া এই দুনিয়া ঐ নীল আসমান/সাগর নদী বন-বনানী সবই তোমার দান।’ প্রাণ আকুল করা সুর আর বাণীর কারণে এ সংগীতটি আমার মন-প্রাণে এক পরম শান্তির পরশ বুলিয়ে দিত। বিশেষ করে ‘সারা জীবন সেজদা দেবার দাও প্রেম অফুরান’ লাইনটি যখন শুনতাম তখন যেন মনের কোণের সব ক্লান্তি আর আবিলতা কেটে গিয়ে সমগ্র হৃদয়জুড়ে একটা অনন্ত আধ্যাত্মিক শক্তি অনুভব করতাম। সারা দেহ-মন-প্রাণ একটা পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠত। যা ঐ সময়ের বৃত্তবদ্ধ জীবনে সামনের প্রতিকূল পথ অতিক্রম করার জন্য বড্ড প্রয়োজন ছিল বলে আজো অনুভব করি।

নিয়ম মেনে একদিন পরীক্ষা পর্বও শেষ হল। পরীক্ষা ভালই হল বলা যায়। অবরুদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে একটু মুক্তির নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছি। এমন সময় একদিন বাড়িতে রাখা পুরোনো পত্র-পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছি। কলকাতার একটা সাপ্তাহিকের সাহিত্যের পাতায় চোখ রাখতেই একটা কবিতার উপর দৃষ্টি আটকে গেল। ‘তোমার দেয়া এই দুনিয়া ঐ নীল আসমান ...’। কবির নাম মোহাম্মদ রাফিকুর রহমান। মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। অডিও-য় শত সহস্র বার শোনা আমার হৃদয় জুড়ানো গানের রচয়িতা পাশের জেলারই আমার আত্মার আত্মীয় একজন কবি! তাও আবার মফস্বলের একটা অখ্যাত গ্রামে যাঁর বাস!  তৎকালীন অর্থাৎ আশি ও নব্বুই-এর দশকে কলকাতার কাফেলা, কলম, মীযান, নতুন গতিতে প্রকাশিত তাঁর অসংখ্য কবিতা পড়েছি। অতি সাধারণ সহজবোধ্য ভাষায় অসাধারণ কবিতা লিখতেন তিনি। সেই থেকেই না দেখা এই কবি আমার সমগ্র হৃদয়-রাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন। চোখের আড়ালে থেকেও তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যিনি সর্বক্ষণ আমার হৃদয় জুড়ে ছিলেন, যাঁর অনবদ্য সৃষ্টি আমার দু’চোখে হেরার জ্যোতি এনে দিয়েছে, যাঁর রচিত ইসলামী সংগীত আমার শুষ্ক মরু-হৃদয়কে জমজমের ধারার মতো আধ্যাত্মিক রস-সুধায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার অদেখা সেই কবি রাফিকুর রহমান সাহেবের প্রতি এখন থেকে ভালোলাগা, ভালোবাসার সীমানাটা আরো বেশি প্রসারিত হল। যতদূর মনে পড়ে ঐ সময় তাঁর সঙ্গে মাত্র একজোড়া পত্র বিনিময় হয়েছিল। তারপর আর না। পার্থিব জীবনে সাক্ষাতের আগেই গত ৩০ ডিসেম্বর’২০ তিনি আমাদের ছেড়ে অনন্তলোকে চলে গেলেন। সেসময়ে প্রকাশিত তাঁর অনেক কবিতায় আজো আমার হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। মনে পড়ে বহু বছর আগে প্রকাশিত একটা কবিতায় আল্লাহর কাছে তিনি বিনম্র ভাষায় ফরিয়াদ জানিয়ে বলেছিলেন, আমাকে নেবে প্রভু তোমার ঐ অলৌকিক সাম্রাজ্যে। আল্লাহ তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করুন। জান্নাতের উচ্চতম স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন। 

রাফিকুর রহমান ছিলেন আশাবাদের কবি। জীবনটা তাঁর কাছে সোনা ভরা ফসলের মাঠ। ‘মানুষ’ নামক এক কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

‘পৃথিবীর এই মানুষ মানুষের মতো বুদ্ধিমান জীব 

ভাঙ্গেনা মুচড়ে পড়েনা কখনো সে ক্রমাগত দাঁড়িয়ে থাকে 

ঝড়ের প্রহর পার হয়ে বেড়ে উঠে বৃক্ষের মত হয় সজীব 

জীবন যেন তার ফসলের মাঠ, মুঠি মুঠি তাতে সোনা ধরে রাখে।   (মানুষ) 

তবে তাঁর চোখে পৃথিবীর সব মানুষ একরূপ নয়। আল্লাহর দেয়া এই মুক্ত আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা অনেক মানুষই আছে যারা মানুষ নামের কলংক। তাদের দৌরাত্ম্যে আলোর পৃথিবী আজ মলিন হয়ে উঠেছে। যারা পৃথিবীকে কলুষিত করে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে চাইছে সেই পাপাচারী জালেমদের দৌরাত্ম্য থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখতে স্রষ্টার কাছে কবির প্রার্থনাঃ 

      ‘প্রভু ঝড় দাও

জালেমের এই উদ্যত বাহু ভেঙে চুরে যাক। 

       প্রভু বৃষ্টি দাও

 পৃথিবীর এই পাপ ধুয়ে মুছে যাক।

                               (ভীষণ বৃষ্টি হবে) 

 

‘আমি চাই’ শীর্ষক আর একটা কবিতায় প্রভুর কাছে কবির কোমল আকুতিঃ

‘আমি চাই শ্রাবণের ভরা নদী উথাল পাথাল

নিরন্তর ঢলে যাওয়া এই ক্ষুব্ধ বানের ভিতর

তরী চাই, আমি চাই বন্যা সেই ভীষণ ভয়াল

প্লাবিত প্রান্তরে ডুবে যাতে এই পশু এই ইতর। 

      

 আমি তরী চাই তুলে নেব নুহের স্বজন

প্রভু! এ জঞ্জাল ধ্বংস কর আনো প্লাবন।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একটা নতুন সুর শোনা গেছে রাফিকুর রহমানের প্রতিটি কবিতার প্রতিটি পংক্তিমালায়। তাঁর চাওয়া-পাওয়া আশা-আকাক্সক্ষার কথা তিনি খুব সহজ সরল ভাষায় বিনম্র ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। তবে তা স্রষ্টাকে মাইনাস করে নয়। বরং তিনি ছিলেন স্রষ্টা-নির্ভর একজন বিশ্বাসী হৃদয়ের কবি। কবি ফররুখ আহমদ কিংবা আল্ মাহমুদ-এর উত্তরসূরী। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছেন, ‘তোমাকে মনে পড়লেই এই জীবন হয়ে যায় নক্ষত্র খচিত আলোর আকাশ।’ (তোমাকে মনে পড়লেই) 

১৯৫৫ সালের ৬ জুলাই মালদা জেলার তুলসিয়াঘাট গ্রামে কবির জন্ম। শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর অদম্য স্পৃহা ছিল। সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়েই তাঁর কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়। শিক্ষান্তে সনাকল কে এল এম হাই মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিবিড় সাহিত্য চর্চায় আত্মমগ্ন হন। শুধু কলকাতা নয়, আশির দশক থেকেই ঢাকার প্রথম সারির এক ডজনেরও বেশি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক কাগজে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হত। কবিতা ছাড়াও তিনি ছড়া, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর রচিত বহু জনপ্রিয় সংগীত ঢাকা থেকে রেকর্ডকৃত হয়ে বেশ কিছু অডিওতে স্থান করে নিয়েছে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ডাকছে কোথাও তিতির’ (১৯৭৭)। এছাড়াও তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, আলো হাসি ঝিলমিল, চলো বেড়িয়ে পড়ি, হুলের ছড়া ফুলের ছড়া, ইংলিশ রাইম (ছড়া), শেষ গোধূলির স্বর (ঐতিহাসিকগল্প), মূল্যবোধের প্রসারে সাহিত্য ও সাংস্কৃতির ভূমিকা (প্রবন্ধ), উদিতা সোনালী সূর্য (মহানবী স-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী)। এছাড়াও অপ্রকাশিত বইয়ের অসংখ্য পা-ুলিপি তিনি রেখে গেছেন। 

      আত্মপ্রচারবিমুখ কবি রাফিকুর রহমান ২০১৫ সালে তাঁর কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতা কেন্দ্রিক কাগজগুলোতে তাঁর লেখা খুব একটা চোখে পড়তো না। মাসিক কিংবা সাপ্তাহিক থাকাকালীন সময়ে কলমে নিয়মিত তাঁর কবিতা প্রকাশিত হলেও দৈনিক হবার পর তাঁকে আর লিখতে দেখিনি। অবশ্য ২০১৩ সালের ঈদ সংখ্যা কলমে এক মর্মস্পর্শী ভাষায় ভিন্ন আঙ্গিকে রচিত ‘মহাকাব্যের লড়াই’ শিরোনামের তাঁর একটি অসাধারণ গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। মনে হয়েছে এটা যেন তাঁর আত্মবেদনামূলক লেখা। এখানে এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, “কবি গিন্নি বলে উঠলেন, ‘আহ কাঁদছ কেন? নতুন করে আবার কী হল?’

কবি বললেন, ‘আমার যে আর কিছু নেই প্রিয়তমা। আমি এখন কী নিয়ে দাঁড়াব?’ কবি গিন্নি হতবাক হলেন। থমকে দাঁড়ালেন কিছুক্ষণ। 

তারপর বলে উঠলেন, ‘কেন তুমি আগের মতো গান লিখবে, কবিতা লিখবে। দেখছ না আমাদের জীর্ণ নীড়ে কত কবিতা আর গান বাঙময় হয়ে উঠেছে।’

কবি বললেন, ‘লিখে কী হবে?

কবি গিন্নি বললেন, ‘কেন মানুষের জন্য লিখবে। তোমার কবিতা গান সহচরের মতো মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে। মানুষের জীবন পথের দিশা দেবে। মানুষকে জীবন চলার জন্য উজ্জীবিত করবে। শত হতাশা শত সংকটে মাথা উঁচু করে পথ চলার অনুপ্রেরণা পাবে।”

..... এমন সময় বন্ধ কড়া নাড়ল কে? কে বলে উঠল, ‘কবি সাহেব আছেন?

কবি গিন্নি এই কণ্ঠস্বর চিনতে পারলেন। এই সেই প্রতারক সম্পাদক যিনি দিনের পর দিন কবিকে প্রতারণা করে চলেছেন। আর অসহায় কবি বাধ্য হয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছিলেন। 

       কবি গিন্নি ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে দরজা খুললেন, ... বললেন, ‘কবি সাহেবকে কীসের প্রয়োজন? ... সম্পাদক শিউরে উঠলেন, তবু অনেক কষ্টে বলে উঠলেন, ‘তিনি একজন প্রিয় কবি। তাঁর লেখা আমরা অনেক দিন পাইনি কি না তাই নিজেই চলে এসেছি—-।

গল্পটি পড়তে গিয়ে বার বার দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল। কবি নজরুলের কথায় জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ‘কোন বেদনায় ভুলিয়াছ তুমি ভালোবাসিবার সকল আশা। না, তা আর হয়ে ওঠে নি। 

সোসাল মিডিয়া ফেসবুকের দৌলতে ২০১৭-এর শেষ দিকে আমি তাঁকে প্রথম দেখি। ভাববিনিময়ও হয়। মাঝে মাঝেই নতুন কবিতা লিখলে পোস্ট করতেন। এসময় তাঁকে প্রায়শই পুবের কলমসহ কলকাতার কাগজে লেখার জন্য অনুরোধ  জানাতাম। বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবদুর রাকিব সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করে তাঁর লেখা একটি চিঠি দিনদর্পণে প্রকাশিত হয়েছিল। তার অল্প কিছুদিন পর আরও একটি চিঠি ঐ কাগজে তিনি লিখেছিলেন। এছাড়াও ২০১৯-এ ঈদুল ফিতরের সময় ঈদকে নিয়ে তাঁর লেখা একটি বেশ বড় কবিতা দিনদর্পণ প্রকাশ করেছিল। দেখে আশান্বিত হয়েছিলাম, কলকাতার কাগজগুলোতে তিনি হয়ত আবার ফিরছেন। না ঐ পর্যন্তই। আমার মনে হয় কলকাতাকেন্দ্রিক কাগজে এটাই ছিল তাঁর শেষ লেখা। 

নবীন কবি সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করতে ‘ইসলামী সাহিত্য মজলিস’ ও ‘গৌড়বঙ্গ সাহিত্য সমিতি’ নামক দুটি সাহিত্য সংগঠন কায়েম করেছিলেন কবি রাফিকুর রহমান। শুধু তাই নয়, এজন্য তিনি নিজের সংগ্রহের অনেক দুষ্প্রাপ্য বইও তাদের হাতে অকাতরে তুলে দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন। এছাড়াও এলাকার পশ্চাৎপদ মানুষদের মাঝে শিক্ষা বিস্তারের জন্য ‘এইচ আর ট্যালেন্ট কেয়ার’ নামক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সাহিত্য ও সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি আর্তপীড়িত মানুষের সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। প্রতি বছর ঈদের আগে অত্যন্ত চুপিসারে বহু অনাথ এতিমের হাতে নতুন নতুন পোশাক তুলে দিতেন। 

আড়াই দশক আগে প্রকাশিত একটা কবিতায় কবি রাফিকুর রহমান লিখেছিলেনঃ ‘জীবন আমার কষ্ট-কুসুম ফুটতে ফুটতে সুরভী ছড়ায়/ জীবন আমার পানি কাদায় পথ বিপথে মুক্তা কুড়ায়।’ সত্যি তাই। তিনি কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন মুক্তা কুড়ানোর জন্যই। তাঁর সাহিত্য সাধনার উদ্দেশ্যই ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য আজকের নবীন লেখকদের সঠিক পথের দিশা দিতে সক্ষম বলে আমার বিশ্বাস। এগুলি সংরক্ষণ ও প্রচার প্রসারের মাধ্যমেই কেবল আমরা তাঁর প্রতি আমাদের কর্তব্য যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারি। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ