শনিবার ১৯ জুন ২০২১
Online Edition

গবেষণার অ আ ক খ 

 

আমিনুল ইসলাম: বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গবেষণার আদ্যপান্ত সম্পর্কে জানতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বর্ষে উঠে। তবুও খুব উৎসাহিত হয়ে কাজ করার লক্ষ্যে অনেকেই স্থির হতে পারেন না। আসলে গবেষণা এমন একটি বিষয়, যার মাধ্যমে আপনি সদূরে চিন্তা করার পথ খুঁজে পাবেন। যেহেতু হুট করে একদিনেই গবেষক হয়ে ওঠা যায় না, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই গবেষণায় ধ্যান স্থাপন করা উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলের পাশাপাশি বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র আপনাকে নিঃসন্দেহে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই আপনি সামনে কি নিয়ে গবেষণা করতে চান, তার একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা নেয়া উচিত। যাতে করে হাতে অনেকটা সময় নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করা যায়।

এবার প্রশ্ন হচ্ছে, গবেষণার শুরুতে কী করব? বা কোন কাজটি বেশি করতে হয়? উত্তর হচ্ছে, পড়ুন, পড়ুন এবং পড়ুন। আপনাকে প্রচুর পরিমাণে গবেষণাপত্র পড়তে হবে। আপনার গবেষণার বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত যত কাজ হয়েছে তার একটা পরিষ্কার ধারণা আপনাকে মাথায় গেঁথে নিতে হবে গবেষণাপত্র পড়ার মাধ্যমে। আপনি ভালো জার্নালের গবেষণাপত্র পড়ার মধ্যদিয়ে কিভাবে গবেষণাপত্র লিখতে হয়, তা খুব সহজেই শিখতে পারবেন।

গবেষণা পত্র তৈরির ক্ষেত্রে অনেকগুলি বিষয় লক্ষ্য করা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে প্রথমেই থাকছে পত্রের ধরন। বিভিন্ন জার্নালে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পত্র প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখিত সম্মেলন পত্র, পরিপূর্ণ গবেষণাপত্র এবং সারাংশ পত্র যেটাকে ইংরেজিতে এবস্ট্রাক্ট পেপার বলা হয়। আপনাকে প্রথমেই আপনার বিষয়টি নির্ধারন করতে হবে, তারপর আপনি কোন নিয়মে লিখতে চাচ্ছেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গবেষণার বিষয় নির্ধারণঃ

প্রথমত আপনি কি নিয়ে গবেষণা করতে চান, তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা নিতে হবে এবং নির্ধারণ করতে হবে আপনাকে। গবেষণার বিষয় নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অনেকের প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস কেটে যায় বিষয় নির্ধারণ করতে। আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছের জায়গা, দক্ষতা, পারিপার্শ্বিক উপযুক্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে আপনাকে একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে যে আপনি কি বিষয়ে গবেষণা করতে চান।

গবেষণাপত্র অনুসন্ধানঃ

সাধারণত গুগোল স্কলার” এ সকল ধরনের গবেষণাপত্র খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়াও পছন্দের নির্ধারিত প্রকাশনা (পাবলিকেশন্স) থেকে পেপার খুঁজে বের করে এনেও পড়া যায়। IEEE, Springer, Elsevier কিছু ভালো গবেষণাপত্র প্রকাশনার উদাহরণ। আপনি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে পেপার খুঁজতে পারেন। তাহলে একটি বিষয়ের উপর অনেক ধরনের পত্র আপনি খুঁজে পাবেন। উদাহরণ দিয়ে বলছি। ধরুন আপনি “চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রযুক্তি” নিয়ে গবেষণা করতে চাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে আপনি বিভিন্ন “Keyword” ব্যবহার করে খুঁজতে পারেন। যেমন- Technology in Medical Science, AI in Medical Science, Medical Science Engineering, Automation in Medical Science. এতে হবে কি, আপনি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি তে গবেষণাপত্র খুঁজে পেতে পারবেন যা আপনাকে Literature Review তৈরি তে ব্যাপক সহায়তা করবে। 

গবেষণা পত্র সংরক্ষণঃ

প্রথমত আপনাকে একটি পেপার পছন্দ করতে হবে পেপারটির শিরোনাম বা টাইটেল দেখে। আপনি বিবেচনা করবেন যে এই টাইটেলের পেপার আপনার সম্পৃক্ত গবেষণার বিষয়ের সাথে যাচ্ছে কিনা। যদি যায়, তাহলে আপনি পেপারটির ভেতরে প্রবেশ করবেন। এরপর যেটি রয়েছে সেটি হচ্ছে এবস্ট্রাক্ট। একটি পেপারের এবস্ট্রাক্ট পড়েই সম্পূর্ণ পেপারটির ভাব বুঝতে পারা যায়। সহজ করে বলতে গেলে একটি গবেষণা পত্রের সারাংশ এবস্ট্রাক্ট এ তুলে ধরা হয়। এবস্ট্রাক্ট পড়েই আপনি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত হতে পারবেন যে এই পেপারটা আপনি গ্রহন করছেন কি না। আপনি যখন একটি গবেষণাপত্র ডাউনলোড করে পড়বেন এবং সেখান থেকে তথ্য গ্রহন করবেন, তখন অবশ্যই আপনাকে জবভবৎবহপব উল্লেখ করে দিতে হবে। তাই একটি পেপার পড়ার সময় রেফারেন্স সংগ্রহ করে রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কিভাবে সংরক্ষণ করে রাখব? আমি যেটা করে থাকি একটি ওয়ার্ড ফাইলে তিন কলাম বিশিষ্ট একটি টেবিল তৈরি করি। প্রথম কলামে টাইটেল, দ্বিতীয় কলামে এবস্ট্রাক্ট এবং তৃতীয় কলামে অচঅ জবভবৎবহপবং লিখে সংরক্ষণ করি। এতে করে খুব সহজে আপনি আপনার পেপার বাছাই করতে পারবেন। একটি গবেষণার বিষয়ে আপনাকে সর্বনিম্ন ৩০ টি পেপারের তথ্য এভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

মূল গবেষণা পত্র যেভাবে পর্যালোচনা করবেনঃ 

আপনি যেই পেপার গুলো পর্যালোচনা করতে চাচ্ছেন, ইতোমধ্যেই তার টাইটেল এবং এবস্ট্রাক্ট পড়ে ফেলেছেন। এখন আমরা পেপারের বডি নিয়ে আলোচনা করব। একটি আদর্শ পেপারের বডি সাধারণত ৫ টি ভাগে ভাগ হয়ে থাকে। 

Introduction: 

১) এখানে প্রথমত আপনার গবেষণার বিষয়ের একটি সাধারণ বিশ্লেষণ থাকে। 

২) আপনার প্রস্তাবিত সমাধানের আগে, বর্তমানে কি অবস্থায় বিষয়টি রয়েছে তার একটি ধারণা থাকে। 

৩) প্রস্তাবিত সমাধানের একটি আনুমানিক ফলাফলের চিত্র তুলে ধরা হয়।

৪) সবশেষে কিভাবে গবেষণাপত্র টি সাজানো হয়েছে তা তুলে ধরা হয়।

Methodology:

Methodology কে আমরা গবেষণাপত্রের ব্রেইন বলে আক্ষায়িত করতে পারি। এখানে মূলত সমস্যা এবং সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে। গবেষকরা যেই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে থাকেন, সেই বিষয় কিভাবে সমাধান করা হবে তার একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়া হয়ে থাকে। সহজ করে বলতে গেলে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে টেবিল, আইডিয়া সহজ ভাবে উপস্থাপন করতে ছবি এবং গ্রাফ ব্যবহার করে গবেষকের প্রস্তাবিত সমাধান তুলে ধরা হয়। আপনি যদি কোনো সমীকরন, মডেল বা কোনো সিস্টেম তৈরি করে থাকেন, সেটির বিস্তারিত আলোচনা Methodology এর মধ্যেই হয়ে থাকে। 

Literature Review:

গবেষকরা যখন গবেষণার বিষয়বস্তুর সাপেক্ষে অনেকগুলো পত্র পড়বেন, তখন তাদের একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে হয়। পঠিত পত্রগুলো থেকে অর্জিত জ্ঞান তারা তাদের পত্রের সাথে সংযুক্ত করে দিয়ে থাকেন। এতে করে কোথায় কি হচ্ছে, তাদের কাজ কতটা ফলপ্রসূ, কতটা অনন্য তার একটি শক্ত উপস্থাপন তুলে ধরতে সক্ষম হন।

Result / Discussion:

রেজাল্টে প্রস্তাবিত সমাধানের ফলাফল তুলে ধরা হয়। সংক্ষিপ্ত এবং নিদৃষ্ট করে ফলাফল তুলে ধরেন। যার মাধ্যমে একজন গবেষক প্রমাণ করেন তার সমাধান একটি অনন্য গুরুত্ব বহন করে। গ্রাফের মাধ্যমে গবেষকরা সুন্দর করে Result Analysis করে থাকেন।

Conclusion & References:

একটি গবেষণা পত্রের শেষ ভাগে সাধারণত এই গবেষণা থেকে কি শিক্ষা লাভ করা হলো এবং কতটুকু অর্জন করা হলো তা তুলে ধরা হয়। প্রতিটি গবেষণাপত্রের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে সেই সীমাবদ্ধতা গুলো এই অংশে তুলে ধরা হয় এবং এই বিষয় নিয়ে আরো গবেষণা করার পথ দেখিয়ে দেয়া হয়। রেফারেন্স নিয়ে আমি আগেই কথা বলেছিলাম। সেই রেফারেন্স গুলিই এই অংশে দেয়া হয়ে থেকে। 

পরিশেষে বলতে চাই অনেকেই মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন। ধৈর্য্যশক্তি রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়াই একজন সফল গবেষকের লক্ষ্য। প্রয়োজনে কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে ফেরা যাতে পারে। কাজকে ছোট ছোট করে ভাগ করে নেয়া উচিত এবং অবশ্যই প্রতিটির জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়া উচিত। মানসিকভাবে দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকতে হবে। নিজেকে উজ্জীবিত রাখতে হবে এবং নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে। তাহলেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ