সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

গঙ্গা থেকে পদ্মার প্রবাহ বৃদ্ধির বিকল্প হতে পারে ছোট ভাগীরথী-পাগলার সংযোগ

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার নয়াগ্রামে (বামে উপরে) গঙ্গা থেকে উৎপত্তি হওয়া ছোট ভাগীরথী নদী সুলতানগঞ্জ হয়ে মহাদিপুরের কদমতলায় পাগলার (ডানে লালবৃত্ত চিহ্নিত) সঙ্গে মিলেছে। (বামে নিচে) ফারাক্কা ব্যারেজের অবস্থান -ছবি : গুগল ম্যাপ অবলম্বনে

সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশে পদ্মা নদীর সর্বনাশ ডেকে আনা ফারাক্কা বাঁধের উজানে কেবল ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি মৃতপ্রায় নদীর পুনঃখননের মাধ্যমে গঙ্গা থেকে পদ্মার প্রবাহ বৃদ্ধির একটি বিকল্প হতে পারে। ছোট ভাগীরথী নামের এই নদীটি ফারাক্কা বাঁধের ১০ কি.মি উত্তরে নয়াগ্রামের কাছ থেকে মালদা জেলার মহাদিপুরের কদমতলার কাছে পাগলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বহুল আলোচিত ফারাক্কা বাঁধের ফলে গঙ্গার প্রবাহ বাংলাদেশের পদ্মায় পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথ এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুষ্ক মওসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে জমা পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে পানি দেয়ার একটি চুক্তি থাকলেও তা নায্যত পাওয়া যায় না। এর কারণ বাংলাদেশকে দেয়ার মতো পর্যাপ্ত পানি ফারাক্কা পয়েন্টে জমাই হতে পারে না। কেন না গঙ্গার আরো উজানে বহুসংখ্যক প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার ও আটকানো হয়। এর ফলে প্রবাহের ৯০ শতাংশই ভারতের বিভিন্ন প্রকল্প-কাজে ব্যবহার হয়ে যায়। অবশিষ্ট ১০ ভাগ কোনো রকমে ফারাক্কা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে খোদ ভারতীয় বিশেষজ্ঞরাই বলে আসছেন। এমতাবস্থায় শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশের পদ্মায় পানির প্রবাহ কিছুটা বৃদ্ধির স্বাভাবিক ও সরাসরি উপায় হতে পারে ছোটো ভাগীরথী ও পাগলার সংযোগকে কাজে লাগিয়ে একাধারে মহানন্দা ও পদ্মায় পানি পৌঁছানো। ফারাক্কা দিয়ে পানি আটকিয়ে এর উজানে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে ৩৮ কি.মি’র বেশি একটি কৃত্রিম খাল (ফিডার ক্যানেল) খননের মাধ্যমে হুগলি-ভাগীরথীর প্রবাহ বৃদ্ধি এবং কোলকাতা বন্দরের নাব্য বাড়ানো হয়েছে। তেমনই মালদা জেলায় ছোট ভাগীরথী ও পাগলার (সর্বোচ্চ ২৫ কি.মি) সংযোগ ঘটিয়ে প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশে মহানন্দা ও পদ্মার নাব্যতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ছোটো ভাগীরথীর পরিচয়
গঙ্গার অন্যতম ধারা আসল ভাগীরথী নদী মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত। আর ছোটো ভাগীরথীর অবস্থান পুরোটাই মালদা জেলার মধ্যে। এর অবস্থানের কথা মালদা জেলা গেজেটিয়ারে (১৯১৮) এবং পশ্চিমবঙ্গের পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বর্তমান ফারাক্কা ব্যারাজের মালদা জেলাধীন জগন্নাথপুর পয়েন্টের কাছ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নয়াগ্রামের কাছ থেকে উৎপত্তিকৃত। অতঃপর এটি কালিয়াচক ব্লকের কাঁঠালবাড়ি, সুলতানগঞ্জ, মারুপুর, ফতেচাঁদপুর, হারোচক মজুমপুর, বালুগ্রাম, কাশিমচক, খিদিরপুর প্রভৃতি এলাকা অতিক্রম করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ইংরাজবাজারের অন্তর্গত মহাদিপুরের কদমতলার কাছে পাগলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য নয়াগ্রাম-সুলতানগঞ্জের মধ্যে নদীর একটি অংশ ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যেহেতু ঐতিহাসিকভাবেই এটি একটি নদী হিসেবে স্বীকৃত, ফলে এর পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব। এর দৈর্ঘও তেমন বিশেষ কিছু নয়।
পাগলার প্রবাহ পথ
ফারাক্কা বাঁধের উজানে বাংলাদেশমুখী একমাত্র অভিন্ন নদী হিসেবে অবশিষ্ট ছিল গঙ্গার শাখা নদী পাগলা। কিন্তু গঙ্গা-পাগলার সংযোগমুখেও দেয়া হয়েছে বাঁধ। এরফলে ভারতের গঙ্গায় বাংলাদেশের নৌযান চলাচলের একমাত্র পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। গঙ্গার যেসব শাখা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার সবগুলোই ফারাক্কার ভাটিতে অবস্থিত। একমাত্র পাগলা নদী ফারাক্কা বাঁধের বাইরে থেকে গেছে। কিন্তু এই নদীরও ভারতের অংশে অন্তত ৪টি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে কমপক্ষে ১০টি ব্রিজ। গঙ্গা-পাগলার সংযোগ অংশে নির্মিত স্লুইসগেটসহ অন্যান্য নির্মাণ কাজের ফলে বাংলাদেশ অংশের পাগলা নদীর দীর্ঘ স্রোতধারায় গঙ্গার পানি প্রবেশ করতে পারে না। এসব প্রতিবন্ধকতায় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পতিত হওয়ার পর এই নদীর অস্তি¡তই বিপন্ন হয়ে পড়ে। কেবলই বৃষ্টি ও ছোটোখাটো খাল-বিলের পানি জমে এটি কোনোরকমে অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে বলে জানা গেছে। তবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার পাগলা নদী পুনঃখননের প্রকল্প গ্রহণ করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
পাগলা ভারতের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে মালদার মহাদিপুর হয়ে আজমতপুরের কাছে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করেছে। এরপর তা শ্যামপুর, মনাকষা, কমলাকান্তপুর প্রভৃতি এলাকা পাড়ি দিয়ে নবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর, মহারাজপুর হয়ে মোহনপুর গ্রামের কাছে তা মহানন্দা নদীতে পতিত হয়েছে। এখান থেকে মহানন্দা নদী প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় পদ্মা নদীতে মিলেছে। এভাবে দেখা যায়, গঙ্গার এক অংশ দিয়ে শাখা নদী হিসেবে পাগলার উৎপত্তি হলেও মহানন্দার মাধ্যমে তা আবার গঙ্গা-পদ্মারই প্রদায়ক নদীতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, মহাদিপুরের সংযোগ থেকে মহানন্দায় পতিত হওয়া পর্যন্ত এই অংশের নদীপথের কোথাও স্লুইসগেট বা কোনো রেগুলেটর জাতীয় প্রতিবন্ধক নেই। ফলে পানির প্রবাহ আটকে থাকারও সুযোগ নেই।
মহানন্দার অবস্থান
মহানন্দা নদী বাংলাদেশে গঙ্গার একমাত্র উপনদী। নেপালের দক্ষিণ-পশ্চিমস্থ হিমালয় থেকে উদ্ভূত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কার্সিয়াং ও শিলিগুড়ি অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণিয়া ও মালদহ জেলার মধ্য দিয়ে দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ভোলাহাটের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সীমায় প্রবেশের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরকে বাম তীরে রেখে গোদাগাড়ীতে গিয়ে গঙ্গায় পতিত হয়েছে। বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ প্রায় ৩৬ কি.মি। হান্টারের জরিপ (১৮৭৬ খ্রি:) থেকে জানা যায়, মহানন্দা একসময় একটি প্রশস্ত এবং গভীর নদী ছিল, যার বুকে চলাচল করতো বড় বড় মালবাহী নৌকা। মহানন্দা একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমানার মাত্র ৩ কি.মি উত্তরে শিলিগুড়ির কাছে নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক নদী আইনের আওতায় পড়ে না এবং যা মহানন্দার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহকে ব্যাহত করছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে পাগলা নদীর প্রবাহ পেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী পর্যন্ত মহানন্দার প্রবাহ চাঙা হতে পারে এবং এরপর থেকে পদ্মার প্রবাহও বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
উপকৃত হতে পারে দু’দেশই
ছোট ভাগীরথী-পাগলা সংযোগ প্রকল্প গৃহীত ও বাস্তবায়িত হলে উপকৃত হতে পারে দু’দেশই। এর ফলে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় পানির চাপ হ্রাস পেয়ে বন্যার তীব্রতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মহানন্দা ও পদ্মায় সারা বছর পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পর্যাপ্ত পানি না থাকার কারণে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির ঘাটতির কিছুটা হলেও নিরসন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
এবিষয়ে বাংলাদেশ নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-এর সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট মো: এনামুল হক বলেন, গত কয়েক দশকে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে বাংলাদেশের যে ক্ষতি সাধন করা হয়েছে তার পূরন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরবর্তী যে ক্ষতি হবে তা কেবল এই বাঁধের অপসারণের মধ্য দিয়েই পূরন হতে পারে। ভারত আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতার কোনো তোয়াক্কা না করে এই পানি প্রত্যাহার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এটি শুধু তার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন পূরনের জন্যই নয়- অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও এর পেছনে কাজ করেছে। তিনি বলেন, ফারাক্কার এই পরিস্থিতির পরিবর্তন যতোদিন না হচ্ছে সে পর্যন্ত ছোট ভাগীরথী-পাগলা সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। এতে পদ্মার প্রবাহের কিছু উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। তবে এযাবত ভারত পানি নিয়ে যে মনোভাব দেখিয়েছে তাতে এরকম কিছু আশা করা দুরাশা ছাড়া কিছুই নয়। বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ভারত এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। তবু বাংলাদেশকে তার ক্ষুৎপিপাসার কথা এবং তার নায্য দাবির কথা জোর গলায় বলে যেতে হবে। এর মধ্যে রাজনীতির কিছু নেই- বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের বিষয়টিই কেবল উল্লেখ করা হচ্ছে বলে এড. এনামুল হক মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ