রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

বছরে বিদেশী ফলের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার

*আপেল আমদানিতে বিশ্বে বাংলাদেশ তৃতীয় ও মাল্টায় পঞ্চম

মুহাম্মদ নূরে আলম: করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাহিদা বেশি হওয়ায় গত পাঁচ বছরের তুলনায় আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙ্গুর আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো। সেই হিসেবে বছরে বিদেশি ফলের বাজার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। দেশে ফল আমদানি লাফিয়ে বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুর- এ চার ধরনের ফল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মানুষের ফল খাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে করোনামহামারির এ সময়ে অনেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেশি করে ফল খাচ্ছেন। আর এই বাড়তি চাহিদা পূরণে ফলের আমদানি আগের তুলনায় ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। বলা যায় দেশে ফল আমদানি লাফিয়ে বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙ্গুর-এ চার ধরনের ফল আমদানিতে ব্যায় বেড়েছে দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি আপেল আমদানি করে তার মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয়। এ ছাড়া পণ্যের বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনডেক্সমুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, মাল্টা আমদানিতে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ১৫ লাখ ৭৭ হাজার কেজি বিদেশি ফল দেশে ঢুকছে। বিদেশি ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, ডালিম ও নাশপাতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ফল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৯৪৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে ফল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হয়েছে ২৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফল আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ২৫৫ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রতিদিন দেশে ১০ লাখ কেজি বিদেশি ফল আমদানি হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিদিন বিদেশি ফল আমদানি হয় ১৫ লাখ ৭৭ হাজার কেজি, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯ টনে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাজা ফল আমদানি হয়েছে ৩০ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। গত অর্থবছরের পুরো হিসেব এখনো পাওয়া না গেলেও গত মার্চ থেকে জুন এই চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি ফলের আমদানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এরমধ্যে আপেল আমদানি ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮০ হাজার টন হয়েছে। মাল্টা আমদানি হয়েছে ৫২ হাজার টন। আর কমলা, আঙ্গুর, নাশপাতি, ডালিম আমদানি ৯২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯০৭ টনে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা বিমানবন্দর, ভোমরা, সোনামসজিদ, হিলি স্থলবন্দর ছাড়াও বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে ফল আসে। এলসির বাইরেও হুন্ডির মাধ্যমে প্রতিবেশি ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ফল দেশে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে আপেল, কমলা, মালটা, আঙ্গুর, নাশপাতি, ডালিম ওই ছয়টি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে ভারত, চীন, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ভুটান, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। তবে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি ফল অবৈধ পথে আসে। এছাড়া আপেল, কমলা, আঙ্গুর, নাশপাতি, মাল্টা, চেরি, আনার, বরই, আম ছাড়াও বেবি ম্যান্ডারিন, পাম, নেকটারিন, কিউইর, সুইট মিলান, এবাকাডোর মতো কিছু অপরিচিত ফল আমদানি করা হয়।

এসব তথ্যে কেউ যাতে ভেবে না বসেন, মানুষ দেশি ফল খাচ্ছে না; বরং প্রতিবছর দেশি ফলের উৎপাদন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে দেশি ফলের চাহিদাও। আরও স্পষ্ট করে বললে, বাজারে চাহিদার তুলনায় দেশি ফলের উৎপাদন কম। কৃষিবিদেরা বলছেন, পেঁপে ও কলা সারা বছরই ফলে। এই দুটি ফল সব সময় পাওয়া গেলেও সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাজারে দেশি ফলের সরবরাহ সবচেয়ে কম থাকে। এর কারণ, ওই পাঁচ মাস সাধারণত কুল, পেয়ারা (থাই) ছাড়া অন্য কোনো দেশি ফলের মৌসুম নয়। তাই এই পাঁচ মাস বাজার একচেটিয়া বিদেশি ফলের দখলে চলে যায়।

ফল আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সমিতি বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব বিদেশি ফল আমদানি হচ্ছে, সেগুলো দেশে কার্যত উৎপাদন হয় না। তাই আমদানির বিকল্প নেই। সারা বছর বিদেশি ফলের চাহিদা রয়েছে। তবে পাঁচ মাস বিদেশি ফল বেশি বিক্রি হয়। পণ্যের তথ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক পোর্টাল ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, আপেল আমদানিতে সপ্তম হলেও এই ফল খাওয়ার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। আপেল খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে এক নম্বর চীন। এই তালিকায় ভারতের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। আপেল খাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো মানুষ বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে নেই।

আপেলের পরই বিদেশি ফলের বড় বাজার মাল্টার। গত অর্থবছর সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলো দিয়ে খালাস হয়েছে ১৯ কোটি ৯১ লাখ কেজি মাল্টা। প্রতিদিনের হিসাবে মাল্টা বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কেজি। ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাল্টা আমদানিতে ইরাকের অবস্থান অষ্টম। আমদানির পরিমাণ ১ লাখ ৯০ হাজার টন। তালিকায় বাংলাদেশের তথ্য না থাকলেও গত অর্থবছর বাংলাদেশ মাল্টা আমদানি করেছে ১ লাখ ৯৯ হাজার টন। এ হিসাব ধরা হলে বাংলাদেশের অষ্টম অবস্থানে থাকার কথা। বিদেশি ফলের বাজারে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আঙুর। প্রতিদিন ২ লাখ ১২ হাজার কেজি আঙুর বেচাকেনা হচ্ছে দেশে। এরপরের অবস্থান ডালিমের। দেশে ডালিম উৎপাদিত হলেও বিদেশ থেকেও আমদানি হয়। গত অর্থবছর ডালিম আমদানি হয়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ কেজি। আমদানির তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানটি নাশপাতির।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি করা বিদেশি ফলের সবচেয়ে বড় বাজার ঢাকায়। বিদেশি ফলের ৩০ শতাংশ রাজধানীতেই বেচাকেনা হয়। চট্টগ্রামে হয় ১৫ শতাংশ। এ হিসাবে দেশের অন্যান্য স্থানে বিদেশি ফল বেচাকেনা হয় ৫৫ শতাংশ। কৃষিবিদ ও ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটা সময় আপেলের মতো বিদেশি ফল কেবল অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই কিনতে পারতেন। নিম্ন আয়ের লোকজন রোগী দেখতে যাওয়ার সময় এই ফল নিয়ে যেতেন। এখন দিন বদলেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফল খাওয়ার ব্যাপারে সচেতনতাও বেড়েছে। ফলের দোকান ছাড়াও বড় শহরগুলোতে ভ্যানে করে গলিতে গলিতে দেশি-বিদেশি সব ধরনের ফল বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমি ফল বাজারে ওঠার পর প্রথম দিকে দাম চড়া থাকলেও কিছুদিন পর তা মধ্যবিত্তের নাগালে চলে আসে।

অবশ্য বিদেশি ফলের বাজার বাড়লেও দেশি ফলের প্রতিই মানুষের ঝোঁক বেশি বলে গণমাধ্যমকে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের উপপরিচালক (ফুল ও ফল) এ কে এম মনিরুল আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। মানুষ দেশি ফল বেশি না খেলে উৎপাদন বাড়ত না। আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম স্থান বাংলাদেশের। সঠিক হিসাব ধরা হলে বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনেও এক নম্বরে উঠে আসবে বাংলাদেশের নাম। গত বছর ১৬ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে শীর্ষ স্থানে থাকা ভারতের উৎপাদন এর চেয়ে কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৫৬ ধরনের ১ কোটি ১০ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ফলের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরামর্শক এস এম কামরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশি ফলের উৎপাদন যাতে বাড়ে, সে জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময়টায় নাবি ও বারোমাসি জাতের আম, মাল্টা, পেয়ারা, আঠাবিহীন কাঁঠাল ফলের আবাদ শুরু হয়েছে। এসব ফল বাজারে প্রচুর পরিমাণে এলে বিদেশি ফলের আমদানি কমে যাবে। চট্টগ্রামের বি আরটিসি মোড়ের পাশে ফলের বড় পাইকারি বাজার ফলমন্ডির ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে বলেন, আম, লিচুর মৌসুমে বিদেশি ফল সাধারণত কিনতে চান না ক্রেতারা। শখ করে আঙুর কেনা ক্রেতার সংখ্যাও আগের চেয়ে কমেছে। বেড়াতে গেলে বা ঘরে কেউ অসুস্থ হলে আঙুর, ডালিম, আপেল কেনেন লোকজন এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

তবে বিদেশি ফলের বাজার বাড়লেও দেশি ফলের পুষ্টিমান বেশি বলে জানান চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান কাজী নাজিয়া শারমিন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ফল যত তাজা খাওয়া যায় ততই ভালো। বিদেশি ফল উৎপাদনের পর থেকে ক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত অনেক সময় লাগে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি ফলের পুষ্টিমান অটুট থাকে না। দিনে একজন মানুষের কত গ্রাম ফল খাওয়া উচিত, তা নির্ভর করে ফলের পুষ্টিমানের ওপর। খাদ্যশক্তি ও পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোনো না কোনো ফল রাখা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সুস্বাস্থ্যের জন্য এক জন মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে মানুষ দৈনিক ৭৬ গ্রাম ফল খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আগে এর পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম। মানুষের চাহিদার কারণে একদিকে দেশে ফল উৎপাদন যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ফল আমদানি।  একটা সময় ছিল যখন মানুষ রোগী দেখতে যাওয়ার সময় ফল কিনত। এখন দৃশ্যপট অনেক পাল্টেছে। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে ফল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মেহেদী মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ফল খাওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে করোনামহামারির সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনেকেই এখন বেশি বেশি ফল খাচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতির আগে একটা সময়ে আমদানি করা ফলের চেয়ে মানুষ তুলনামূলকভাবে দেশি ফলের প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছিল। কারণ মানুষ এখন বুঝতে পারছে, আমাদের দেশি ফল আম, কাঁঠাল, নারকেল, পেয়ারা, পেঁপে, বড়ই, আমড়া, জাম, জাম্বুরা কোনো অংশেই কম নয়। থাই জাতের পেয়ারা, আপেলকুল ভোক্তাদের কাছে দিনদিন তার কদর বাড়াচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে করোনা সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে আমদানি করা ফলের প্রতি ঝুঁকেছে মানুষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ