শনিবার ১৯ জুন ২০২১
Online Edition

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা

 সাজজাদ হোসাইন খান:

॥ ত্রিশ ॥

আনন্দ ফুর্তিতেই কাটলো কটা দিন। স্কুল ছুটি তাই পড়াশোনায়ও ভাটার টান। বন্ধুবান্ধব মিলে একসাথে ঘোরাঘুরি। বিশেষ করে সূর্য আকাশের মাঝ বরাবর আসার আগ পর্যন্ত। বাসার আশপাশেই ছিল অনেক পতিত জমি। সেসব জমিতেই আমরা খেলতাম। সকালের দিকটায় ঘুড়ি উড়ানো। আর বিকালে ফুটবল। পতিত জমিগুলোর পাশেই ছিলো এক বিশাল মাঠ। সে মাঠে খেলতো বড়রা। ফুটবলটাই মূল খেলা। প্রায়ই ম্যাচ হতো। আমরা ছোটরা সে খেলা দেখতাম। গোলটোল হলে চিৎকার করে উঠতাম। কোনো কোনো সময় নিজেদের খেলা ছেড়েছুড়ে দলবেঁধে বড়দের খেলা দেখতাম। অশোকতলার বিকালটা কাটতো আনন্দ উল্লাসে। ঘুড়ির সাথে উড়তো মন আকাশে। কোনো কোনো দিন দৌড়াদৌড়ি করতো ফুটবল মাঠে। আব্বাও ফুটবল নিয়ে মেতে উঠতেন। তারও একটা ফুটবল দল ছিলো। আসলে এদলটি ডাক-বিভাগের নিজস্ব দল। আব্বা ছিলেন সে দলের হর্তাকর্তা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি খেলোয়াড় যোগাড় করতেন। অশোকতলার মাঠে নানান জেলা থেকে খেলোয়াড়রা এসে খেলতো। আর আব্বা সেখান থেকে তার পছন্দসই খেলোয়াড় বাছাই করতেন। প্রেমলাল নামের একজন খেলোয়াড় খুব ভালো খেলতো। কুমিল্লার কোনো ক্লাবের ছিলো সে। আব্বা প্রেমলালকে তার দলে নিয়ে নিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুজন নামকরা খেলোয়াড়কে তিনি ডাকবিভাগের দলে এনে সামিল করলেন। জীবন আর অন্যজনকে ডাকতো অসি। আব্বা বলেছিলেন ওরা নাকি খুব ভালো খেলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঠে ওদের খুব নামডাক। আর জীবনও জীবন দিয়েই খেলতো। যেন ফুটবলটাই তার জীবন-প্রাণ। অসির শুদ্ধ উচ্চারণ নাকি ওয়াসি। অসি না ওয়াসি সে যাইহোক, দারুণ খেলতো। বেটে খাটো মানুষটি। আকাশে চিল যেভাবে গুত্তা দেয় ঠিক সেভাবেই ওয়াসিও ছোঁ মেরে বল কেড়ে নিত। তারপর সোজা বিপক্ষ দলের জালে। ভালো ভালো খেলোয়াড় দিয়ে আব্বা কুমিল্লা ডাকবিভাগের দলটি গড়ে তুললেন। এরপর তার দল  দেশের বিভিন্ন এলাকায় খেলতে যেতো। 

খেলায়তো হারজিত আছেই। খেলতে খেলতে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল হয়তো ডাকবিভাগের দল। সেমিফাইনাল পর্যন্ত এসে থামতে হলো তাদের। আখাউড়া রেলওয়ের দল খুশির ঝরনায় সাঁতার কাটলো। আব্বার দল আর রেলের দল মুখোমুখি হয়েছিল। আব্বা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন মনে। আমার মনেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো অন্ধকার। বাসার পরিবেশের চেহারাও ছিলো বেজার বেজার। আম্মাও মনোকষ্টে কাটালেন শুয়ে-বসে। দু-চার দিন। তারপর সব ঠিকঠাক। 

অশোকতলার অশোকগাছ গুণতে গুণতেই বাজলো শুরুর ঘন্টা। আবার পাঠশালা। বইখাতা হাতড়ানো। ক্লাশের বন্ধুবান্ধব মিলে হৈ হুল্লুড়। সপ্তাখানেক পার হলো ক্লাশে আসা যাওয়ার। কিন্তু চন্দ্রনাথের দেখা নাই। নাইতো নাইই। স্যারদের ভাবনায়ও ধাক্কা দিলো চন্দ্রনাথের অভাবটা। এর-ওর কাছে জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করেও কোনো ভালো খবর ধরা দিলো না। সপ্তা দুয়েক পর আমরা তিন বন্ধু ঠিক করলাম চন্দ্রনাথের বাসায় যাব। অসুখ টসুক হয়নি তো! ঈশ্বর পাঠশালার কাছেই নাকি তাদের বাড়ি। আমি উদয়ন আর রহমান অলিগলি ঘুরে ঈশ^র পাঠশালা যে পাড়ায় সে পাড়ায় গিয়ে হাজির হলাম। দু’একজনকে জিজ্ঞেস করতে উড়ে এলো খবর। একটি ছেলে চন্দ্রনাথদের বাড়ি নিয়ে গেলো। আমরা তো মহাখুশি। কিন্তু এ খুশি বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলো না। খুশির পাপড়িগুলো ধপাস করে লাফিয়ে পড়লো মাটিতে। পাশের বাড়ির এক লোক জানালো চন্দ্রনাথরা নাকি চলে গেছে সেই কবে। আব্বা আম্মা সমেত। কোথায় গেছে, কোন পাড়ায় জানতে চাইলে তিনি বলেন কোনো পাড়ায় নয়। ওরা আগড়তলায় চলে গেছে। মনে মনে আওড়ালাম আগড়তলা আবার কোথায়। অশোকতলার মতো বোধহয় আগড়তলা একটি পাড়া। খালি হাতে ফিরতে হলো। তিনজনের চেহারায়ই ভাবনা আর দুঃখ এপাশ ওপাশ  করছে। বন্ধু হারানোর ব্যথাটা যেনো বারবার কামড়ে ধরছে। আমরা ঠিক করলাম চন্দ্রনাথের খোঁজে আগরতলা যাব। আগরতলা আর কত দূর হবে! অশোকতলার কাছেই হবে হয়তোবা। রহামানও সায় দিলো। কিন্তু উদয়ন জানত আগরতলার বাড়ি ঘরের ঠিকানা। তাই আমার আর রহমানের চিন্তাভাবনার পথে পা রাখল না। শুধু হা হু করলো। হতাশায় ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরলাম।  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ